লোকটাকে নিরুত্তর দেখে টারজান বলল, তুমি ইংরেজি জান?
লোকটি বলল, হ্যাঁ। আমি একজন আমেরিকান। আমি আহত নই। কয়েকদিন কিছুই খেতে পাইনি আমি। আজ একেবারেই জল পাইনি।
লোকটিকে তার কাঁধের উপর তুলে দিয়ে টারজান বলল, যেখানে খাদ্য ও জল পাওয়া যাবে সেখানে যাব আমরা। তারপর তোমার সব কথা শুনব।
অবশেষে জলের ধারে এসে টারজান লোকটিকে একটা গাছের তলায় শুইয়ে দিল। এরপর জল এনে লোকটির মাথা তুলে ঠোঁট দুটো ফাঁক করে কয়েক ফোঁটা জল ঢেলে দিল। ঠাণ্ডা জল দিয়ে লোকটির চোখ মুখ ধুইয়ে দিল।
টারজান তাকে বলল, এখন শান্ত হও। চুপ করে থাক। আমি খাবার নিয়ে আসছি।
অল্পক্ষণ পরেই খাবার নিয়ে এসে টারজান দেখল লোকটি শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। তখন রাত্রির অন্ধকার নেমে আসছে ধীরে ধীরে।
টারজান তার তীর ধনুক দিয়ে একটা পাখি আর একটা খরগোস মেরে এনেছিল। মরা পাখিটার উপর একতাল কাদা লেপে দিয়ে আগুন জ্বেলে তাতে পোড়াতে দিল। মরা খরগোসটাকে একটা কাঠিতে গেঁথে আগুনে ঝলসে নিল। আগুনে কাদাটা শুকিয়ে গেলে শুকনো মাটির সঙ্গে পাখির গায়ের পালকগুলোও উঠে গেল।
পেট ভরে খাবার ও জল খেয়ে লোকটি টারজানকে বলল, এবার বল তুমি কে? কেনই বা আমাকে বাঁচালে।
টারজান বলল, তার আগে বলত তুমি কে? এ অঞ্চলে কি করছিলে তুমি?
লোকটি এবার বলল, আমার নাম উড, আমি একজন লেখক। বেশি টাকাকড়ি না নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলাম। এই জন্যই এক নির্জন বনপথে আমাকে অসহায় ও বিপন্ন অবস্থায় দেখেছিলে তুমি। আমার অবস্থা যত অসহায়ই হোক আমার মাথায় এমন এক অভিজ্ঞতার কথা আছে যা আজ পর্যন্ত কোন ভ্রমণ কাহিনীতে কেউ লিখতে পারেনি। আমি যে সব জিনিস দেখেছি তা সভ্য জগতের কোন লোক স্বপ্নেও দেখেনি কখনো এবং সে সব জিসিন বিশ্বাস করতে পারবে না তারা। আমি নিজের চোখে দেখেছি এবং নিজের হাতে ধরেছি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় হীরকখণ্ড। আমার মনে হচ্ছে আমি মনে করলে তা সঙ্গে করে আনতেও পারতাম।
আবার পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠা সুন্দরী এবং নিষ্ঠুরতমা নারীকেও দেখেছি। আমার মনে হয় আমি তাকেও আনতে পারতাম আমার সঙ্গে। আমি তাকে ভালবাসতাম, এখনো বাসি। আবার তাকে ঘৃণাও করি, মাঝে মাঝে অভিশাপ দিই তাকে। ঘৃণা আর ভালবাসা-এই দুটি পরস্পর-বিরুদ্ধ আবেগ।
আর লেডী মাউন্টফোর্ডের রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কথা নিশ্চয় শুনে থাকবে?
