সেদিন রাত্রিতে চারজনে মিলে এক পরামর্শ সভায় বসলাম। স্পাইক ও স্ট্রোল বলল, এখন আমাদের উচিত ঐ শব্দ লক্ষ্য করে এক অভিযান চালানো। আমরা বেশি কিছু সঙ্গে নেব না। শুধু একটা করে রিভলবার, রাইফেল, কিছু অস্ত্রশস্ত্র আর খাবার। বাকি সব রেখে যাব শিবিরে।
পরদিন সকালে নীরবে প্রাতরাশ করার পর সঙ্গে যা নেবার নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
পাঁচ মাইল যাবার পর পথের উপর একজন শ্বেতাঙ্গ লোককে শুয়ে থাকতে দেখলাম। লোকটির বয়স পঞ্চাশের মধ্যে। সে যেমন অতি বৃদ্ধ নয়, তেমনি ক্ষুধা-তৃষ্ণাতেও কাতর বলে মনে হলো না। তবু মনে হলো চলার শক্তি নেই তার।
আমরা তার পাশে থামতেই সে চুপি চুপি আমাদের বলল, ফিরে যাও।
তার কথা শুনে বুঝলাম সে এত দুর্বল যে কথা বলতে পারছে না।
আমার কাছে ফ্লাস্কে ভরা কিছু ব্রান্ডি ছিল। লোকটিকে তাই কিছুটা খাইয়ে দিতে একটু শক্তি ফিরে পেল সে।
তখন লোকটি বলল, ঈশ্বরের নামে বলছি, তোমরা ফিরে যাও। তোমরা সংখ্যায় বেশি নেই। ওরা তোমাদের ধরে ফেলবে। আমাকে যেমন বিশ বছর ধরে আটকে রেখেছিল তেমনি তোমাদেরকেও আটকে রাখবে। তোমরা পালাতে পারবে না। কুড়ি বছর ধরে আমি কত বার পালাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাদের শক্তির কাছে হার মেনেছি আমি। আমার অবস্থা দেখছ। আমি মুমূর্ষ। তোমরা বরং ফিরে গিয়ে শ্বেতাঙ্গদের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে এসে আক্রমণ করবে ওদের। নিগ্রোরা ওদেশে ঢুকবে না। এ হলো কাজীদের দেশ। কিন্তু সমস্ত শক্তি আছে একটি মাত্র লোকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। সে-ই সব মেয়েদের শেখাচ্ছে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কে সে?
সে বলল, মাফকা।
সে-ই কি সর্দার?
না, সে সর্দার নয়, তবে সর্বশক্তিমান। সে যাদুকরের থেকেও অনেক বেশি শক্তিমান। সে হচ্ছে আস্ত একটা শয়তান।
আমি লোকটিকে বললাম, তুমি কে?
সে বলল, আমি মাউন্টফোর্ড।
লর্ড মাউন্টফোর্ড?
সে বলল, হ্যাঁ।
টারজান উডকে জিজ্ঞাসা করল, লোকটি তোমাকে হীরের কথা কিছু বলেছিল?
উড তখন টারজনের মুখপানে তাকিয়ে বলল, তুমি কি করে জানলে এ কথা?
টারজান বলল, কিছুক্ষণ আগে তুমি ভুল বকছিলে। তার থেকে জানতে পারি।
উড বলল, কাজীদের হীরে আকারে সত্যিই বিরাট, তার দাম হবে প্রায় দশ মিলিয়ন ডলার। মাউন্টফোর্ডের কাছ থেকে হীরের কথাটা শুনে স্পাইক ও স্ট্রোল হীরের লোভে কাজীদের দেশের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। মাউন্টফোর্ডের কথায় মোটেই ভয় পেল না তারা। তাছাড়া তখন হয়ত ইচ্ছা করলেও ফিরতে পারতাম না আমরা।
টারজান তখন উডকে বলল, তারপর মাউন্টফোর্ডের কি হলো?
