আবার যুদ্ধ শুরু হলো। লুদনের নির্দেশে তখন একদল যোদ্ধা গুপ্ত সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে প্রাসাদের বাইরে গিয়ে প্রাসাদদ্বারে যুদ্ধরত জাদনের সেনাদলের উপর আক্রমণ শুরু করল। তখন দু’দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে পালাতে লাগল তারা। জাদন বন্দী হলো।
জাদনকেও হাত পা বাঁধা অবস্থায় মন্দিরে টারজান আর জেনের কাছে আনা হলো।
লুদন ওবারগাৎসকে জিজ্ঞাসা করল, এই নারীকে কি বলি দেয়া হবে?
ওবারগাৎস বলল, আগে এদের বলি দেয়া হোক। পরে আজ রাতে আমি ভেবে দেখব কি করা যায়।
জেন টারজানকে বলল, এই হয়ত আমাদের শেষ দেখা।
টারজান তখন নিজের কথা বা মৃত্যুর জন্য মোটেই ভাবছিল না। সে ভাবছিল শুধু জেনের কথা সে জেনকে সাহস দিয়ে বলল, এভাবে এর আগেও অনেকবার বন্দী হয়েছিলাম আমি।
জেন বলল, এখনো আশা রাখ তুমি?
টারজান বলল, এখনো আমি বেঁচে আছি।
এবার ওবারগাৎস বলল, কই, আমার বলির খাড়া দাও। আমি নিজের হাতে বলি দেব ওকে।
লুদন বলির খাঁড়াটা ওবারগাৎসের হাতে দিয়ে দিল। বেদীর উপর শায়িত অবস্থায় টারজান জেনকে বলল, বিদায়!
জেনকে সরিয়ে নিয়ে গেল।
ওবারগাৎস খাড়াটা হাতে নিয়ে বলল, আমিই সেই মহান দেবতা। এবার দেবদ্রোহী এই অধর্মাচারীর মৃত্যু দেখ।
এই বলে সে খাঁড়াটা গলার উপর তোলার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে কিসের একটা জোর শব্দ হলো। সকলে চমকে উঠল। ব্যাপারটা কি তা কেউ বুঝতে পারার আগেই টারজনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল ওবারগাৎস। টারজান দেখল রাইফেলের গুলি লেগেছে ওবারগাৎসের গায়ে।
সঙ্গে সঙ্গে লুদনও লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তার পাশে দাঁড়িয়ে মোসারও পড়ে গেল গুলির আঘাতে।
এবার সকলে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল মন্দিরের প্রাচীরের উপর একদল হোদন যোদ্ধা, জাদনের ছেলে তাদের আর পাশে টারজনের মত দেখতে এক শ্বেতাঙ্গ বিদেশী দাঁড়িয়ে আছে। শ্বেতাঙ্গ বিদেশীর হাতে একটা রাইফেল ছিল এবং তার থেকেই গুলি করছিল ও।
তাদেন এবার চীৎকার করে বলল, সব পুরোহিতদের গ্রেপ্তার করো। বন্দীদের বাধন খুলে দাও। এই হলো জাদ-বেন-ওহোর বিচার। এইভাবে জাদ-বেন-ওথো তার দূতকে পাঠিয়ে অন্যায়কারীদের উপর চরম শাস্তি দান করলেন।
আলুর নগরীর সব পুরোহিত স্বচক্ষে এই ঘটনা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তাদেনের কথা এবার সবাই তারা অকুণ্ঠভাবে বিশ্বাস করে ফেলল। লুদনের জাদন-বেন-ওখো আর জাদনের ডোর-উলফ ওথোকার শক্তি বেশি, কে ভণ্ড আর কে খাঁটি তা তারা স্বচক্ষে দেখল। তার অভ্রান্ত প্রমাণ তারা পেয়ে গেল। এবার সকলেই জাদনের পক্ষ সমর্থন করল। জাদনই হবে সমগ্র পানউলফ দলের রাজা। তাদের সঙ্গে এক বিরাট সেনাদল আর কোর-উলফ-জার রাজা ওমও ছিল।
টারজান আর জেনের বাধন খুলে দিতেই তারা দেখল তাদের সামনে তাদেনের সঙ্গে তাদের হারানো ছেলে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক তার মাকে জুড়িয়ে ধরল। এতদিন পর তাকে কাছে পেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল জেন। টারজান জ্যাকের কাঁধের উপর হাত রাখল। তার পুরনো বন্ধু ওমৎ আর তাদেনকেও ফিরে পেল টারজান।
টারজান, জেন আর জ্যাক পাশাপাশি তিনজন দাঁড়ালে তাদের দেবতা ভেবে সবাই তাদের সামনে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করল।
জালুর থেকে রাজকন্যা ওলোয়া আর পানাৎ লীকে নিয়ে আসা হলো।
আলুর ও সমগ্র পান-উলফ দলের রাজা রূপে জাদনের অভিষেক হবার পরই তাদেনের সঙ্গে ওলোয়া আর ওমতের সঙ্গে পানাৎ লীর বিয়ে হয়ে গেল।
রাজা হয়েই তারা সিংহাসনের পাশে টারজানকে বসিয়ে জাদন বলল, আমরা কিভাবে রাজ্য শাসন করব সে বিষয়ে ডোর-উলফ-ওথো তাঁর পিতার ইচ্ছা প্রকাশ করুন।
টারজান বলল, আজ থেকে মন্দিরে আর কোন রক্তপাত চলবে না। এতদিন অত্যাচারী পুরোহিতরা তোমাদের বুঝিয়ে এসেছে জাদ-বেন-ওখো এক নিষ্ঠুর দেবতা যিনি মানুষের রক্ত পান করতে ভালবাসেন। কিন্তু একথা যে ভুল তা তো আজ প্রমাণিত হয়ে গেল।
জাদন বলল, বন্দী পুরোহিতদের নিয়ে কি করব? তাদের কি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে?
