লর্ড বলল, আমরা ওকে মাফা নদীর উৎসের কাছে বন্দী করি। ও অঞ্চলে কাজী ছাড়া আর কে আসবে?
উরা গর্জন করে উঠল, তুমি একটা আস্ত বোকা। আমি ওকে প্রথম দেখার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছি ও কাজী নয়।
এরপর টারজনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে উরা বলল, তুমি জুলিদের দেশে কি করছিলে?
টারজান বলল, আমার একজন হারানো সঙ্গীর খোঁজ করছিলাম।
তুমি কি ভেবেছিলে আমাদের দেশে সে আছে?
না, আমি তোমাদের দেশে আসতে চাইনি; আমি কাজীদের দেশে যেতাম।
তুমি মিথ্যা কথা বলছ। কাজীদের দেশ না হয়ে কেউ কখনো মাফা নদীর উৎসমুখে আসতে পারে না।
আমি কাজীদের দেশে না গিয়ে অন্য পথে এখানে এসেছিলাম।
উরা বলল, আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি কাজী নও, তুমি হচ্ছ মাফকার চর। তার দ্বারা নিযুক্ত এক চাকর। সে আমাকে খুন করার জন্য পাঠিয়েছে তোমাকে।
উরার প্রাসাদের দোতলার একটা ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছিল টারজান আর লর্ডকে। সে ঘরে ছিল একটামাত্র জানালা। জানালাটা কাঠের রড দিয়ে ঘন করে ঘেরা ছিল।
প্রহরী ঘরের দরজা বন্ধ করে চলে গেলে টারজান উঠে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল। সেদিন ছিল জ্যোৎস্না রাত। আকাশে কোন মেঘ ছিল না। চাঁদের আলোয় টারজান দেখল বাইরে পাঁচিল ঘেরা খানিকটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে।
টারজান এবার মুখ ঘুরিয়ে লর্ডকে বলল, আমি তখন তোমাকে বললাম আমি কাজী নই। কিন্তু তুমি তখন শুনলে না আমার কথা। শুনলে তোমাকে এই বিপদে পড়তে হত না।
লর্ড বলল, আমাকে হত্যা করার এটা একটা অজুহাত মাত্র। ওরা আমাকে মারার একটা সুযোগ খুঁজছিল। এই জুলিদের দেশে পুরুষদের প্রয়োজন আছে। তারা যুদ্ধ করে। উরা শুনেছে একদল লোক এখান থেকে ওদের ধাতুটাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে আবার উরাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রও জড়িয়ে আছে। কাজীদের ছাড়া এখান থেকে বাইরের জগতে যাবার অন্য কোন পথ নেই। তাই ভেবেছিলাম ঐ পান্না ধাতুটা মাফকাকে ঘুষ দিয়ে তাদের দেশ থেকে বেরিয়ে যাবার অনুমতি পাব। উরার বিশ্বাস আমিই এই ষড়যন্ত্রের নায়ক। তাই ও আমার জীবন নাশ করতে চায়।
উরা ইচ্ছা করলেই অবশ্য যে কোন সময়ে আমাকে মারতে পারে। কিন্তু সুযোগ খুঁজছিল।
লর্ড আরো বলল, শোনা যায় উরা আর মাফকা দুই যমজ ভাই। বহুদিন আগে ওরা নাকি কলম্বিয়া থেকে পালিয়ে আসে। সঙ্গে পান্নার তালটা ছিল। কাজীরা গলফান নামে হীরকখণ্ডটা কি করে পায় তা আমি জানি না। হয়ত ওরা কোথাও থেকে চুরি করে আনে। ওদের বিশ্বাস কাজীদের গলফান আর জুলিদের পান্নাই সব শক্তির উৎস। কিন্তু উরাকে না মারলে পান্নাটা পাওয়া যাবে না। আমরা তাই উরাকে মারতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সে স্বপ্ন ব্যর্থ হয়ে গেল। এখন আমাকে উরা সিংহের মুখে ফেলে দিয়ে মজা পাবে। আর তোমাকে ওরা টুকরো টুকরো করে কাটবে।
টারজান বলল, কিন্তু দু’জনের এই মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে তফাৎ কেন?
