টারজান এরপর জেনকে বলল, আমি যাচ্ছি, তোমার বর্শাটা দাও।
টারজান এবার তেরোদনদের মত হুইউ বলে চীৎকার করে উঠতেই জন্তুটা মৃদু গর্জন করে উঠল। টারজান তখন জেনকে নিয়ে জন্তুটার লেজে ভর দিয়ে তার চওড়া পিঠটায় চড়ে বসল। তারপর জন্তুটাকে কোর-উলফ-জার পথে চালনা করে নিয়ে যেতে লাগল। টারজান ভাবল সে এই জন্তুটার পিঠে চেপেই ওমৎদের গায়ে চলে যাবে।
কিন্তু কোর-উলফ-জা যেতে হলে আলুরের পাশ দিয়ে যেতে হবে। তাই আলুরের পাশ দিয়ে যাবার সময় অনেকে গ্রীফের উপর টারজানকে দেখে ছুটে লুদনকে খবব দিল।
টারজান জেনকে নিয়ে গ্রীফের উপর চেপে কোন্ পথে যাচ্ছে তার খবর দিতে লুদন ভাবল টারজান জালুরের পথে যাচ্ছে এবং সে জাদনের সঙ্গে যোগদান করবে। তখন জাদন টারজানকে নিয়ে একযোগে আলুর আক্রমণ করবে। লুদন তখন তার বিশ্বস্ত পুরোহিত পানসাকে গোপনে তার পরিকল্পনার কথাটা বুঝিয়ে দিল। পানসাৎ মাথায় যোদ্ধার জমকালো পোশাক পরে একজন যোদ্ধার বেশ ধারণ করল। তারপর সে জালুরের পথে রওনা হলো।
টারজান যাচ্ছিল কোর-উলফ-লুনের পথে। একদল হোদন যোদ্ধা পথে এক ভয়ঙ্কর জন্তুকে দেখে ছুটে পালাতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ফাঁকা জায়গায় পড়তেই জাদনের লোকেরা টারজানকে দেখতে পেল। জাদন তখন সৈন্য সমাবেশ করছিল।
হঠাৎ জাদনের একজন প্রহরী গ্রীফের পিঠে টারজানকে একটু দূর থেকে দেখে চিনতে পারল। সে ছুটে গিয়ে জাদনকে খবর দেয়। কিন্তু কথাটা বিশ্বাস করতে মন চাইছিল না জাদনের। পরে সে নিজে পাহাড়ের ধারে এসে দেখল কথাটা সত্যি। সে তখন চীৎকার করে বলে উঠল, হ্যাঁ উনিই সেই দেবতা ডোর-উলফ-ওথো।
জাদন টারজানকে লক্ষ্য করে বলল, আমি জাদন, জালুরের প্রধান, আমি তোমার বন্ধু। আমরা তোমার পায়ে প্রণাম জানাচ্ছি। আমাদের প্রার্থনা, তুমি লুদনের বিরুদ্ধে আমাদের আসন্ন ন্যায় যুদ্ধে সাহায্য করো।
টারজান বলল, তুমি তাকে এখনো পরাস্ত করতে পারনি? আমি ভাবছিলাম তুমি তাকে মেরে রাজা হয়েছ।
জাদন বলল, না, জনগণ প্রধান পুরোহিতকে ভয় করে। তার উপর আলুরের মন্দিরে একজন বিদেশী নিজেকে স্বয়ং জাদ-বেন-ওখো হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। লুদনও তাকে মন্দিরে খাতির যত্ন করে রেখে দিয়ে জাদ-বেন-ওথোর নামে প্রচার চালিয়ে দল ভারী করছে। তবে জনগণ যদি জানতে পারে ডোর-উলফ-ওথো আবার ফিরে এসেছে আমাদের কাছে তাহলে এ যুদ্ধে আমরা জয়ী হবই।
টারজান কিছুটা চিন্তা করে বলল, বল জাদন, কিভাবে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি?
