লুদন বলল, ঠিক আছে, আমরা পরে খুঁজে বার করব। নিষিদ্ধ বাগানের মধ্যেই তাকে পাব। পানসাৎ, এখন চলে যাও। শহরে গিয়ে রচনা করবে জাদনই রাজক্ষমতার লোভে রাজাকে হত্যা করেছে।
পানসাৎ চলে গেলে টারজানও নিঃশব্দে তার অনুসরণ করে গুপ্ত সুড়ঙ্গপথ দিয়ে প্রাসাদের বাইরে পানসাৎ চলে যেতে টারজান আবার প্রাসাদে ফিরে এল। সে সোজা অন্তঃপুরে ওলোয়ার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল। দেখল বুলাৎ পানাৎ লীকে মেঝের উপর ফেলে দিয়ে চুলের মুঠি ধরে তার বুকে ছুরি মারার জন্য উদ্যত হয়েছে। তখন সে ঘরে ঢুকে বুলাতের একটা হাত ধরে মুখে প্রচণ্ড একটা ঘুষি মেরে তাকে ফেলে দিল।
তারপর অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে মোসারের খোঁজে প্রাসাদের বাইরে যাবার জন্য গেটের কাছে পৌঁছতেই কয়েকজন যোদ্ধা তাকে ঘিরে দাঁড়াল। কারণ সে তাড়াহুড়ো করে মাথায় পুরোহিতের পোশাকটা পরতে ভুলে যাওয়ায় তাদের মনে সন্দেহ হয়।
টারজান দেখল একা এতগুলো যোদ্ধার সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। তাছাড়া যোদ্ধারা জাদন-পন্থী। তারা অবশ্য টারজনের ভয়ে তার খুব একটা কাছে আসতে পারছিল না। টারজান তাদের বলল, আমি লুদনের ষড়যন্ত্রের কথা সব আড়াল থেকে শুনেছি। সে এইমাত্র পানসাৎকে শহর থেকে অনেক যোদ্ধা নিয়ে আসার জন্য পাঠিয়েছে। একটি গুপ্ত পথ দিয়ে প্রাসাদে ঢুকবে তারা। গুপ্ত পথটিও আমি দেখে নিয়েছি।
একজন যোদ্ধা বলল, তোমার কথা যদি মিথ্যা হয়?
টারজান বলল, আমার সঙ্গে তোমরা শহরে গেলেই বুঝতে পারবে। আমার কথা মিথ্যা হলে তোমরা আমাকে যে কোন শাস্তি দিতে পার। আর সত্য হলে আমাকে ছেড়ে দেবে। আমি এখন মোসারের খোঁজে তার দেশে যাব।
যোদ্ধারা টারজনের সঙ্গে শহরে গিয়ে দেখল সত্যিই পানসাৎ শহরের যোদ্ধাদের ডেকে উত্তেজিত করছে। তারা দেখল টারজনের কথাই ঠিক, সে সত্যিই জাদনের বন্ধু। তারা তাই টারজানকে ছেড়ে দিয়ে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের আক্রমণ করল।
যাবার আগে টারজান তাদের জিজ্ঞাসা করল, মোসারের দেশ কোথায়?
