লর্ড বলল, আসলে তুমি এটা নিজের কাছেই রেখে দিতে চাও। কাউকে ভাগ দিতে চাও না।
টারজান বলল, যা খুশি ভাবতে পার। এখন এস আমার সঙ্গে।
টারজনের পিছু পিছু নীরবে এগিয়ে যেতে লাগল ওরা।
পরদিন সন্ধ্যার কিছু আগে পথের ধারে একটা উঁচু জায়গা থেকে টারজান কাজীদের নগর আর মাফকার দুর্গটা দেখতে পেল। একটা উপত্যকার এক প্রান্তে একটা খাড়া পাহাড়ের কোলে গড়ে উঠেছে। নগরটা। জুলিদের গ্রামের থেকে এ নগরটা অনেক বড় এবং আরো বিস্তৃত জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে।
দূর থেকে কাজীদের নগরটা দেখার পর টারজান তার দলের লোকদের বলল, আমরা অনেক পথ হেঁটেছি। তার উপর কিছুই খাওয়া হয়নি। তোমরা সবাই ক্লান্ত। রাত্রির অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠা পর্যন্ত। ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না। সুতরাং তোমরা এখন বিশ্রাম করো।
একজনের কাছ থেকে একটা বর্শা নিয়ে তার মুখ দিয়ে একটা জায়গার চারদিকে একটা গণ্ডী টেনে দিল টারজান। তারপর বর্শাটা যার হাত থেকে নিয়েছিল তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, তোমরা কেউ এই গণ্ডীর বাইরে পা বাড়াবে না।
এই বলে সেই গণ্ডীর রেখার বাইরে কিছুটা দূরে সে নিজে শুয়ে পড়ল। পান্নার তালটা তার পাশে রাখল এবং তার উপর একটা হাত চাপিয়ে রাখল।
সকলেই বিশ্রামের সুযোগ পেয়ে শুয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল সবাই। একমাত্র লর্ড একা জেগে রইল। পান্নাটার দিকে সব সময়ের জন্য নিবদ্ধ করে রাখল তার জাগ্রত দৃষ্টি। ধাতুটা থেকে বিচ্ছুরিত এক সবুজ আভার বৃত্তসীমার মধ্যে অর্থ দ্বারা ক্রয়যোগ্য সভ্য জগতের সকল সম্পদ ও সকল ঐশ্বর্যকে আবদ্ধ দেখতে পেল সে।
সন্ধ্যা গিয়ে রাত্রি এল। তবু চাঁদ উঠল না আকাশে। চারদিকে ঘোর অন্ধকার। শুধু পান্নার সবুজ একটুখানি অস্পষ্ট আলো এ জায়গার কিছুটা অন্ধকার দূর করেছিল।
লর্ড লক্ষ্য করল টারজনের একটা হাত পান্নার উপর চাপানো আছে। তার মনে পড়ল উরা যখন কাউকে দিয়ে জোর করে কিছু করাত তখন সে পান্নাটার উপর হাত দিয়ে রাখত। সে তাই বুঝল যতক্ষণ কেউ তার কোন অঙ্গ দিয়ে ছুঁয়ে থাকবে পান্নাটাকে ততক্ষণই সে এক অলৌকিক অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী থাকবে।
দেখতে দেখতে লর্ড এক সময় দেখল ঘুমের মধ্যে একবার পাশ ফিরতেই টারজনের হাতটা পান্নার উপর থেকে খসে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের বর্শাটা নিয়ে ঘুমন্ত টারজনের দিকে এগিয়ে গেল। লর্ড গণ্ডীটা পার হবার সময় একটু ইতস্তত করল। তারপরই সে টারজনের কাছে গিয়ে পান্নাটা তুলে নিল। বর্শা দিয়ে টারজানকে হত্যা করার কথাও একবার ভেবেছিল সে। কিন্তু তা করল না কারণ ভাবল তাকে বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করলেও মরার আগে সে চেঁচালে সকলে জেগে উঠবে। তখন পান্নাটা নিয়ে একা পালাতে পারবে না। তাহলে সকলকেই ভাগ দিতে হবে।
