টারজান এবার জিজ্ঞাসা করল, উরা কোথায় ঘুমোয়?
ওর সিংহাসনের পিছনে একটা ঘরে। কিন্তু এ কথা জানতে চাইছ কেন?
টারজান বলল, আমি তাকে হত্যা করতে যাচ্ছি। এছাড়া অন্য কোন পথ নেই।
কিন্তু কেন তুমি ওকে মারতে যাচ্ছ?
কারণ আমার একজন দেশবাসী কাজীদের হাতে বন্দী আছে। উরাকে মেরে জুলিদের সাহায্যে আমি তাকে মুক্ত করতে পারব। তার সঙ্গে অন্যান্য বন্দীদেরও মুক্ত করব।
উরা যে ঘরে বসে সে ঘর ছাড়া অন্য কোন পথ দিয়ে কি তার শোবার ঘরে যাওয়া যায়?
পথ একটা আছে, কিন্তু সে পথে তুমি যেতে পারবে না। আমাদের নিচের তলায় যে ঘরে শোয় উরা বাইরের ঐ উঠোনটার দিকে একটা জানালা আছে।
টারজান বলল, উরার জীবনযাত্রা সম্বন্ধে সব কিছু বলত। কে ওর কাছে থাকে। কখন খায়? কখন শোয় বা ওঠে?
লর্ড বলল, আমরা যতদূর জানি ওর কাছে কেউ শোয় না। রোজ সূর্য ওঠার পরেই ও ওঠে। ওর ঘরের মধ্য একটা ফুটো দিয়ে ওর প্রাতরাশ দেয়া হয়। ওর তিনটে ঘর আছে। সে সব ঘরে ও কি করে তা কেউ জানতে পারে না। কেউ সেখানে যেতে পায় না। ভয়ে কেউ কোন কথা বলে না। প্রাতরাশ খাওয়ার একঘণ্টা পর দরবার ঘরে মঞ্চের সিংহাসনে এসে বসে উরা; সেখানে অনেক অভিযোগ ওকে শুনতে হয়, বিচার করে শাস্তির বিধান করতে হয়। শিকারীদল ও যোদ্ধাদের নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়ে দিতে হয়। কৃষিকার্য সম্বন্ধেও যাবতীয় নির্দেশ দিতে হয়। সব কাজ সেরে তার ভিতরকার ঘরে চলে যায় উরা। তবে রাতের খাওয়াটা সে দরবার ঘরে বসে খায়।
টারজান বলল, ঠিক আছে।
কিন্তু চিতা?
সেটা দেখা যাবে।
টারজনের এক হাতে ছিল ভাঙ্গা জানালা থেকে নেয়া মোট একটা বড় রড। তাই নিয়ে জানালার বাইরে গিয়ে জানালার নিচেকার কাঠটা এক হাতে ধরে ঝুলতে লাগল। তারপর লাফ দিয়ে নিচে পড়ল।
লর্ড জানালার ধার থেকে দেখতে লাগল রুদ্ধ-নিঃশ্বাসে। নেমেই নিঃশব্দে ঘুমন্ত চিতাটার দিকে এগিয়ে গেল সে। কিন্তু অর্ধেক পথ যেতেই জেগে উঠল চিতাটা।
কালো চিতাটা যথাসাধ্য প্রচণ্ডতার সঙ্গে নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল টারজনের উপর। কোন গর্জন করল না। শুধু মাটির উপর ধুপধাপ শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নিশীথ রাতের নিস্তব্ধতাটাকে ভঙ্গ করল না।
টারজান তখন দু’হাতে সেই কাঠের মোটা রডটাকে ধরে এক আশ্চর্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তার দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিতাটার মাথায় ক্রমাগত মেরে চলেছিল।
কোনক্রমেই চিতাটা তার চোয়াল বার করা দাঁতগুলো বসিয়ে দিতে পারছিল না টারজনের গায়ে।
লর্ড যখন রুদ্ধশ্বাসে চিতার সঙ্গে টারজনের এই লড়াই দেখছিল তখন উরার ঘরের জানালা দিয়ে আর একজোড়া চোখ নিঃশব্দে দেখছিল সে লড়াই।
