সিংহটার বাসা এখান থেকে অনেক দূরে উত্তর দিকে হলেও এ জায়গাটা অচেনা নয় তার।
দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে এগিয়ে আসা লোকটা হলো টারজান।
সে এখানে এসেছে এক সম্রাটের আদেশে একটি গুজবের বিষয়ে তদন্ত করতে। গুজবটা হলো এই যে ইউরোপীয় শক্তি নাকি ঘুষ নিয়ে স্থানীয় এক উপজাতি দলের সর্দারকে হাত করছে। তখন যুদ্ধ চলছিল সারা দেশ জুড়ে।
টারজান পথ চলতে চলতে তার সামনে সাদা চকচকে কি একটা বস্তুকে পড়ে থাকতে দেখল। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সে দেখল শুধু একটা মাথার খুলি নয় একটা গোটা নরকঙ্কাল পড়ে রয়েছে। আরও দেখল কঙ্কালটা অনেক দিন ধরে পড়ে আছে। কিছু কাঁটা গাছ গজিয়ে উঠেছে তার মধ্যে থেকে। দেখল তার পাশে একটা ভাঙ্গা লাঠির ডগায় এক টুকরো রেশমী কাপড়ে বাঁধা একটা চিঠি। কাপড়টা শুকিয়ে মড়মড়ে হয়ে গেলেও তার ভিতরে চিঠিটা ঠিক আছে।
টারজান চিঠিটা খুলে দেখল সেটা ইংরেজিতে লেখা এবং হাতের লেখাটা বেশ পরিষ্কার। চিঠিতে লেখা আছে, জানি না এ চিঠি কার হাতে পৌঁছবে। আমি এই চিঠি একজনের মাধ্যমে পাঠাচ্ছি, কিন্তু জানি না সে এই অভিশপ্ত দেশ থেকে বার হতে পারবে কি না। সে আশা আমি করি না। তবে যদি কোনদিন এ চিঠি কোন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির হাতে পড়ে তাহলে তিনি যেন নিকটবর্তী কোন রেসিডেন্ট কমিশনার বা কোন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন যাতে তারা তাড়াতাড়ি আমাদের সাহায্যের ব্যবস্থা করতে পারেন।
আমি আর আমার স্ত্রী রুডলফ উত্তরাঞ্চলে অভিযানে বেরিয়েছিলাম সে আজ বহুদিন আগের কথা। আমরা তখন যে অঞ্চলে ছিলাম সে অঞ্চলে এক ভয়ঙ্কর উপজাতি বাস করত। নানারকম গুজব শুনে আমাদের ভৃত্যেরা আমাদের ছেড়ে পালিয়ে যায়। তবু আমরা যে কোন অতিপ্রাকৃত শক্তির টানে এগিয়ে চলেছিলাম।
মাফা নদী যেখানে নিউবারি নদীতে পড়েছে সেইখানে একটা খাদ পার হয়ে একটা মালভূমিতে গিয়ে পড়তেই কাজী নামে এক ভয়ঙ্কর নারী উপজাতির মেয়েরা ধরে ফেলল আমাদের। এক বছর পর আমার কন্যা জন্মগ্রহণ করে। কন্যাসন্তান প্রসব করার সঙ্গে সঙ্গেই আমার স্ত্রীকে বধ করে কাজীদের নারী শয়তানরা। আমার স্ত্রী পুত্র সন্তান প্রসব করলে মারত না তারা। তারা শ্বেতাঙ্গ লোক চায়। তাই আমাকে আর আরো বারোজন শ্বেতাঙ্গ বন্দীকে হত্যা করেনি তারা।
যে জলপ্রপাত থেকে উৎসারিত হয়েছে মাফা নদী সেই জলপ্রপাতের উপরে এক বিস্তৃত মালভূমির উপরে অবস্থিত কাজীদের দেশটা। জায়গাটা কিন্তু খুবই দুর্গম। কেমলমাত্র মাফা নদী আর নিউবারি নদীর সঙ্গমস্থলের কাছ দিয়ে যাওয়া যায়।
