মোসারের কারাগার থেকে বেরিয়ে টারজান তার বারান্দায় লাফ দিয়ে পড়ল। দেখল পাশেই একটা খাড়াই পাঁচিল।
অন্ধকারে মুহূর্তমধ্যে দরজা দিয়ে বেরিয়ে নগরের রাজপথে গিয়ে পড়ল টারজান। একবার পিছনে ফিরে দেখল, কেউ তাকে ধরতে আসছে কি না।
তুলুর নগরী থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকেই এক নিবিড় স্বস্তি অনুভব করল টারজান। রাতের অন্ধকারেও গাছে গাছে দ্রুত অনেকটা পথ পার হলো টারজান। ক্রমে একটা নদীর ধারে এসে পড়ল সে। গাছ থেকে নেমে নদীটা পার হয়ে আবার ওপারের জঙ্গলে চলে গেল। কিন্তু ওপারের বনটায় ঢুকে নাকে কিসের ঘ্রাণ পেয়ে স্তব্ধ হয়ে একবার দাঁড়াল সে। তারপর এক নতুন উদ্যমে কাকে যেন খুঁজে বেড়াতে লাগল।
খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে একটা বড় গাছের তলায় এসে দেখল গাছের উপরে একটা মাচা বাঁধা রয়েছে।
টারজান মাচার সামনে এসে ডাকল, জেন, প্রিয়তমা জেন, আমি।
হঠাৎ টারজান শুনতে পেল কে যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাচার বিছানার উপরেই পড়ে গেল। সে তখন মাচার সামনেকার ডালপালার বাধনগুলো নিজের হাতে সরিয়ে মাচার ভিতরে ঢুকে দেখল জেন মড়ার মত শুয়ে আছে।
ধীরে ধীরে জেনের জ্ঞান ফিরে এলে জেনের মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। জেন বলল, ঈশ্বর তাহলে এতদিনে আমাদের উপর দয়া করেছেন জন।
দু’জনেরই মুখে অসংখ্য কথা ভিড় করে আসছিল। জেন এবার প্রশ্ন করল, জ্যাক কোথায়?
টারজান বলল, আমি ত জানি না। আমি শেষবার যখন তার কথা শুনি সে তখন ছিল আর্গন ফ্রন্টে। কিন্তু এখন তুমি কোথায় যেতে চাও।
জেন বলল, আমি প্রথমে জ্যাককে ফিরে পেতে চাই। তাকে ফিরে পেতে যেখানে যেতে হয় যাব। আমি অবশ্য মাঝে মাঝে বাংলোটারই স্বপ্ন দেখি, শহরের কথা মনে হয় না।
পরদিন সকালেই জেনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল টারজান।
ওবারগাৎস সেদিন জেনের কাছ থেকে তাড়া খেয়ে হাঁটতে থাকে। হঠাৎ এক জোর হাসিতে ফেটে পড়ল সে। তার সামনে তখন বিস্তৃত হয়ে ছিল এক বিশাল হ্রদের জলরাশি। সেই হ্রদের ওপারে একটা নদী আছে। তার পাড়েই আছে আলুর নগরী। সেখানকার লোকেরা জাদ-বেন-ওখো নামে এক দেবতার পুজো করে। ওবারগাৎস মনে মনে ঠিক করল, ওদের দেবতা জাদ-বেন-ওথোর নাম ধারণ করে ও যাবে সেখানে।হ্রদের জলে কিছুটা নেমে পাগলের মত চীৎকার করতে লাগল ওবারগাৎস, আমিই হচ্ছি জাদ বেন-ওগো, আমিই সেই মহান দেবতা।
কিন্তু অত দূর থেকে কেউ তার কথা শুনতে পেল না। কেউ তাকে নিতে এল না দেখে ওবারগাৎস নিজেই হ্রদের জলরাশি সাঁতার কেটে পার হতে লাগল।হ্রদটার অনেকখানি পার হয়ে নদীটার কাছাকাছি এসে সাঁতার কাটতে কাটতে একটা ছোট নৌকা পেয়ে গেল। নৌকাটা আধোবা অবস্থায় ভেসে চলেছিল।
এবার নৌকাটার উপর চেপে দু’হাতে করে জল কেটে এগিয়ে যেতে লাগল। নদীতে নৌকায় যখন আলুর নগরীর দিকে এগিয়ে চলেছিল ওবারগাৎস তখন প্রাসাদপ্রাচীর ও নদীর ধার হতে অনেক লোক, শিশু আর নারীরা তার অদ্ভুত চেহারাটার পানে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
লুদনও দেখল ওবারগাৎসকে। সে তার পুরোহিতদের বলল, ওই বিদেশীকে এখানে সম্মানের সঙ্গে নিয়ে এস। আমার মতে এই হলো জাদ-বেন-ওথো।
আর অধীনস্থ পুরোহিতরা ওবারগাৎস ঘাটে নামতেই তাকে সম্মানের সঙ্গে মন্দিরে নিয়ে গেল। নৌকা থেকে নেমে ওবারগাৎস বলে উঠল, আমি হচ্ছি জাদ-বেন-ওথো। আমি স্বর্গ থেকে আসছি। আমার প্রধান পুরোহিত কোথায়?
