আর একজন বলল, মাফকা খুশি হবে। কিন্তু আমাদের নগরের কাছে উপত্যকায় যে সব প্রহরী ছিল তাদের চোখে ধুলো দিয়ে এখানে ও এল কি করে?
গর্তের মধ্যে একটা মোটা দড়ি ফেলে দিল ওরা। টারজান বলল, ধর দড়িটা, আমি উঠছি।
দুটো কারণে ধরা দিতে চাইল টারজান। প্রথমতঃ এখানে বাধা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে যাওয়া মানে অবধারিত মৃত্যু। দ্বিতীয়তঃ তাকে বন্দী মাফকার কাছে নিয়ে গেলে সে অন্তত উড ও তার সঙ্গীদের উদ্ধার করার সুযোগ পাবে একটা।
দড়ি ধরে উঠে গর্তের উপর টারজান পা দিতেই কতকগুলো বর্শা তার চারদিকে উঁচিয়ে ধরল যোদ্ধারা।
টারজান দেখল আটজন মেয়েযোদ্ধা আর চারজন পুরুষ। সকলেই শ্বেতাঙ্গ এবং সশস্ত্র।
একজন মেয়ে আশ্চর্য হয়ে বলল, কে তুমি?
টারজান বলল, আমি একজন শিকারী।
এখানে এলে কি করে?
টারজান বলল, আমি উত্তর দিক থেকে পার্বত্য অঞ্চলে শিকার করতে করতে আসছি। পরে পার্বত্য এলাকা এড়িয়ে এই উপত্যকার পথে চলে আসি। আমি আবার নিউবারির দিকে চলে যাব।
মেয়েযোদ্ধাটি বলল, না, তুমি এখন আমাদের বন্দী। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।
টারজান বলল, ঠিক আছে, তাই নিয়ে চল। তোমরা বারোজন, আমি একা। তোমাদের হাতে অস্ত্র আছে, আর আমি নিরস্ত্র।
টারজানকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল ওরা। কিন্তু হাত দুটো বাঁধল না।
ইচ্ছা করলেই পালাতে পারত টারজান। তার সঙ্গে ছুটে পারত না ওরা। কিন্তু যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও পালালো না সে। কারণ সে কাজীদের দেশেই যেতে চায়।
যে চারজন শ্বেতাঙ্গ লোক টারজনের সঙ্গে যাচ্ছিল তাদের কথাবার্তা হতে টারজান জানতে পারল তাদের একজনের নাম স্ট্রোল। স্ট্যানলি উডের মুখ থেকে তার সঙ্গী স্ট্রোল ও ভন আইকের নাম শুনেছিল।
টারজান তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি উড আর ভন আইকের সঙ্গে ছিলে?
স্ট্রোল বিস্মিত হয়ে টারজনের মুখপানে তাকাল। তুমি উডকে চিনতে?
টারজান বলল, হ্যাঁ, সে কি আবার ধরা পড়েছে?
স্ট্রোল বলল, হ্যাঁ, মাফকার কবলে একবার পড়লে আর নিষ্কৃতি নেই। সে তোমাকে দূর থেকেও টেনে আনবেই। উড পালিয়ে গিয়েও আবার ফিরে এসেছে। আচ্ছা তোমার নাম কি ক্লেটন?
টারজান বলল, হ্যাঁ।
তোমার কথা উডের কাছ থেকে অনেক শুনেছি। তোমার চেহারার বর্ণনা তার মুখ থেকে শুনেছিলাম বলেই তোমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারি।
উড কি এখনো বেঁচে আছে?
হ্যাঁ, মাফকা এখনো মারেনি তাকে। তবে ওকে মারতেই হবে। মাফকা ওর পালানোর জন্য দারুণ রেগে আছে। লোকটা ভয়ঙ্কর। একমাত্র টমি সেনাদের এক বিরাট দলই তাকে জব্দ করতে পারে।
টারজান আবার জিজ্ঞাসা করল, মাফকা কি সত্যি সত্যিই মৃত্যুদণ্ড দিতে চায় উডকে?