কারণ উরার ধারণা তোমার মস্তিষ্কে বুদ্ধি আছে। তোমার মাথাটাকে তাই চায় ওরা।
কিন্তু কি করে তা সম্ভব?
ওরা তা খাবে।
বুঝেছি। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের প্রথা আছে। ওদের ধারণা ওরা কারো মস্তিষ্কটা খেলে তার বুদ্ধিটা পাবে। কোন বীর শত্রুর হৃৎপিণ্ড খেলে তার সাহস পাবে। কোন দ্রুতগামী মানুষের পায়ের পাতা খেলে তার মত ছুটতে পারবে আর কোন তীরন্দাজের হাতের তালু খেলে তার মত তীর ছুঁড়তে পারবে।
যত সব বাজে কুসংস্কার।
টারজান বলল, তবে আমার ধারণা যদি তুমি পালাতে চাও তাহলে ওরা তোমাকে সিংহের মুখে ফেলতে পারবে না আর আমারও মাথা খেতে পারবে না।
পালাব? পালানোর কোন পথ নেই।
পথ অবশ্য আমি জানি না। তবে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
কি করে পালাব? দরজা জানালাগুলো দেখ। বাইরে জানালার নিচে তাকিয়ে দেখ। বাইরে আছে চিতাবাঘ।
টারজান আবার জানালার ধারে গিয়ে পরীক্ষা করল। তারপর বলল, জানালাটা অশক্ত।
এই বলে সে জানালাটা ভেঙ্গে দিয়ে দুটো কাঠের রড নিজে নিয়ে একটা রড লর্ডকে দিল। বলল, এইগুলোই হবে এখন আমাদের অস্ত্র।
লর্ড বলল, কিন্তু চিতাটা। আমরা পালাতে গেলেই চিতাটা চীৎকার করবে আর তখন প্রহরীরা ছুটে আসবে।
টারজান দেখল, বাইরে ফাঁকা জায়গাটার মধ্যে একটা বড় কালো চিতাবাঘ তার পানে তাকিয়ে গর্জন করছে।
টারজান বলল, আমরা গাঁয়ের বাইরে গিয়ে পড়লে তুমি পথ চিনতে পারবে? নাকি মাফকার মত উরার ইচ্ছাশক্তি আবার তোমায় ফিরিয়ে আনবে?
এই জন্যই ত উরাকে আমরা খুন করতে চেয়েছিলাম।
জুলিদের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কি রকম? তারা কি ওর প্রতি অনুরক্ত?
ওরা তাকে ভয় করে এবং ঘৃণা করে। ওদের উপর উরার প্রতাপের একমাত্র ভিত্তি হলো ভয়।
সব মেয়েরাই?
হ্যাঁ, প্রত্যেকেই।
উরার মৃত্যু হলে ওরা কি করবে?
যে সব কৃষ্ণকায় ও শ্বেতাঙ্গ বন্দী হয়ে আছে তারা সবাই একযোগে মেয়েদের সঙ্গে বাইরের জগতে পালিয়ে যাবে। এখানকার মেয়েরা বিদেশীদের মুখ থেকে বাইরের জগতের নানা কথা শুনে সেখানে যেতে চায় তারা। শ্বেতাঙ্গরা জুলিদের বুঝিয়েছে, যে পান্নার তালটা উরার কাছে আছে এটা এক মূল্যবান ধাতু। ওটা বিক্রি করলে অনেক টাকা হবে। তারা অনেক সুখে থাকতে পারবে।
কিন্তু উরাকে ওরা খুন করেনি কেন এতদিন?
কারণ এক অতিপ্রাকৃত শক্তির ভয়। ওরা নিজের হাতে ত মারতে পারবেই না, আবার কাউকেও মারতে দেবে না।
