আমিও তোমার সঙ্গে যাব। জায়গাটা কোথায়? চিনতে পারবে তো?
বেশি দূর নয়, কয়েক মাইলের বেশি হবে না; তবু খুঁজে নাও পেতে পারি।
আমি পারব, টারজান বলল।
কেমন করে? বুড়ো টাইমার শুধাল।
গা-ইয়াটের পায়ের ছাপ দেখে; সেটা এখনও স্পষ্টই আছে।
বুড়ো টাইমার তখন টারজনের কব্জির তার খুলে গোড়ালির তার খুলতে ব্যস্ত। এক মুহূর্ত পরেই টারজনের বন্ধন-মুক্তি ঘটল। এক লাফে সে উঠে দাঁড়াল।
চলে এস! গা-ইয়াট যেখানে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেই দিকটা দেখিয়ে টারজান জোর কদমে ছুটল।
বুড়ো টাইমার তার সঙ্গে সমান তালে ছুটতে পারল না; ক্ষুধায় ও ক্লান্তিতে সে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বলল, তুমি এগিয়ে যাও। তোমার সঙ্গে সমান গতিতে আমি ছুটতে পারছি না। কিন্তু সময় নষ্ট করা চলবে না। মেয়েটি সেখানে একা রয়েছে।
টারজান আপত্তি জানিয়ে বলল, একা রেখে গেলে তুমি পথ হারিয়ে ফেলবে। দাঁড়াও ব্যবস্থা করছি। নকিমাকে ডাকতেই সে গাছ থেকে লাফ দিয়ে টারজনের কাঁধে এসে বসল। টারজান বলল, তুমি টার্মাঙ্গানির কাছে থাক। ওকে পথ দেখিয়ে আমার পিছু পিছু নিয়ে এস।
দু’জনকে আলাপ করতে দেখে বুড়ো টাইমার তো অবাক। মানুষ আর বানরে কথা বলছে, এ যে অবিশ্বাস্য অথচ যা সে চোখে দেখছে, কানে শুনছে তাতো মায়া নয়, খাঁটি সত্য ঘটনা।
অসহায় সংকটে পড়ে কালি বাওয়ানা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। লোকটি যখন বামনদের হাত থেকে উদ্ধার করে আনল তখন তবু তার মনে কিছুটা স্বস্তির ভাব এসেছিল; তার সঙ্গে তুলনায় এখন তার পরিস্থিতি আরও অসহ্য মনে হতে লাগল। পরন্তু, বিপদের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত দুঃখ।
বুড়ো টাইমার যে অস্থায়ী আস্তানাটা তার জন্য বানিয়েছিল সেদিকে তাকিয়ে মেয়েটির দুই গাল বেয়ে চোখের জল ঝরতে লাগল। তার হাতের তৈরি ধনুকটা তুলে তাতে ঠোঁট দুটি ছোঁয়াল। আর কোনদিন তার সঙ্গে দেখা হবে না। এ-কথা ভাবতেই অবরুদ্ধ কান্নায় তার গলা আটকে এল। অনেক-অনেক দিন সে কাঁদে নি। সাহসের সঙ্গে কত দুঃখ, দুর্দশা ও বিপদের মোকাবিলা করেছে; কিন্তু এখন আস্তানার ভিতরে ঢুকে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
সব কিছুই কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেছে। জেরির সন্ধান ব্যর্থ হয়েছে। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি মানুষ তার সঙ্গে জড়িয়ে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে গেছে। দুঃখে ও অনুশোচনায় এখন তারই মূল্য তাকে শুধতে হচ্ছে।