লুদন বিদেশীর দিকে কটাক্ষপাত করে একবার দেখে নিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও দেবতারূপী এই বিদেশীকে আপন প্রয়োজন সিদ্ধির কাজে লাগাতে চাইল। সে মনে মনে ঠিক করল তাদের দেবতা জাদ-বেন-ওথোর নামধারী এই বিদেশীকে এই মন্দিরে দীর্ঘকাল রেখে দেবে। সে সারা রাজ্যে রটনা করে দেবে জাদ-বেন-ওথো স্বয়ং দয়া করে তার কাছে এসেছেন এবং তার মতকে সমর্থন করেছেন।
এই কথা নগর মধ্যে প্রচার হলে বহু লোক দলে দলে মানুষরূপী জাদ-বেন-ওথোকে দেখতে এল। তার উদ্দেশ্যে অনেকে অনেক পূজার অঞ্জলি দিল। ওবারগাৎসের খাতির বেড়ে গেল।
লুদন শুনেছিল জাদন জালুরে চলে গেলেও সেখান থেকে সৈন্য সংগ্রহ করছে। সুযোগ বুঝলেই সে আলুর নগরী আক্রমণ করবে। বর্তমান আলুর নগরীতে কোন রাজা নেই। এখন লুদনই একমাত্র সব ক্ষমতার অধিকারী।
টারজান আর জেন দু’জনে মনের আনন্দে হ্রদ আর নদী পার হয়ে একটা উপত্যকার উপর দিয়ে যেতে লাগল। টারজনের ইচ্ছা আপাতত সে কোর-উলফ-জা রাজ্যে গিয়ে তার বন্ধু ওমতের সঙ্গে দেখা করবে। তার কাছেই তাদেন আছে।
তিন দিন পর ওরা আলুরের কাছাকাছি একটা নদীর ধারে এসে পড়ল। হঠাৎ জেন বিরাটকায় গ্রীফ দেখে টারজানকে বলল, ওটা কি?
টারজান বলল, ওটা গ্রীফ নামে এক জন্তু। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে কাছে কোন গাছ নেই। এখন জন্তুটা আমাদের না দেখেলেই ভাল। কারণ তোমাকে নিয়ে একা আমি ওর সঙ্গে লড়াই করতে পারব না।
জেন বলল, কিন্তু জন্তুটা যে এত বড় তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। যেন একটা যুদ্ধ জাহাজ।
টারজান হেসে বলল, আক্রমণ করার সময় ওরা বড় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
ওরা ধীর গতিতে উপত্যকাটার উপর দিয়ে যেতে লাগল জন্তুটার নজর ওদের উপর না পড়ে। কিন্তু জন্তুটা কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের দেখতে পেয়ে গর্জন করে উঠল। টারজান বলল, আর উপায় নেই। এবার ওর সঙ্গে মোকাবিলা করতেই হবে। আর পালানো যাবে না।