টারজান বলল, কে তা না শুনেছে।
লোকটি বলল, আজ হতে কুড়ি বছর আগে তারা সভ্য জগৎ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের সম্বন্ধে আজও কত গুজব রটে চারদিকে। এই রহস্যময় ব্যাপারটা এমনইভাবে মায়ায় জড়িয়ে ফেলে আমার মনটাকে যে এই গুজবের সত্যাসত্য যাচাই করে দেখার জন্য নিজেই এক অভিযানে বার হবার মতলব করি আমি।
আমি বব ভ্যান আইককে আমার পরিকল্পনার কথা বলতেই সে আমার সঙ্গে এক অভিযানে যেতে। চাইল এবং খরচপত্রের দায়িত্ব বহন করতে চাইল। ভাবলাম আমার পরিকল্পনাটা অবশ্যই সাফল্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে এবার।
পুরো একটি বছর ধরে ইংল্যান্ড ও আফ্রিকায় অনুসন্ধানকার্য চালিয়ে বেশ বুঝতে পারলাম যে নিউবারি নদীর ধারে রুডলফ হ্রদের উত্তর-পশ্চিম দিকে কোন একটা জায়গা থেকে নিখোঁজ হন লর্ড ও লেডী মাউন্টফোর্ড।
আফ্রিকার জীবনযাত্রার সঙ্গে অভিজ্ঞতা আছে এমন কিছু শ্বেতাঙ্গ শিকারী নিয়ে এক সফরী গড়ে তুললাম আমরা।
নিউবারি নদীর ধারে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত ভালই চলল আমাদের অভিযান।
ক্রমে আমাদের দল ছেড়ে চলে যেতে লাগল আমাদের নিগ্রোভৃত্যরা। কেউ কোন কারণ বলল না।
অবশেষে নিগ্রোভূত্যদের একজন সর্দার আমাদের একদিন বলল, যে সব আদিবাসীদের সঙ্গে এর আগে তাদের কথা হয়েছে তারা তাদের বলেছে নিউবারি নদীর উপরদিকে উত্তরে এক ভয়ঙ্কর উপজাতি আছে। তাদের দেশে কোন পুরুষ নেই, সবাই মেয়ে। কিন্তু তারা বড় নিষ্ঠুর, বড় নির্মম। তাদের দেশে কোন নিগ্রো গিয়ে পড়লে তাকে হয় তারা ক্রীতদাস করে রাখবে চিরদিনের জন্য, না হয় তাকে হত্যা করবে। তারা এক যাদু জানে, তাদের হাতে এমন এক অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে যার জন্য যদিও তাদের কোন বন্দী তাদের হাতছাড়া হয়ে কোনরকমে পালিয়ে আসে তাহলেও তার নিষ্কৃতি নেই। সেই পলাতক বন্দী তার নিজের দেশে পৌঁছনোর আগে কোন না কোনভাবে মৃত্যু ঘটে তার। যুদ্ধ করে সেই উপজাতিয় মেয়েদের পরাজিত বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। কারণ ওরা মানুষ নয়, ওরা নারীরূপিনী রাক্ষসী।
আমাদের অভিযাত্রীদলে স্পাইক ও স্ট্রোল নামে যে দু’জন শিকারী ছিল, আমি সর্দারের,কথাটা তাদের জানাতেই তারা হেসে উড়িয়ে দিল কথাটা।
তাই তারা অবশিষ্ট নিগ্রোদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে লাগল। পরদিন সকালে দেখা গেল একজন নিগ্রোভৃত্যও আমাদের দলে নেই। আমরা তখন মাত্র চারজন শ্বেতাঙ্গ ছাড়া আর কেউ ছিল না আমাদের দলে। অথচ সঙ্গে যা মালপত্র ছিল তা বহন করার জন্য পঞ্চাশজন লোকের দরকার। বব, ভন আইক, স্পাইক আর স্ট্রোল- আমরা তখন ছিলাম মোট এই চারজন।
এ রকম পরিস্থিতিতে জীবনে কখনো পড়িনি এর আগে। কোন প্রত্যক্ষ বিপদ নেই, কোন প্রত্যক্ষ ভয়ের বস্তু নেই। আমাদের কেবলি মনে হত অদৃশ্য অবস্থায় কারা যেন লক্ষ্য করছে আমাদের সব সময়। তার উপর মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেতাম।