উড বলল, তিনি একটি মেয়ের সম্বন্ধে বিড় বিড় করে কি বলছিলেন। কিন্তু তখন মৃত্যুর আর দেরী ছিল না। বেশি কিছু বলতে পারলেন না। তাঁর কথাটা ছিল …. মেয়েটাকে বাঁচিও। মাফকাকে হত্যা করো।
এই কথা বলেই মারা গেলেন মাউন্টফোর্ড।
আমরা কিন্তু কাজীদের দেশে যাওয়ার পরেও তিনি যে লোকটার কথা বলেছিলেন সেই মাফকা লোকটাকে দেখতে পাইনি। শুনেছি বহু শতাব্দী আগে নির্মিত এক প্রাচীন আমলের প্রাসাদে থাকত সে। সেই প্রাসাদেই হীরে থাকত। কেউ বলত প্রাসাদটা নির্মাণ করে পর্তুগীজরা তাদের আবিসিনিয়া অভিযানের সময়ে। আবার ভন আইক বলত এটা নির্মিত হয় ক্রুসেড ধর্মযুদ্ধের কালে। এ প্রাসাদ যারাই গড়ে তুলুক, মোট কথা কাজীরা করেনি।
কাজীরা মনে করে বড় হীরকখণ্ডটাই ওদের যত কিছু শক্তির উৎস। তারা তাই প্রাসাদটাকে চারদিক থেকে কড়া পাহারা দিয়ে ঘিরে রেখেছে। মাফকা আর তাদের রানীও সেই প্রাসাদেই থাকে।
এ কথা বলতে আমার কোন দ্বিধা নেই যে ওদের রানী হলো সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী নারী। তার মত সুন্দরী মেয়ে জীবনে আমি কোথাও কখনো দেখিনি। এক এক সময়ে রানীর মধ্যে নারীসুলভ দয়া-মায়া, মমতা প্রভৃতি গুণগুলোর পূর্ণ পরিচয় পেয়েছি, কিন্তু আবার পরমুহূর্তেই তাকে মনে হয়েছে এক নিষ্ঠুর শয়তান, যেন একটা আস্ত রাক্ষসী। রানীকে ওরা বলে কনফালা আর হীরকখণ্ডটাকে বলে কনফাল।
এই রানীই তার নারীসুলভ দয়ামায়ার বশবর্তী হয়ে কোন এক দুর্বল মুহূর্তে আমাকে মুক্ত করে দেয়। পরে সে হয়ত অনুতপ্ত হয়ে মাফকাকে বলে দেয়, মাফকার শক্তিবলেই আমার এই শোচনীয় অবস্থা হয়।
তারা এখনো সেখানে বন্দী হয়ে আছে।
আমি মুক্তি পেয়ে ভাবি শ্বেতাঙ্গদের একটি বড় দল নিয়ে এসে তাদের মুক্ত করব।
টারজান বলল, তারা কি এখনো জীবিত আছে?
উড বলল, হ্যাঁ। কাজীরা তাদের বাঁচিয়ে রেখে বিয়ে করবে। কাজীদের দেশে সবাই মেয়ে। তারা একদিন কৃষ্ণকায় ছিল। তাই তারা শ্বেতাঙ্গদের বিয়ে করে ওরাও শ্বেতাঙ্গ হতে চায় এবং কৃষ্ণকায় নিগ্রোদের তাড়িয়ে দেয়। শ্বেতাঙ্গদের বিয়ে করা তাদের ধর্মের একটা অঙ্গ।
টারজান বলল, যদি ওরা পুত্র সন্তানদের এইভাবে মেরে ফেলে তাহলে যোদ্ধা পায় কোথা থেকে?
উড বলল, এখানে মেয়েরাই যুদ্ধ করে। আমি ওদের যুদ্ধ কখনো দেখিনি। তবে যা শুনেছি তাতে মনে হয় যোদ্ধা হিসেবে ওরা বড় ভয়ঙ্কর, বড় হিংস্র।
এ ছ’মাস আগের ঘটনা। বব পেয়েছে এক দুঃসাহসিক অভিযানের রোমাঞ্চ। আমি পেয়েছি লেখার উপাদান। স্পাইক আর স্ট্রোল হীরে পায়নি, কিন্তু তারা প্রতেকে সাতজন করে স্ত্রী পেয়েছে। গনফালা রানী হিসেবে শ্বেতাঙ্গ বন্দীদের স্ত্রী নির্বাচন করে দেয় ওদের মধ্য থেকে। কিন্তু গনফালা নিজে কাউকে বিয়ে করতে পারে না।
