এই বলে সে পাশের ঘরে গিয়ে একটা উনোনে জ্বলতে থাকা কয়লার আগুনে একটা সঁচলো লোহার রড পোড়াতে দিল। সেই রডটা হাতে করে এনে উরা বলল, এই জালের দড়ি পাগলা হাতিতেও ছিঁড়তে পারে না।
এই বলে সে সেই রডের চলো লাল গরম মুখটা টারজনের চোখে ঢুকিয়ে দেবার জন্য এগিয়ে এল।
কিন্তু টারজান পর পর দু’বার সেই রডটা হাত দিয়ে সরিয়ে দিল। রডটাকে উরা টারজনের চোখের কাছে আনতেই পারল না। টারজান কোন ক্ষমা প্রার্থনা না করায় এবং তার রডটা ঠেলে সরিয়ে দেয়ায় উরা আরও রেগে গেল।
উরা পাশের ঘর থেকে একটা রড নিয়ে এসে বলল, এটা আরো গরম। এটা দিয়ে তোমার চোখদুটোকে এবার ঠিক বিদ্ধ করব।
টারজান দেখল সে রডের উপরটা জ্বলন্ত অঙ্গারের মত লাল হয়ে উঠেছে। সেই রডটা ধরে উরা টারজনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, এবার তুমি নিশ্চয়ই চীৎকার করে ক্ষমা চাইবে।
কিন্তু টারজান দেখল তার পিছনে দরজাটা ঠেলে কে প্রবেশ করল ঘরে। মুখ ঘুরিয়ে সে দেখল কাঠের সেই মোটা রডটা নিয়ে লর্ড এসে ঘরে ঢুকেছে।
ঘরে ঢুকেই লর্ড তার দু’হাতে রডটাকে লাঠির মত ধরে সজোরে উরার হাতে মেরে তার হাতের কব্জি ভেঙ্গে দিল। জ্বলন্ত রডটা পড়ে গেল তার হাত থেকে। তারপর সে তার দেহের সমস্ত শক্তি দিয় উরার মাথায় ক্রমাগত ঘা দিয়ে যেতে লাগল। উরার মাথাটা ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ে গেল উরা।
টারজান এবার লর্ডকে বলল, ঠিক সময়েই এসে পড়েছ।
লর্ড বলল, কিভাবে চিতাটাকে মেরেছ আমি তা নিজের চোখে দেখেছি। তারপর তুমি উরার ঘরের দিকে এগিয়ে এলে আমিও অনুসরণ করি তোমায়।
এই বলে একটা ছুরি উরার টেবিল থেকে তুলে নিয়ে জালের দড়ি কেটে মুক্ত করল টারজানকে।
লর্ড এরপর টারজানকে বলল, এখন এই পান্নার তালটা আমাদের দুজনের। এখনো রাত শেষ হতে অনেক দেরী। চল আমরা এখান থেকে চলে যাই। এখন উরার ঘরে কেউ আসবে না। ওর মৃতদেহটা আবিষ্কার করতে কয়েকদিন সময় লেগে যেতে পারে।
টারজান লর্ডকে বলল, তুমি তোমার বন্ধুদের কথা ভুলে গেছ।
লর্ড বলল, উরা মরে গেছে। এবার ওরা মুক্তি পাবে। ওদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছি। এই ধাতুটা এখন আমাদের।
টারজান বলল, তুমি কাজীদের কথাও ভুলে গেছ। তাদের দেশের ভিতর দিয়ে কি করে এটা নিয়ে যাবে? মাফকার শক্তি উরার থেকে আরো বেশি। মাফকার হাত থেকে পালাতে পারবে না।
তাহলে এখন কি করব আমরা?