বেশ কিছু সময় সেখানে শুয়ে হা-হুঁতাশ করল। তারপর এক সময় বুঝল এতে কোন ফল হবে না। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। এই শেষ আঘাতের পরেও থেমে যাওয়া চলবে না। এখনও সে বেঁচে আছে, অথচ জেরিকে খুঁজে পায় নি। তাকে এগিয়ে যেতে হবে। নদীতে পৌঁছতে হবে। যেমন করে হোক নদী পার হতে হবে। বুড়ো টাইমারের শিবির খুঁজে বের করতে হবে। তার অংশীদারটির সাহায্য নিতে হবে কিন্তু তার জন্য তো খাদ্য চাই; বলকারক মাংস চাই। এই দুর্বল দেহ নিয়ে সে তো চলতে পারবে না। যে ধনুক সে তৈরি করে রেখে গেছে সেটার সাহায্যেই তাকে মাংসের ব্যবস্থা করতে হবে। তীরগুলো নিতে সে বাইরে বেরিয়ে এল। এখনও শিকারের সময় পার হয়ে যায় নি।
ঘর থেকে বেরিয়েই সে চমকে উঠল। ওটা কি? মনে মনে এই ভয়ই সে করছিল। জঙ্গলের কাছে দাঁড়িয়ে একটা চিতাবাঘ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। চিতার হলদে চোখ দুটি তার উপর পড়তেই তার পেটটা মাটিতে নেমে গেল, বিকৃত মুখে একটা ফ্যাচফ্যাচ শব্দ হতে লাগল। জন্তুটা গুঁড়ি-মেরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে; লেজটা বেঁকে বেঁকে নড়ছে।
ক্রমেই কাছে আসছে-আরও কাছে। মেয়েটি ধনুকে তীর লাগল। এ চেষ্টা বৃথা তা সে জানে। একটা বিধ্বংসী কামানকে এত ছোট একটা গুলিতে বিদ্ধ করা যাবে না। তবু শেষ চেষ্টা করতেই হবে।
চিতাটা এগিয়ে আসছে। এখন শুধু লাফিয়ে পড়ার অপেক্ষা। এমন সময় মেয়েটি দেখল, চিতাটার ঠিক পিছনে একটি মনুষ্য-মূর্তি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল-একটি দৈত্যাকার সাদা মানুষ, শুধুমাত্র কটিবস্ত্র পরিহিত।
কোন রকম ইতস্তত না করে লোকটি ছুটে আসছে চিতাটাকে লক্ষ্য করে নরম ঘাসের উপর তার পায়ের কোন শব্দও হচ্ছে না। হঠাৎ মেয়েটি সভয়ে লক্ষ্য করল, লোকটি নিরস্ত্র।
চিতা শরীরটাকে মাটি থেকে একটুখানি তুলল। পিছনের পা দুটি শরীরের নিচে টেনে আনল। এবার একটা লাফ। বাস, তাহলেই মেয়েটির ভবলীলা সাঙ্গ। ঠিক তখনই লোকটি যেন বাতাসে ভেসে এসে জন্তুটার পিঠের উপর চেপে বসল।
তারপর যা ঘটল সে অবিশ্বাস্য ঘটনা। দাগ-দাগ চামড়া ও বাদামী চামড়া, হাত ও পা, নখর ও দাঁতের অতি দ্রুত ওলোট-পালোট ও জড়াজড়ি; আর সে সব কিছুকে চাপিয়ে শোনা যেতে লাগল দুটি রক্তপাগল জন্তুর বীভৎস চীৎকার।
জড়াজড়ি করতে করতে মানুষটি হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। পেছন থেকে চিতাটার গলা পেঁচিয়ে ধরে সেটাকেও টেনে তুলল। সেই মৃত্যু-মুষ্টি থেকে নিজেকে ছাড়াতে জন্তুটা আপ্রাণ চেষ্টা করছে; কিন্তু তার গলা দিয়ে এখন আর স্বর বেরুচ্ছে না। ধীরে ধীরে জন্তুটার দেহ শান্ত হয়ে এল। তখন চিতাটার গলাটা মুচড়ে ছিঁড়ে ফেলে লোকটি তার মৃতদেহটাকে মাটিতে ফেলে দিল। মুহূর্তের জন্য লোকটি তার উপর পা রেখে দাঁড়াল। গোরিলার বিজয় চীৎকারে সারা বনভূমি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