টারজান বলল, না ওদের ছেড়ে দাও। ওরা ইচ্ছামত নিজেদের পথ বেছে নেবে।
জাদন, তাদেনের অনুরোধে টারজান ও ওমৎ এক সপ্তাহকাল আলুরের প্রাসাদে রয়ে গেল। এরপর ওমৎ তার রাজ্যে চলে যাবে। ঠিক হলো টারজান সপরিবারে যেদিন উত্তর দিকে তার দেশের দিকে রওনা হবে সেদিন একদল হোদন ও একদল ওয়াজদন যোদ্ধা তার সঙ্গে অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে বিপদসংকুল জলাশয়গুলো পার করে দিয়ে আসবে।
টারজনের বিদায়কালে ওমৎ আর তাদের দু’জনেই বিদায় অভিবাদন জানাল।
মহীয়ান টারজান (টারজান দি ম্যাগনিফিসেন্ট)
সেদিন আফ্রিকার বিষুবরেখার পাঁচ ডিগ্রী উত্তরে এক শূন্য বিশাল প্রান্তরে আকাশ থেকে অগ্নিবৃষ্টি করে যাচ্ছিল জ্বলন্ত সূর্য। একটি লোক একটা ছেঁড়া শার্ট আর ছেঁড়া পায়জামা পরে টলতে টলতে অতি কষ্টে পথ হাঁটছিল। তার জামা ও পায়জামার উপর ছিল শুকনো রঙের দাগ। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সে মাটিতে পড়ে গিয়ে অনড় হয়ে শুয়ে রইল।
ঝোপে-ঢাকা একটা ছোট পাহাড়ের মাথা থেকে একটা সিংহ এই দৃশ্যটির উপর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাকিয়ে ছিল।
একটা শকুনি আকাশে ঘুরতে ঘুরতে শায়িত লোকটিকে মৃত ভেবে লক্ষ্য করছিল তীক্ষ্ণ ও লুব্ধ দৃষ্টিতে।
সেই প্রান্তরটার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে অন্য একটি লোক এগিয়ে আসছিল উত্তর দিকে। কোন ক্লান্তি বা অবসাদের চিহ্ন ছিল না লোকটির মধ্যে। তার পেশীবহুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল দেহে বাদামী রঙের চামড়াটা চকচক করছিল। এক অবাধ উচ্ছলতায় ভরা তার প্রতিটি নিঃশব্দ পদক্ষেপ শীতা বা চিতাবাঘের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু তার চেহারায় বা চোখে মুখে কিছুমাত্র সংশয় বা শঙ্কার চিহ্নমাত্র ছিল না। পোশাক বলতে একটা শুধু কৌপীন জড়ানো ছিল তার কোমরে। তার একদিকের কাঁধে ঝোলানো ছিল একটা ঘাসের দড়ি আর একদিকের কাঁধে ছিল তীরভরা একটা তৃণ। কোমরে ঝোলানো ছিল খাপে ভরা। একটা ছোরা। তার এক হাতে ছিল একটা বর্শা আর এক হাতে ছিল একটা ধনুক। তার শান্ত ধূসর একজোড়া চোখের উপর একঝক কালো লম্বা চুল এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিল মাথাটার চারপাশে।
