উড একসময় চীৎকার করে টারজানকে বলল, তুমি চলে যাও। আমি মাফকার কবলে পড়ে গেছি। মাফা নদী পার হয়ে কাজীদের দেশে যাচ্ছি আমি।
টারজান পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি আমার সঙ্গে যাবে বলেছিলে ত?
উড বলল, বলেছিলাম, কিন্তু আমার পাগুলো ওইদিকে টানছে। অন্য দিকে যেতে পারছি না আমি।
টারজান উডকে কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, মাফকা যে ওষুধ তৈরি করে তার থেকে বেশি শক্তিশালী ওষুধ আছে আমার কাছে।
ঘণ্টাখানেক পথ চলার পর এক জায়গায় উডকে তার কাঁধ থেকে নামিয়ে দিল। বলল, এবার তুমি বোধ হয় নিজেই হাঁটতে পারবে।
এই বলে টারজান আবার উত্তর দিকে হেঁটে যেতে লাগল।
এদিকে উড মুখে এক আতঙ্কের ছাপ নিয়ে দক্ষিণ দিকে ছুটতে লাগল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে ধরে ফেলল টারজান।
উড আর্তকণ্ঠে টারজানকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি মনে করো আমি কোনদিন শয়তান মাফকার ভয়ঙ্কর ইচ্ছাশক্তির কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারব?
টারজান বলল, হয়ত পারবে না। কারণ আমি শুনেছি আফ্রিকার অনেক সাধারণ যাদুকর অনেক বন্দী পলাতককে অনেক বছর পরেও শত শত মাইল দূর থেকে ফিরিয়ে আনে তাদের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা। মাফকার শক্তি নিশ্চয় সাধারণ যে কোন যাদুকরের শক্তির থেকে বেশি।
সে রাতে নিউবারি নদীর ধারে এক জায়গায় দু’জনে শুয়ে পড়ল। পরদিন সকালে উঠে টারজান। দেখল উড চলে গেছে।
উড চলে যাওয়ার পর তৃতীয় দিন বিকালবেলায় টারজান উঁচু পাহাড়ের ধারে এসে থামল। তার সামনে এক খরস্রোতা পার্বত্য নদী বয়ে যাচ্ছিল। তার মনে হলো, কাজী আর জুলিদের দেশের মধ্যবর্তী এক জায়গায় এসে পড়েছে সে।
তার পিছনে ছিল পূর্ব দিকে উঁচু পাহাড়। তার সামনে পশ্চিম দিক থেকে বইতে থাকা বাতাসে বেবুন, চিতাবাঘ আর বুনো মোষের গন্ধ পাচ্ছিল। কিন্তু টারজান বুঝতে পারেনি তার পিছনে পাহাড়ের মাথা থেকে কয়েক জোড়া চোখ লক্ষ্য করছে তাকে।
পাহাড়টার উপরে তখন ছিল এগারজন যোদ্ধা। তাদের মধ্যে দু’জন ছিল দাড়িওয়াল শ্বেতাঙ্গ আর পাঁচজন ছিল কৃষ্ণকায় আদিবাসী। তাদের হাতে ছিল তীর ধনুক আর বর্শা। পিঠে ঢাল। তাদের গলায় ছিল বিভিন্ন জন্তুর দাঁতের ও হাড়ের মালা।
যোদ্ধাদের মধ্যে বলিষ্ঠ চেহারার একজন শ্বেতাঙ্গ ছিল দলনেতা। তার মাথার ও দাড়ির চুল কিছু কিছু পাকা ছিল। তার চোখে মুখে বুদ্ধির ছাপ ছিল। দলের লোকেরা তাকে লর্ড বলে ডাকছিল।
তিনদিন ধরে অনেক পাহাড় ডিঙ্গিয়ে খাদ পার হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল টারজান। তার উপর চিতাবাঘদের জ্বালায় গতরাতে মোটেই ঘুম হয়নি তার।
তখনো ঘণ্টাখানেক বেলা ছিল। একটা ঝোপের পাশে নদীর ধারে ঢালু জায়গাটায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল টারজান।
