ওবারগাৎস কোন প্রতিবাদ করল না। সে সবকিছু ভেবে জেনের কথামতই কাজ করল। শিকারের জন্য বন্দুকবাহক ও ভৃত্যরা রওনা হবার কিছুক্ষণ পর সে শিকারীর বেশে জেনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
দিনের পর দিন রাতের পর রাত তারা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ভীষণ কষ্টের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলল।
যেতে যেতে কতকগুলো পাহাড় পার হয়ে জাদ-বেন-ওয়োর উপত্যকায় এসে পড়ল। সেখানে একদিন একজন হোন যোদ্ধার চোখে পড়ায় জেনকে ধরে আলুর নগরীতে নিয়ে গেল তারা। ওবারগাৎস কোনরকমে পালিয়ে গেল।
আজ বহুদিন পর সকল বন্দীত্ব হতে মুক্ত হয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল জেন।
পরদিন সকালে রোদের তাপ গায়ে লাগতেই উঠে পড়ল জেন। জেনের কাছে একটা থলে ছিল। তাতে কতকগুলো বিভিন্ন আকারের পাথর কুড়িয়ে নিল। তারপর জেন একটা লম্বা চারাগাছ উপড়ে নিয়ে সেটাকে বর্শার মত করে নিল। ছুরি দিয়ে তার মুখটা সরু করে ফেলল। এবার টারজনের কথা মনে পড়ল। ভাবল টারজান যদি প্রাণে বেঁচে থাকে তাহলে তার সঙ্গে একদিন না একদিন দেখা হবেই তার। সে তাকে খুঁজে বের করবেই।
এমন সময় আলুর থেকে দু’জন পুরোহিত এসে দেখা করল মোসারের সঙ্গে।
তারা টারজনের নাম শুনেই মন্দিরের ভিতরে চলে গেল। টারজনের নাম শুনে মোসারও ভয় পেয়ে গেল। কিছু তুলুরের পুরোহিতরা মোসারকে পরামর্শ দিল টারজানকে সে যেন খুব খাতির করে। পরে তাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করতে হবে কৌশলে।
টারজান মোসারের সামনে এসেই কোনরকম অভিবাদন বা ভনিতা না করে সরাসরি বলল, তুমি আলুর থেকে যে বিদেশী মহিলাকে এনেছ সে কোথায়?
টারজনের গম্ভীর কণ্ঠ শুনে ভয় পেয়ে গেল মোসার। সে বলল, সে পথেই পালিয়ে গেছে। আমি তার খোঁজ করার জন্য তিরিশজন লোককে পাঠিয়েছি।
টারজান এবার বলল, আলুর থেকে যে দু’জন পুরোহিত একটু আগে এসেছে তারা কোথায়?
মোসার বলল, তারা মন্দিরে পুরোহিতদের সঙ্গে দেখা করতে গেছে।
পরে পুরোহিতরা দলবেঁধে টারজনের কাছে গিয়ে বলল, হে ডোর-উলফ-ওথো, আপনি দয়া করে আমাদের রাজ্যে যখন পদার্পণ করেছেন তখন মন্দিরটা একবার দেখে যান।
টারজান এই খাতির পেয়ে গলে গেল। সে পুরোহিতদের সঙ্গে মন্দির দর্শন করতে গেল। মন্দিরটা ঘুরিয়ে দেখানোর পর মাটির তলায় সেই অন্ধকার কারাগারটায় নিয়ে গেল। ঘরটা ভীষণ অন্ধকার।
ওরা মশাল জ্বেলে কারাগারটায় টারজানকে নিয়ে ঢুকেই বেরিয়ে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিল। টারজান এবার ওদের চক্রান্তের ব্যাপারটা বুঝতে পারল। টারজান অন্ধকারে হাতড়ে কয়েকটা পাথর দিয়ে ওদিকের জানালাগুলোকে ভেঙ্গে পালিয়ে যাবার পথ করার চেষ্টা করতে লাগল।
