পানসাৎ বলল, তাকে আমরা ধরেছি মালিক।
লুদন আশ্চর্য হয়ে বলল, সে কি! তাকে ধরেছ? টারজান-জাদ-গুরু ধরা পড়েছে? তাকে কি হত্যা করেছ?
পানসাৎ বলল, না। তাকে জীবন্ত ধরে রেখেছি। তাকে আমাদের প্রাচীন কারাগারটায় ধরে রেখেছি।
এমন সময় একজন পুরোহিত ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এসে খবর দিল, জাদনের যোদ্ধারা প্রাসাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
পানসাৎ বলল, ও ঠিকই বলেছে মালিক। গুপ্ত পথ দিয়ে টারজানই জাদনের লোকদের এনেছে প্রাসাদে।
সুদন বেরিয়ে গিয়ে দেখল কথাটা সত্যি। সে মন্দিরের বিপদসূচক ঘণ্টাটা বাজাতে লাগল জোরে। তারপর কয়েকজন বিশ্বস্ত পুরোহিতকে ডেকে বারান্দা পার হয়ে আর একটা ঘরে চলে গেল। জেনকেও তার ঘরে বয়ে নিয়ে যাওয়া হলো।
মন্দিরের বিপদসূচক ঘণ্টাগুলোকে জোরে বাজাতে দেখে জাদন ভাবল এতক্ষণে টারজান তার সঙ্গের যোদ্ধাদের নিয়ে মন্দির ও প্রাসাদ আক্রমণ করেছে তাই এই ঘণ্টাধ্বনি। এদিকে লুদন জাদনের দলের। সৈন্যদের মনোবল ভেঙ্গে দেবার জন্য সে তার পুরোহিতদের বলল, যাও তোমরা প্রাসাদের মাথা থেকে প্রচার করে দাও, ভণ্ড ডোর-উলফ-ওথো ধরা পড়েছে। আমাদের কাছে ভগবান জাদ-বেন-ওখো আছেন। তিনি বলেছেন, এখনো সময় আছে, আক্রমণকারীরা অস্ত্র ত্যাগ করে যুদ্ধে বিরত হলে তাদের ক্ষমা করা হবে।
এরপর লুদন জাদ-বেন ওথোরূপী ওবারগাৎসের কাছে লোক পাঠিয়ে দিল। দেবতার ভান করতে করতে ওবারগাৎসের মাথাটার ঠিক ছিল না। সে যে দেবতা নয়, একজন মানুষ এটা সে নিজেই আর বুঝতে পারছে না। সে তাই সব সময় মাথার চুলে ও দাড়িতে ফুল গুঁজে রাখত।
ওবারগাৎস তখন ঘুমোচ্ছিল তার ঘরে। এমন সময় লুদনের লোক গিয়ে তাকে জাগল। বলল, শক্ররা প্রাসাদে ঢুকে পড়েছে।
ওবারগাৎস বিছানার উপর বসে বলল, আমি হচ্ছি জাদ-বেন-ওথো, কে আমার ঘুম ভাঙ্গাল?