যোদ্ধারা বলল, তার দেশ হলো তুলুর। আলুরের সীমানা পার হয়ে আবার একটা বড় হ্রদ পাবে। তার দক্ষিণ দিকে তুলুর রাজ্য।
জেনকে কাঁধে তুলে নিয়ে যেতে পারছিল না মোসার। তখন সে তাকে হটিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল। আলুর নগরীর সীমানাটা কোন রকমে পার হয়ে সে জেনকে টানতে টানতে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করল। এমন সময় মোসার দলের যোদ্ধাদের দেখতে পেল। তারই জন্য অপেক্ষা করছিল নগরের বাইরে এক জায়গায়। মোসার তখন তাদের দু’জনকে জেনকে তুলে নিয়ে যাবার জন্য হুকুম করল।
হ্রদের ঘাটে এসে ওরা সবাই তিনটে নৌকায় চাপল।
মোসার সদলবলে জেনকে নিয়ে নৌকা ছেড়ে দিল। এক সময় মোসার অন্যমনস্ক হওয়ায় সুযোগ বুঝে জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে কুলের দিকে চলে গেল জেন।
এদিকে টারজান হ্রদের কাছে এসে একটা নৌকা পেয়ে তাতে উঠে পড়ে নিজেই দাঁড় বাইতে লাগল। সে বুঝতে পারল এই হ্রদটার ওপারে দক্ষিণ কূলে আছে মোসারের তুলুর রাজ্য।
লুদন আবার আলুর থেকে দু’জন পুরোহিতকে পাঠিয়েছেন মোসারকে আলুরে নিয়ে যাবার জন্য। কারণ সে তাকে রাজা করতে চায়। তুলুর থেকে যে তিরিশজন যোদ্ধা আলুরের পথে নৌকায় করে আসছিল তাদের সঙ্গে পথে দেখা হলো আলুরের পুরোহিত দু’জনের সঙ্গে। তারাও একটা নৌকায় করে যাচ্ছিল। তাদের নৌকাগুলো এক জায়গায় হতেই তারা পরস্পরের খবরাখবর নিতে লাগল। তখন তারা দেখল একটা নৌকা চালিয়ে টারজান জাদ-গুরু নামে সেই বিদেশীটা তুলুরের দিকে যাচ্ছে। তাকে তারা। সবাই ভয়ের চোখে দেখত। তুলুরের যোদ্ধারা আলুরের পুরোহিতদের বলল, তোমরা তাড়াতাড়ি তুলুরে গিয়ে মোসারকে সাবধান করে দাও।
আলুরের পুরোহিতরা তুলুরের রাজসভায় গিয়ে মোসারের সঙ্গে দেখা করতেই একজন প্রহরী এসে খবর দিল, ডোর-উলফ-ওথো প্রাসাদ দ্বারে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
জেন সাঁতার কেটে হ্রদটা পার হয়ে কূলের উপর উঠে বনের ধারে একটা গাছতলায় বসে রইল। আজ কয়েক মাস ধরে বন্দীজীবন যাপন করছে সে। প্রথমে কাইজারের আদেশে হপম্যান ফ্রিৎস স্লাইদার ব্রিটিশবিরোধী জার্মান সেনাপতি হিসেবে ব্রিটিশ অধিকৃত পূর্ব আফ্রিকায় অভিযান চালাতে গিয়ে লর্ড গ্রেস্টোকের বাংলোতে ধ্বংস কার্য চালায় এবং জেনকে বন্দী করে তুলে নিয়ে যায়।
টারজানও ব্রিটিশদের সহায়তায় তার ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রতিশোধবাসনায় উন্মত্ত হয়ে জার্মানদের উপর অনেক অত্যাচার করে। জার্মানরা তখন বিজয়ী ব্রিটিশরা যে পথে এগিয়ে আসছিল সেই পথটা এড়াবার জন্য স্লাইদারের সহকারী লেফটেন্যান্ট ওবারগাৎসের প্রহরাধীন জেনকে অন্য পথে পাঠিয়ে দেয়।
ওবারগাৎসের সঙ্গে তখন ছিল একদল আদিবাসী সৈন্য। এই সেনাদল আর জেনকে নিয়ে সে দক্ষিণ আফ্রিকার একটা আদিবাসী গাঁয়ে গিয়ে ওঠে।
একদিন যে আদিবাসী মহিলাটি জেনের দেখাশোনা করত, জেনের প্রতি স্নেহবশত সে এসে জেনকে সাবধান করে দেয়। বলে আজ রাতেই ঐ শ্বেতাঙ্গকে তারা হত্যা করবে।
কথাটা শুনেই ওবারগাৎসের ঘরে চলে গেল জেন। জেন তাকে সব কথা খুলে বলল, শেষে বলল, আজ রাতটা আমরা এখানে থাকলেই আমাদের মেরে ফেলবে ওরা। সুতরাং এখনি আমাদের পালিয়ে যেতে হবে এখান থেকে।