জাদন বলল, আমার সঙ্গে জালুরে গিয়ে সৈন্য সংগ্রহের কাজে আমাকে সাহায্য করবে।
টারজান গ্রীফের পিঠে চড়েই জালুরের দিকে এগিয়ে চলল। জাদন আর যোদ্ধারা হেঁটে হেঁটে যেতে লাগল।
জালুরের প্রাসাদে জেনকে ওলোয়া আর পানাৎ লীর কাছে রেখে দিল। ওলোয়া আর পানাৎ দু’জনেই টারজানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে নতজানু হয়ে তাকে প্রণাম করল।
সেদিন রাতটা কাটানোর পর পরদিনই যুদ্ধ যাত্রা করল ওরা।
যেদিন জাদন টারজানকে নিয়ে আলুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করল সেদিন রাত্রি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলুর থেকে যোদ্ধার বেশে আসা সুদনের অনুচর পানসাৎ জালুরের প্রাসাদ-উদ্যান থেকে পুরোহিতদের ঘরে চলে গেল। সে কৌশলে দু’জন পুরোহিতকে তার দলে এনে জেনকে নিয়ে পালিয়ে যাবার এক চক্রান্ত করল।
রাত নিশুতি হলে এবং প্রাসাদের সব লোক ঘুমিয়ে পড়লে পানসাৎ তার অনুগত দু’জন পুরোহিতকে সঙ্গে করে অন্তঃপুরে জেন যে ঘরে একা ঘুমোচ্ছিল সেই ঘরে চলে গেল। ঘুমন্ত জেনের মুখ আর হাত পা বেঁধে তাকে তুলে নিয়ে প্রাসাদের বাইরে নদীর ঘাটে চলে গেল। মুখ বন্ধ থাকায় চীৎকার করতে পারলে না জেন। নদীর ঘাটে একটা নৌকা বাঁধা ছিল। তাতে জেনকে চাপিয়ে নৌকা ছেড়ে দিল পানসাৎ।
তখন চাঁদ ডুবে গেছে। কিন্তু ভোর হয়নি তখনো। আলুরের বাইরে জাদনের সেনাদল দু’দলে ভাগ হয়ে গেল। একটা দল নিয়ে টারজান গুপ্তপথ দিয়ে প্রাসাদসংলগ্ন মন্দিরে চলে যাবে আর জাদন একটা দল নিয়ে সোজা প্রাসাদদ্বারে চলে গিয়ে আক্রমণ করবে। ঘুমন্ত নগরীতে কোন বাধা পাবে না তারা। তাদেনের কাছে একজন দূত পাঠানো হয়েছে। সে উত্তর-পূর্ব দিকে থেকে একই সময়ে আক্রমণ করবে।
টারজানরা একটা মশাল এনেছিল সঙ্গে। মশালটা জ্বেলে সেই গোপন সুড়ঙ্গ পথটা দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল টারজান।
টারজান গুপ্ত পথ দিয়ে সোজা মন্দিরের দরজার কাছে চলে গেল। তার দলের যোদ্ধারা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল। দরজায় কোন পাহারা না থাকায় টারজান একাই লুদনের ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সহসা সে দেখল একজন আলুর যোদ্ধা একজন বিদেশী মহিলাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে। টারজান এবার লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ছুটে গেল। ওদিকে পানসাৎ টারজানকে চিনতে পেরে একটা অন্ধকার ঘরে বন্দিনীকে নিয়ে ঢুকল। টারজান তখন তার হাতের মশালটা নিভিয়ে দিয়ে সেই ঘরটায় ঢুকে পড়ল। অন্ধকার ঘরটায় ঢুকে পড়তেই তার দু’দিকের দুটো দরজা বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। দেখল, ঘরের দরজা দুটো বন্ধ এবং পাথর দিয়ে আটকানো। উপরে একটা জানালা আছে এবং জানালাটা বন্ধ।
লুদন যখন তার ঘরে বসেছিল তখন পানসাৎ বন্দিনী জেনকে তুলে নিয়ে তার সামনে মেঝের উপর নামিয়ে রাখল। লুদন আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল, এর জন্য তুমি প্রচুর পুরস্কার পাবে। এবার যদিও ভণ্ড ডোর-উলফ-ওথোকে একবার ধরতে পারতাম তাহলে সমগ্র পান-উলফ-বাসী আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যে এসে যেত।