লাঠির ঘায়ে চিতার মাথাটার হাড়গুলো সব ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে গেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল চিতাটা। তা দেখে ভয় পেয়ে গিয়ে উরার ঘরের জানালা থেকে সেই চোখ জোড়াটা সরে গেল। নিঃশব্দে ভিতরের ঘরের অন্ধকারে চলে গেল।
চিতাটাকে বধ করার পর উরার ঘরের দিকে চলে গেল টারজান। খোলা জানালাটার ভিতর দিয়ে লাফিয়ে পড়ল ঘরের ভিতরে। গন্ধ শুঁকে দেখল সে ঘরে কোন লোক নেই। সে শুনেছে ভিতরে উরার তিনখানা ঘর আছে। কিন্তু কোন ঘরটাতে উরা আছে কে জানে? তার মনে হলো উরা তার ঘর থেকে চিতাটার সঙ্গে তার লড়াই দেখে ভয়ে ভিতরদিকে একটা ঘরে ঢুকে পড়েছে। সে নিশ্চয় রক্ষীদের ডাকতে যায়নি। তাহলে শব্দ হত হাঁক-ডাকের।
চাঁদের কিছুটা আলো ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ায় টারজান দেখল সেই ঘরের দেওয়ালে একটা দরজা রয়েছে। নিঃশব্দে দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ল সে। গন্ধ শুঁকে বুঝল কিছুক্ষণ আগে উরা সে ঘরে ছিল, কিন্তু এখন নেই। ঘরটা অন্ধকার।
সেই ঘর থেকে ভিতরে অন্য একটা ঘরে যাবার একটা দরজা ছিল। টারজনের মনে হল ঐ দরজা দিয়ে উরা ভিতরে আর একটা ঘরে চলে গেছে। সেই ঘরে যাবার জন্য সে পা বাড়াতেই পায়ের তলায় জালের দড়ি ঠেকল তার। তার সন্দেহ হলো এটা একটা ফাঁদ। তাকে ধরার জন্য পাতা আছে।
আর না এগিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ফিরে যাবার চেষ্টা করল টারজান। কিন্তু কোথা থেকে জালটা টানতেই মোটা দড়ি দিয়ে বোনা জালটায় আটকে পড়ল সে। শত চেষ্টা করেও জাল থেকে মুক্ত করতে পারল না কিছুতেই।
এমন সময় তার সামনে দরজাটা খুলে ভিতরের একটা আলোকিত ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল উরা। টারজান দেখল উরার পিছনে আলোকিত ঘরের দেওয়ালে অনেক মাথার খুলি সাজানো রয়েছে। একটা টেবিলের উপর মধ্যযুগীয় যাদুবিদ্যার নানা উপকরণ রয়েছে সাজানো। টেবিলের উপর পান্নার সেই তালটা থেকে একটা সবুজ আলো বিকীর্ণ হচ্ছিল।
উরা জালের মধ্যে আবদ্ধ টারজানকে বলল, আমরা ভেবেছিলাম তোমাকে পরে মারব। কিন্তু এখনই তোমাকে ভয়ঙ্করভাবে মারা হবে।
টারজান কোন কথা না বলে জালটাকে পরীক্ষা করে দেখল। জালের দড়িগুলো চামড়ার দড়ি দিয়ে বোনা।
উরার চোখে মুখে আর কোন ভয়ের চিহ্ন ছিল না। তার পরিকল্পনা সফল হওয়ায় সে খুশি হয়েছিল।
উরা বলল, এখানে তোমাকে কিছুক্ষণ ধরে পরীক্ষা করব। তারপর আমার প্রিয় পোষা এত ভাল চিতাটাকে মারার জন্য আমি চরম প্রতিশোধ নেব তোমার উপর। তীব্র যন্ত্রণা আর পীড়নের মধ্য দিয়ে তোমার মৃত্যুকে দীর্ঘায়িত ও বিলম্বিত করব। কিন্তু তুমি যাতে সে পীড়নের কিছু দেখতে না পাও তার জন্য তোমার চোখদুটোকে আগে নষ্টা করে দেব। উরার শক্তি এবার দেখ।