এমন সময় আর একজন পুরোহিত এসে বলল, হে ভগবান জাদ-বেন-ওখো, জাদনের সৈন্যরা প্রাসাদ আক্রমণ করেছে।
ওবারগাৎস বলল, আমি হচ্ছি জাদ-বেন-ওথো। আমি বজ্ৰ হেনে সেই সব নাস্তিক অধার্মিকদের পুড়িয়ে মারব।
ওবারগাৎস ব্যস্তভাবে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করতে লাগল।
এদিকে সুদন তার পুরোহিতদের নিয়ে নিজে প্রাসাদের উপর থেকে কথা বলতে লাগল জাদনের দলের লোকদের সঙ্গে। জাদনের দলের যোদ্ধারা যখন শুনল টারজান-জাদ-গুরু বন্দী হয়েছে সুদনের হাতে এবং তাদের ভগবান জাদ-বেন-ওথো স্বয়ং মন্দিরে অবস্থান করছেন তখন তারা সব উদ্যম হারিয়ে ফেলল। তারা শুনল টারজান ডোর-উলফ ওখো নয়, একজন ভণ্ড, মানুষের মত বন্দী হয়ে পড়ে আছে। তখন তাদের মনোবল ভেঙ্গে গেল। প্রাসাদের ভিতরে যারা যুদ্ধ করছিল জাদনের পক্ষে তারাও টারজানকে না পেয়ে মনোবল হারিয়ে প্রাসাদদ্বারে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জাদনও সেইখানে ছিল। সেও হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল।
লুদন উপর থেকে জাদনের সেনাদলকে বলল তোমাদের অস্ত্র ত্যাগ করে আত্মসমর্পণ করো। ভগবান জাদ-বেন-ওথো তাই বলেছেন। তোমাদের ভণ্ড ডোর-উলফ-ওথো এখন আমাদের হাতে বন্দী।
তখন নিচের থেকে জাদনের লোকেরা বলল, তাহলে জাদ-বেন-ওথেকে আমাদের সামনে নিয়ে এসে দেখাও। ডোর-উলফ-ওথো যদি বন্দী হয়ে থাকে তাহলে তাকেও এনে দেখাও।
লুদন তখন দু’জনকেই প্রাসাদের ছাদের উপর নিয়ে আসতে বলল।
এদিকে টারজান দেখল যে ঘরটায় সে বন্দী ছিল। সেই ঘরের উপর দিকে জানালার কাছে কড়িকাঠের সঙ্গে একটা দড়ি লাগানো ছিল। দড়িটাতে ভর দিয়ে উপরের দিকে উঠে জানালা দিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল। এমন সময় উপর থেকে একদল পুরোহিত এসে টারজনের হাত দুটো চামড়ার দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। আর সেই সময়ে টারজান যখন ঝুলছিল তখন তার পা দুটো বেঁধে ফেলল। তারা টারজানকে তুলে নিয়ে গিয়ে ছাদের উপর লুদনের পাশে নামিয়ে দিল।
ওবারগাৎস তার আগেই ছাদের উপর দাঁড়িয়েছিল। টারজানকে দেখেই ভয় পেয়ে গেল ওবারগাৎস।
লুদন জাদনকে দেখিয়ে বলল, এই দেখ, বন্দী ডোর-উলফ-ওথো।
ওবারগাৎস আবার বলল, আমি জান-বেন-ওখো।
টারজান তার পানে তাকিয়ে বলল, তুমি হচ্ছ লেফটেন্যান্ট ওবারগাৎস। তুমি হচ্ছ সেই তিনজনের একজন যাকে আমি অনেক খুঁজে বেড়িয়েছি।
ওবারগাৎস দেখল টারজনের কথা শুনে অনেকে তার পানে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে।
ওবারগাৎস বলল, আমিই জাদ-বেন-ওখো। এই লোকটা আমার পুত্র ডোর-উলফ-ওথো নয়। তার ভণ্ডামি আর প্রতারণার জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করতে হবে। সূর্য আকাশের মধ্যভাগে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেদীর উপর তার শিরচ্ছেদ করা হবে। যাও, ওকে আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যাও।
যারা টারজানকে বয়ে নিয়ে এসেছিল তারা আবার সেখান থেকে তাকে বয়ে নিয়ে গিয়ে মন্দিরের বলির বেদীর উপর শুইয়ে দিল।
এরপর ওবারগাৎস জাদনের লোকদের লক্ষ্য করে বলতে লাগল, তোমাদের অস্ত্র ফেলে দাও। আত্মসমর্পণ করো। তা না হলে আমি বজ্র নিক্ষেপ করে তোমাদের পুড়িয়ে মারব। যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের আমি ক্ষমা করব।
জাদন তখন চীৎকার করে বলল, যে করে করবে, কিন্তু জাদন কখনো লুদন আর তার ভক্ত দেবতার পায়ে মাথা নত করবে না।
কিন্তু সত্যি সত্যি জাদনের দলের কিছু লোক অস্ত্র ত্যাগ করে আত্মসমর্পন করল। তারপর তারা প্রাসাদের মধ্যে ঢুকে গিয়ে লুদনের পক্ষে যোগদান করল।
