এদিকে টারজান তখন গাঁ থেকে কিছুটা দূরে অন্ধকারে একা একা পথ চলতে চলতে গাঁ থেকে অনেক হৈ হুল্লোড়ের শব্দ শুনতে পেল। সেই সেঙ্গ যুদ্ধের আহ্বান জানিয়ে জয়ঢাক বাজানোর শব্দও শুনতে পেল।
টারজান বুঝতে পারল লর্ড সবাইকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। তারা এবার একযোগে তাকে, ধরতে আসে।
টারজান তার চলার গতি বাড়িয়ে দিল।
এদিকে লর্ড জুলির সকলকে বোঝাতে লাগল, যদি আমরা পান্নার তালটাই না পাই তাহলে উরার মৃত্যুতে আমাদের কি লাভ হবে। আমরা মুক্ত হয়ে বাইরের জগতে গিয়ে কি করব?
টারজান এবার তার অনুসরণকারীদের পদশব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল। সে বুঝতে পারল তারা এখন বিক্ষুব্ধ। তারা যদি একবার ধরতে পারে তাকে তাহলে তার জয়ের উদ্দেশ্য সাধনের কোন আশাই থাকবে না।
নদীর ধারে আরো কিছুটা এগিয়ে গেলে টারজনের মনে হল সে যেন একা নেই। ছায়ার মত কে যেন তাকে জড়িয়ে ধরে তার সঙ্গে হাঁটছে। তার নিঃশ্বাস পড়ছে তার গায়ে। অথচ তার তীব্র ঘ্রাণশক্তির মাধ্যমে সে বুঝল কেউ নেই।
কোন যাদুশক্তি বা মায়ায় বিশ্বাস করে না টারজান। অথচ অশরীরী প্রেতের মত কে তাকে অনুসরণ করছে তা বুঝতে পারল না। একবার মনে হলো উরার প্রেতাত্মা। কিন্তু পরে বুঝল এটা হলো পান্নার ধাতব শক্তি।
তা যদি হয় তাহলে কাজীদের হীরকখণ্ড গলফানের মধ্যেও আছে এই একই শক্তি। সেই গলফানই হলো মাফকার সকল শক্তির উৎস এবং মাফকা এই পান্নার তালটা পেলে দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
টারজান এবার পথটা ছেড়ে এক পাশের এক বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে রইল। দেখল তার অনুসরণকারী জুলিরা লর্ড এর নেতৃত্বে অনেক কাছে এসে পড়েছে। ওদের দলে আছে পঞ্চাশজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর প্রায় চারশো জুলি মেয়ে যোদ্ধা। ওদের ধারণা পলাতক বেশি দূরে যেতে পারেনি।
টারজান পান্নার তালটার উপর থেকে কাপড়টা সরিয়ে দু’হাত দিয়ে ছুঁয়ে মেরে যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে মনে মনে বলতে লাগল, তোমরা ফিরে যাও। নিজেদের গাঁয়ে ফিরে যাও।
মেয়েরা তবু সেই পথ ধরে এগিয়ে আসছিল অব্যাহত গতিতে। টারজান তবু হতাশ হলো না। পান্নার। তালটা থেকে সব আবরণ সরিয়ে সেটা তুলে ধরতেই চাঁদের আলোয় চকচক করতে লাগল সেটা। এক উজ্জ্বল সবুজ আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল টারজনের দেহটা। সে বেশ বুঝতে পারল এক নতুন শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে তার দেহে। যতবারই সে ডান হাত দিয়ে পান্নার তালটাকে স্পর্শ করে ততবারই অলৌকিক বৈদ্যুতিক শক্তির তরঙ্গ সঞ্চারিত হয় তার দেহের প্রতিটি শিরায়। মেয়েদের লক্ষ্য করে সে আবার তার ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করল। মনে মনে বলল, ফিরে যাও।
জুলি মেয়েরা হঠাৎ থেমে গেল চলতে চলতে।
শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের একজন বলে উঠল, কি হলো, থামলে কেন?
একজন মেয়েযোদ্ধা বলল, আমরা ফিরে যাচ্ছি।
কেন?
তা জানি না। আমরা বিশ্বাস করি না উরা মরে গেছে। সে আমাদের ডাকছে। ফিরে যেতে বলছে।
লর্ড বলল, বাজে কথা। আমি নিজে দেখেছি সে খুন হয়েছে। তার মাথাটা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে একতাল মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে।
মেয়েরা ফিরে যেতে লাগল।
লর্ড বলল, ওদের যেতে যাও।
লর্ডের নেতৃত্বে পঞ্চাশজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ দাঁড়িয়ে রইল। জুলির মেয়েযোদ্ধারা ক্রমে পথের বাঁকটায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
লর্ড বলল, ভাল হলো। আমরা মোট পঞ্চাশজন আছি। পান্নাটা পেয়ে মেয়েগুলোকে আর ভাগ দিতে হবে না।
আড়াল থেকে মুচকি হাসল টারজান।
লর্ড তার দলের লোকদের বলল, এগিয়ে চল। দেরী করছ কেন?
কিন্তু কেউ নড়ল না। কেউ পা তুলতে পারল না। এমন কি লর্ড নিজেও চলতে পারল না।
একজন লর্ডকে বলল, কি হলো, যাচ্ছ না কেন?
লর্ড বলল, তোমরাই বা যেতে পারছ না কেন?
লর্ডের মুখখানা ম্লান হয়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন দারুণ ভয় পেয়ে গেল। সে বলল, আমি বা তোমরা কেউ যেতে পারবে না। মেয়েরা ঠিকই বলেছিল, উরার শক্তি কাজ করছে।
লর্ড বলল, আমি নিজে দেখেছি সে মরে গেছে।
তাহলে তার প্রেতাত্মা। ঐ দেখ।
এই বলে পথের ধারে যে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল টারজান সেই দিকে হাত বাড়িয়ে দেখাল।
সবাই দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। পাথরের ওধার থেকে একটা সবুজ আলো বেরিয়ে এসে চাঁদের আলোকে ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।
শ্বেতাঙ্গরা ভয়ে বুকে ক্রশ আঁকতে লাগল তা দেখে।
এমন সময় পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল টারজান।
লর্ড বলল, সেই কাজী।
অন্য একজন বলল, সেই পান্নার তাল।
কিন্তু কেউ অস্ত্র তুলল না। কেউ এগিয়ে গেল না টারজনের দিকে।
টারজান এবার তাদের কাছে এসে বলল, তোমরা সংখ্যায় পঞ্চাশজন আছ। আমার সঙ্গে কাজীদের দেশে এস। সেখানে আমার কয়েকজন লোক বন্দী হয়ে আছে। তাদের মুক্ত করে আমরা ওদেশ থেকে বেরিয়ে যাব। তারপর যার যেখানে ইচ্ছা চলে যাবে।
লর্ড বলল, কিন্তু পান্নাটা? তুমি বলেছিলে আমাকে তার ভাগ দেবে।
টারজান বলল, কিছুক্ষণ আগে তুমি আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলে। ফলে সে অধিকার তুমি হারিয়ে ফেলেছ। তাছাড়া আমি এখন এই পান্নার শক্তির স্বরূপটা বুঝতে পেরেছি। এ শক্তি বিপজ্জনক। তোমার মত অযোগ্য লোকের হাতে পড়লে তা দারুণ ক্ষতি করবে। কাজীদের দেশ থেকে আমি বেরিয়ে গেলে নিউবারি নদীর জলে এটা ফেলে দেব যাতে কেউ এটাকে খুঁজে না পায়।