একমাত্র সশস্ত্র শ্বেতাঙ্গদের বড় রকমের একটা দল অভিযান চালিয়ে আমাকে ও আমার মেয়েকে উদ্ধার করতে পারে কাজীদের কবল থেকে। আমার মনে হয় কৃষ্ণকায় কোন আদিবাসী এ দেশে প্রবেশ করবে না কিছুতেই। কাজী মেয়েরা শয়তানের মত লড়াই করে। তাদের এক অদ্ভুত অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে। আমি নিজের চোখে তাদের সে শক্তির নিদর্শন দেখেছি।
এমন কি শ্বেতাঙ্গদের এক বড় বাহিনীও কাজীদের কাছে হেরে যেতে পারে। কারণ অতি প্রাকৃত শক্তিসমূহের সঙ্গে লড়াই করে পেরে ওঠা সম্ভব নয়।
কাজীদের দখলে আছে প্রচুর পরিমাণে হীরে। আমি যতদূর জানি কাজীদের হীরের ওজন হলো ছয় হাজার ক্যারেট আর দাম হবে দু’লক্ষ পাউন্ড। কাজেই বিপদের ঝুঁকির তুলনায় পুরস্কারটাও কম নয়।
এ চিঠি কারো মারফৎ বাইরের জগতে পাঠাতে পারব এ আশা আমি কোনদিন করিনি। পরে একদিন এদেরই এক নিগ্রোগুপ্তচরকে ঘুষ দিয়ে বশ করে এ চিঠি বয়ে নিয়ে যেতে রাজি করিয়েছি।
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি এ চিঠি যেন যথাসময়ে কোন যোগ্য ব্যক্তির হাতে পৌঁছায়। ইতি মাউন্টফোর্ড।
চিঠিখানার শুরু হতে শেষ পর্যন্ত দু’বার পড়ল টারজান। মাউন্টফোর্ড! সে মনে করে দেখল অনেকদিন আগে লর্ড ও লেডী মাউন্টফোর্ড-এর রহস্যময় নিখোঁজের কথা সে শুনেছিল। সেই মাউন্টফোর্ড এখনো বেঁচে আছে এ কথা সে ভাবতেই পারেনি।
এতদিনে আসল খবরটা জানতে পারল, কিন্তু বড় দেরী হয়ে গেছে। কুড়ি বছর হয়ে গেছে লেডী মাউন্টফোর্ড মারা গেছেন। লর্ড মাউন্টফোর্ড আজ বেঁচে আছেন কি না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। ছোট থেকে এই সব অসভ্য বর্বর নারীদের মাঝখানে তাদের কন্যাও কখনো এতদিন বেঁচে থাকতে পারে না।
এবার সে মন থেকে এ সব কথা সরিয়ে দিয়ে বাস্তাব পরিবেশের দিকে মন দিল।
একটা শকুনির লক্ষ্যবস্তুটার দিকে এগিয়ে গেল টারজান। দেখল একটা সিংহও একটা উঁচু জায়গা থেকে নেমে আসছে একই লক্ষ্যের দিকে। সিংহটা যেমন টারজনের উপস্থিতিটাকে গ্রাহ্য করল না তেমনি টারজানও সিংহটাকে আসতে দেখেও তার গতি পরিবর্তন করল না।
এইভাবে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে গিয়ে একটি শ্বেতাঙ্গ লোকের শায়িত দেহ দেখতে পেল।
টারজান দেখল সিংহটা শুধু কৌতূহলের বশেই ঝাঁপ দিয়েছে লোকটার উপরে। সে ক্ষুধার্ত নয়। তার পেট ভর্তি।
লোকটি দেখল সিংহটা একেবারে তার কাছে এসে পড়তেই একটা নগ্নপ্রায় লোকও সিংহের মত গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসতে লাগল।
টারজান এবার লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, তুমি কি আহত না ক্ষুধা-তৃষ্ণায় এমন দুর্বল হয়ে পড়েছ?
যার মুখ থেকে পশুর গর্জন বেরিয়ে এসেছিল তাকে ভদ্রলোকের মত ইংরেজিতে কথা বলতে শুনেও তেমনি আশ্চর্য হয়ে গেল লোকটি। সে দেখল সিংহটা যেদিক থেকে এসেছিল সেই দিকেই চলে গেল।