তার যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন সে দেখল তখনো দিনের আলো নিভে যায়নি। দেখল প্রায় ডজনখানেক সাদাকালো চেহারার যোদ্ধা ঘিরে আছে তাকে। তাদের হাতে সে এখন বন্দী। এখন করার কিছু নেই। মুক্তির জন্য চেষ্টা করেও কোন লাভ নেই। তাই চুপচাপ শুয়ে রইল টারজান।
টারজনের কোন ভয় উত্তেজনার চিহ্ন দেখতে না পেয়ে আশ্চর্য হলো যোদ্ধারা।
অবেশেষ লর্ড বলল, তাহলে কাজী, তুমি এখন আমাদের হাতে বন্দী। কারণ আমরা জানি জুলি আর কাজী ছাড়া এই পার্বত্য অঞ্চলে অন্য কেউ আসে না।
এরপর লর্ড তার লোকদের টারজনের হাত দুটো পিছনের দিক করে বেঁধে দিতে বলল।
তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। কাজী টারজানকে নিয়ে যোদ্ধারা পার্বত্য পথে দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল তাদের বস্তিতে। টারজান পথটা ঠিক চিনতে পারল না।
অবশেষে এক সমতল উপত্যকায় এসে পড়ল ওরা। টারজান দূরে অনেকগুলো জ্বলন্ত আগুনের আলো দেখে বুঝতে পারল ওটাই ওদের গা।
ওরা গাঁয়ের গেটের সামনে এসে পড়লে লর্ড হাঁক দিয়ে কি বলল। কয়েকজন সশস্ত্র নারী যোদ্ধা। পাহারা দিচ্ছিল গেটে। তাদের দেখে টারজনের মনে হল তারা সবাই শ্বেতাঙ্গ।
গাঁয়ের ভিতরে ঢুকে জ্বলন্ত আগুনের আভায় টারজান দেখল পথের ধারে ধারে সারবন্দী অনেক পাথরের ঘর রয়েছে। ঘরগুলোর দেওয়াল পাথরের আর ছাউনিগুলো শুকনো ঘাসের। গাঁয়ের মাঝখানে একটা দোতলা পাথরের বাড়ি রয়েছে।
টারজান আরো দেখল কতকগুলো সামনে জ্বলন্ত আগুনের পাশে কতকগুলো মেয়ে বসেছিল। তাদের পাশে ছিল কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। টারজানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে মেয়েরা কৌতূহলী হয়ে উঠল।
ছয়জন নারী প্রহরীসহ লরো লর্ড ও টারজানকে উরার ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল।
একটা বড় ঘরে ঢুকে টারজান দেখল দূরে এক ধারে একটা উঁচু মঞ্চের উপর মাথার একরাশ চুল নিয়ে খুঁড়ি মোটা একটা লোক বসে আছে। তার চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলজ্বল করছিল। প্রায় বিশজন সশস্ত্র নারীযোদ্ধা চারদিক থেকে ঘিরে ছিল মঞ্চটাকে।
টারজানকে মঞ্চের সামনে নিয়ে যাওয়া হলে তার দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল উরা। দেখে কেমন যেন বিস্মিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল সে। তারপর টারজানকে প্রশ্ন করল, আমার ভাই কেমন আছে?
টারজান বলল, আমি তোমার ভাইকে চিনি না।
উরা রাগতভাবে বলল, কি, আমার মিথ্যাবাদী, খুনী, চোর ভাইকে চেন না তুমি।
টারজান ঘাড় নেড়ে বলল, না আমি তোমার ভাইকে চিনি না। আমি কাজী নই।
উরা তখন লর্ড এর উপর অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, তুমি বলেছিলে তুমি একজন কাজীকে বন্দী করে এনেছ?