এদিকে আলুর থেকে একজন পুরোহিত এসে তুলুরের প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে দেখা করল। সে বলল, কোতানের মৃত্যুর পর থেকে জাদন রাজা হবার চেষ্টা করছে। আমরা চাই তুমি আলুর চল। আমরা তোমাকে আলুরের প্রধান পুরোহিতের পদে বরণ করে নেব। তুমি আলুরে চলে যাবে। আমরা ওখানে সব ব্যবস্থা করে রাখব। তুমি এখানে একজনকে হত্যা করবে। আমরা ওখানে একজনকে হত্যা করব।
এই বলে পুরোহিত চলে গেল। প্রধান পুরোহিত মনে ভাবল, বন্দী টারজানকে খুন করতে বলেছে। সে বুঝতে পারেনি আলুরের পুরোহিত তাকে মোসারকে খুন করার কথা বলেছে। তারা লুদনকে হত্যা করবে।
প্রধান পুরোহিত তাই দশজন যোদ্ধা নিয়ে সেই কারাগারটায় চলে গেল। কিন্তু তারা অন্ধকার কারাগারে ঢুকেই দেখল টারজান পালিয়ে গেছে।
জেন একটা খরগোশ শিকার করল। এবার আগুন জ্বালাতে হবে। আগুনে দগ্ধ না করে সে মাংস খেতে পারে না। আগুন জ্বেলে মাংসটা পুড়িয়ে খাবার পর একটা আনন্দের উত্তেজনা অনুভব করতে লাগল সে।
বর্শাটা তুলে নিয়ে আবার হরিণের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল সে। হরিণের মাংসই তার প্রিয় খাদ্য। নদীটার ধারে অনেকক্ষণ ঘুরতে ঘুরতে সে একটা হরিণ দেখতে পেয়ে তার হাতের বর্শাটা ছুঁড়ে দিল। বর্শাটা হরিণটাকে বিদ্ধ করতেই সেটা পড়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে এক পুরুষ কণ্ঠ নদীর ওপার থেকে বলে উঠল, ‘সাবাস’!
জেন প্রথমে লোকটাকে চিনতে পারল না। কাছে আসতে জেন চিনতে পারল। লোকটা হলো ওবারগাৎস।
জেন বিস্ময়ে চীৎকার করে উঠল, ওবারগাৎস তুমি!
ওবারগাৎস বলল, হ্যাঁ আমি।
জেন বলল, আমি ভাবছিলাম তুমি এতদিনে সভ্যজগতের কোন দেশে চলে গেছ।
ওবারগাৎস বলল, চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। এ দেশের চারদিকে শুধু জলাশয়। আর যতসব হিংস্র জন্তু। তাদের হাত তেকে কোনরকমে বেঁচে গেছি।
জেন বলল, ওবারগাৎস, তুমি এখন যাও। আমাকে একা থাকতে দাও।
ওবারগাৎস হাসতে লাগল। না, না, তোমাকে একা ফেলে আমি এখন যেতে পারি না। তোমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব এখন আমার।
জেন বলল, আমি এখন একাই আত্মরক্ষায় সমর্থ। আমি যে বর্শা চালনা করতে পারি তা তুমি একা আগেই দেখেছ।
ওবারগাৎস বলল, না, আমি যাব না।
জেন এবার বর্শাটা হাতে ধরে আদেশের সুরে বলল, চলে যাও বলছি। আমাকে অনুসরণ করার চেষ্ট করবে না। যদি আমি তোমাকে আবার দেখতে পাই তাহলে তোমায় হত্যা করব।
এই বলে জেন চলে গেল সেখান থেকে।
আলুর নগরীতে তখন দারুণ গোলমাল ছিল। রাজ্যের যত সব যোদ্ধা আর পুরোহিতরা লুদন আর জাদন এই দুই নেতার অধীনে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু সুদনের পুরোহিত ও যোদ্ধারা ক্রমে সংখ্যায় বেড়ে গিয়ে জাদনের দলের যোদ্ধাদের প্রাসাদ থেকে তাড়িয়ে দিতে থাকে। জাদন তখন রাজকন্যা ওলোয়া পানাৎ লী আর তার দলের লোকদের নিয়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে তার রাজ্য জালুরে চলে যায়।