স্ট্রোল বলল, ও হয়ত উডের শুধু পালানোর জন্য এত রাগত না। উডের সবচেয়ে বড় অপরাধ সে রানী গলনালাকে ভালবাসে এবং গলনালারও একটা দুর্বলতা আছে তার প্রতি।
সারা পথটা স্ট্রোল টারজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে যেতে লাগল। নগরের কাছাকাছি এসে টারজান দেখল নগর প্রাচীরটা পাথর দিয়ে গাঁথা। নগরের ভিতরের বাড়িগুলো সব পাথরের এবং সেগুলো একতলা অথবা দোতলা। একমাত্র মাফকার প্রাসাদটা চারতলা।
রাজপথের উপর দিয়ে টারজানকে নিয়ে ওরা মাফকার প্রাসাদের দিকে এগিয়ে চলল। পথে অনেক কৃষ্ণকায় নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর মেয়ে যোদ্ধা দেখল। পথে যে সব শিশুরা খেলা করছিল তারা সাবই মেয়ে।
মাফকার প্রাসাদের কাছে এলে চারজন পুরুষ সরে গেল। শুধু আটজন মেয়েযোদ্ধা প্রাসাদের ভিতরে নিয়ে গেল টারজানকে। টারজান দেখল উরার প্রাসাদের থেকে মাফকার প্রাসাদের ঐশ্বর্যের পরিমাণ অনেক বেশি। মাফকা অনেক লুটের মাল পায়, উরা সেটা পায় না।
দরবার ঘরে ঢুকে টারজান দেখল ঘরের শেষ প্রান্তে একটি মঞ্চের উপর পাতা একটি সিংহাসনে যে মানুষটি বসে আছে তাকে দেখতে অবিকল উরার মত। দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল সে। তখন উডের কথাটা মনে পড়ল তার। উড বলেছিল আসলে মাফকা আর উরা দুই যমজ ভাই; দেখতে একই রকমের।
টারজানকে ধরার সময় যে সব মেয়েযোদ্ধারা ছিল তারা বন্দী সম্বন্ধে বিবরণ পেশ করল মাফকার কাছে। মাফকা সে বিবরণ খুঁটিয়ে দেখার পর উরার মতই গলফান নামক সেই হীরের তালটার উপর হাত রেখে টারজানকে প্রশ্ন করল, কে তুমি?
টারজান বলল, আমি একজন ইংরেজ, শিকার করছিলাম।
কি কারণে?
খাদ্যের জন্য।
মাফকার পাশেই একটি চেয়ারে একটি সুন্দরী মেয়ে বসেছিল। টারজান বুঝতে পারল ঐ মেয়েটিই হলো গনফালা অর্থাৎ কাজীদের রানী। তার বুকে ও পেটের উপর খাঁটি সোনার বক্ষাবরণী ও উদরবেষ্টনী। পরনে ছিল চিতার নরম চামড়া দিয়ে তৈরি স্কার্ট। তার হাতে, বাহুতে ও পায়ে ছিল অনেক তামা ও সোনার গয়না। তার মাথার উপর ছিল হালকা একটা মুকুট।
উরার মত মাফকার পরনে ছিল মাত্র একটা কৌপীন এবং ভূঁড়িটা মোটা। টারজান বুঝল রানীর বেশভূষা যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, তার মুকুট যতই শক্তির প্রতীক হোক, আসল শক্তি আছে কৌপীন পরা ঐ কুৎসিতদেহী লোকটার হাতে।
টারজানকে ভাল করে খুঁটিয়ে দেখার পর মাফকা হুকুম দিল, নিয়ে যাও ওকে এখান থেকে। ওকে হত্যা করা হবে।
রক্ষীরা টারজানকে উপরতলার একটি বড় ঘরে নিয়ে গিয়ে তাকে একা রেখে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে চলে গেল। দুটো বেঞ্চ ছাড়া আর কোন আসবাবপত্র ছিল না সে ঘরে। ঘরের দেয়ালে নগরের দিকে কতকগুলো ছোট ছোট জানালা ছিল। তাই দিয়ে বাইরে থেকে কিছু আলো আসছিল। একদিকের দেয়ালে আগুন জ্বালাবার একটা বড় চুল্লী ছিল। কিন্তু সেখানে কোন আগুন জ্বালানো ছিল না।