টারজান বলল, আমি আগে সেখানে গিয়ে মাফকাকে খতম করব।
লর্ড বলল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে টারজান বলল, না, আমি একা যাব। মাফকার অলৌকিক শক্তি দূর থেকেও তার শত্রুদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে। সে শক্তির কবল থেকে তুমি মুক্ত করতে পারবে না নিজেকে। একমাত্র আমার উপর সে শক্তি কাজ করবে না। তুমি গেলে আমাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাবে।
এই বলে সে একটা ছেঁড়া কাপড় দিয়ে পান্নার তালটাকে জড়িয়ে রাখল।
ওটা নিয়ে কি করবে তুমি?
এটা সঙ্গে থাকলে মাফকার দেখা পাওয়া সহজ হবে আমার পক্ষে।
লর্ড হেসে বলর, তুমি কি ভেবেছ আমাকে বোকা বানিয়ে এটা একা নিয়ে যাবে তুমি? তুমি জান এটার কত দাম। আমরা দুজনে এটা ভাগ করে নেব।
টারজান বলল, তুমি দেখেছ আমি কিভাবে চিতাটাকে মেরেছি। তুমি যদি আমার কাজে হস্তক্ষেপ কর তাহলে
লর্ড বলল, কিন্তু এর দাম অনেক।
টারজান বলল, দাম যাই হোক, আমার তাতে প্রয়োজন নেই। আমি এটাকে নিয়ে গিয়ে মাফকার কবল থেকে আমার লোকদের উদ্ধার করার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চাই শুধু।
এই বলে দড়ি দিয়ে কাপড়ে জড়ানো পান্নার তালটাকে ভাল করে বেঁধে তার কোমরের সঙ্গে বেঁধে দড়িতে ঝুলিয়ে নিল। তারপর ছুরিটা তুলে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো।
যাবার জন্য উদ্যত হয়ে সে বলল, একদিন পর তুমি যারা এখান থেকে যেতে চায় তাদের নিয়ে। কাজীদের দেশে তাদের সঙ্গে লড়াই করে পথ করে চলে যাবে। তবে আমি মাফকাকে আমাদের পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারলে তোমাদের সুবিধা হবে। কাজ সেরে আমি এই পান্নাটাকে নিউবারি আর মাফা নদীর সঙ্গমের কাছে এক জায়গায় রেখে আমার কাজে চলে যাব। তিন সপ্তাহ পর আমি আবার ফিরে এসে সেই পান্নার তালটাকে জুলিদের হাতে তুলে দেব।
লর্ড বলল, তাহলে আমার কি হবে? তুমি জুলিদের দেবে? এই জন্যই কি আমি উরার হাত থেকে তোমাকে বাঁচালাম?
টারজান বলল, আমি চাই এটা তোমরা সবাই মিলে ভাগ করে নাও। তুমি ত বলেছিলে এটা কাজীদের ঘুষ দিয়ে তাদের দেশের ভিতর দিয়ে পথ করে বাইরের জগতে চলে যাবে। তুমি অন্য সবাইকে ফাঁকি দিয়ে একা এটা নিতে চাও তা ত আমি জানতাম না।
টারজান ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে লর্ড দরবার ঘরে চলে গেল। সেখান থেকে বেরিয়ে রক্ষীদের ঘরে গেল।
উরার দরবার ঘর থেকে লর্ডকে ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে রক্ষীরা অবাক হয়ে গেল। মেয়ে যোদ্ধাদের মধ্যে লরো বলল, কি হলো লর্ড, তুমি কিভাবে তোমার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে?
লর্ড বলল, সেই কাজী বন্দীটা উরাকে খুন করে পান্নার তালটা নিয়ে পালিয়েছে।
সব মেয়ে যোদ্ধারা তখন একযোগে বলে উঠল, উরাকে খুন করেছে! উরা তাহলে মৃত!
হা হা, উরা খুন হয়েছে। কিন্তু পান্নার তালটা চুরি গেছে।
জুলি মেয়েরা তখন উল্লসিত হয়ে ছুটে বেরিয়ে গায়ের পথে পথে এই সুখের সংবাদটা প্রচার করতে লাগল।