পান্নার তালটা নিয়ে লর্ড একা নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে।
হঠাৎ চমকে ঘুম থেকে জেগে উঠল টারজান। চাঁদের আলো ঝরে পড়ছিল তার মুখের উপর। তার মনে হলো সে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে। হাতের কাছে পান্নার তালটা না পেয়ে তাঁর খোঁজ করতে লাগল।
কিন্তু সেটা না পেয়ে লাফ দিয়ে উঠে ঘুমন্ত লোকগুলোর কাছে গেল। দেখল সবাই ঘুমোচ্ছ। শুধু লর্ড নেই। টারজান ভাবল লোকগুলোকে জাগিয়ে তুলে কোন লাভ হবে না। কারণ এখন তার সব শক্তির উৎস পান্নার তালটা নেই। এখন সে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এখন তারা সবাই শক্ত হয়ে উঠবে।
সারা শিবিরটার চারদিকে ঘুরে গন্ধসূত্র ধরে সে বুঝতে পারল লর্ড মাফা নদীর উপত্যকার উপর দিয়ে পালিয়ে গেছে। সে গেছে নিউবারি নদীর দিকে। লর্ড হয়ত ঘণ্টা দুই আগেই চলে গেছে। কিন্তু যত আগেই সে যাক সে তাকে ধরবেই।
রাত্রির অন্ধকারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল টারজান।
প্রায় একঘণ্টা ধরে লর্ডকে অনুসরণ করার পর টারজান দূরে অস্পষ্ট একটা সবুজ আলো দেখতে পেল। দেখল আলোটা ডান দিকে ঘুরে একটা পথ ধরল। মনে হলো লর্ড বোধ হয় কাজীদের নগরটাকে পাশ কাটিয়ে অন্য একটা পথ ধরেছে। কিন্তু ও যে পথেই যাক তাকে ধরে ফেলবে সে।
দ্রুতপায়ে পথ চলতে চলতে হঠাৎ টারজনের পায়ের মাটিটা নেমে গেল। সে একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে পড়ে গেল। সে বুঝল গর্তের উপরটা নরম মাটি আর ডালপালা দিয়ে ঢাকা ছিল। আসলে এটা চিতাবাঘ ধরার একটা ফাঁদ। ফাঁদটা কাজীরা পেতেছে।
টারজান দেখল গর্তের মুখটা অনেক উঁচুতে। লাফ দিয়ে সেখানে উঠে বার হওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। সে বুঝল কাজীরা কাল দিনেরবেলায় ফাঁদটা দেখতে আসবে। ততক্ষণ চুপচাপ অপেক্ষা করা ছাড়া। আর কোন উপায় নেই। তারা এসে হয় তাকে বধ করবে পশুর মত অথবা বন্দী করে নিয়ে যাবে। তবে ফঁদের মুখটা আর ঢাকা নেই বলে কোন চিতা অন্তত এ গর্তে আর পড়বে না।
রাত্রি গম্ভীর হতেই ঘুমিয়ে পড়ল টারজান সেই অন্ধকার গর্তটার মধ্যে। আসন্ন বন্দীত্ব বা মৃত্যুর সম্ভাবনাপূর্ণ এই শোচনীয় অবস্থাও কিছুমাত্র বিচলিত করতে পারল না তার মাথার স্নায়ুগুলোকে।
টারজনের যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন সূর্য মাথার উপরে উঠে গেছে অনেকটা। সে কান পেতে একসঙ্গে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। তাদের কথাবার্তাও শুনতে পাচ্ছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই টারজান মুখ তুলে দেখল কয়েকজন মেয়ে যোদ্ধা আর কয়েকজন পুরুষ গর্তের উপর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখছে তাকে। তাদের একজন বলল, চমৎকার একটা চিতা ধরা পড়েছে।
