আজকের এই ভোজসভায় প্রচুর মদ্যপান করে সকলেই প্রায় মাতাল হয়ে উঠেছিল। সবচেয়ে বেশি মাতাল হয়ে উঠেছিল বুলাৎ। সে নেশার ঘোরো সব কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। সে একপাত্র মদ নিয়ে বলল, আমি একটা ওলোয়ার নামে পান করছি।
এ কথায় রেগে গেল কোতান। সে গম্ভীরভাবে চড়া গলায় বলে উঠল, এ কথা বলতে তুমি পার না, কারণ এখনো তোমার সঙ্গে ওলোয়ার বিয়ে হয়নি।
সঙ্গে সঙ্গে চৈতন্য হলো বুলাতের। সে এ কথার মানে বেশই বুঝতে পারল। অথচ নেশার ঘোরও তার বেশ ছিল। সে রাগের মাথায় তার কোমরে ঝোলানো খাপ থেকে ধারালো ছোরাটা বার করে সেটা সামনে বসে থাকা কোতানের বুক লক্ষ্য করে সজোরে ছুঁড়ে দিল। টারজান–১৬ক।
ছোরাটা কোতানের বুকে আমূল বিদ্ধ হয়ে যেতেই সে পড়ে গেল। বুলাৎ তখন তার অপরাধের গুরুত্ব বুঝতে পেরে পালিয়ে যাবার জন্য দরজার কাছে এগিয়ে গেল। কিন্তু প্রহরীরা তার পথ আটকে দাঁড়াল।
মোসার তখন এগিয়ে গিয়ে বলল, কোতান মারা গেছে। এখন মোসার হচ্ছে রাজ্জা। সুতরাং আমার অনুচর যোদ্ধারা এসে আমাকে রক্ষা করো।
মোসারের এই কথায় তার কিছু অনুগামী যোদ্ধা এগিয়ে এসে মোসার ও বুলাকে ঘিরে দাঁড়াল। কিন্তু ঠিক এমন সময় জাদন ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে বলল, এখন ওদের দুজনকেই গ্রেফতার করো। কোতানের বিশ্বাসঘাতক হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি হওয়ার পর পান-উলফ-দলের যোদ্ধারা তাদের রাজাকে মনোনীত করে নেবে।
বেগতিক দেখে মোসার ও বুলাৎ এক সময় লুকিয়ে পালিয়ে গেল ভোজসভার ঘর থেকে।
ওরা দু’জনে প্রাসাদ ত্যাগ করে সোজা নিজেদের দেশে পালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু গেটের কাছে যেতেই হঠাৎ মোসার বুলাকে বলল, চল, যাবার সময় ওলোয়াকে নিয়ে আসি।
বুলাৎ বলল, তাহলে আমরা ধরা পড়ে যাব।
মোসার বলল, এখন ওরা মারামারি করছে। ওলোয়ার নিরাপত্তার ব্যাপারে নজর দিতে পারবে না।
এই বলে মোসার বুলাকে সঙ্গে নিয়ে ওলোয়ার অন্তঃপুরে গিয়ে চাতুরী করে বলল, ওলোয়া, একটা দারুণ দুঃসংবাদ আছে। রাজ্যের যোদ্ধারা হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। তারা এইমাত্র কোতানকে হত্যা করেছে। তারা এখন মাতাল অবস্থায় এই দিকে আসছে। এখন এখানে থাকা নিরাপদ নয় তোমার পক্ষে। তাই তোমাকে আমি নিরাপদে আমাদের রাজ্যে নিয়ে যাবার জন্য এসেছি।
কথাটা শুনে ওলোয়া বলল, আমার বাবা রাজা কোতান মারা গেছে? তা যদি হয় তাহলে ত এখন আমিই রাণী। পাল-উলফ-দলের যোদ্ধারা নতুন রাজা মনোনীত না করা পর্যন্ত রাজ্যের আইন অনুসারে আমিই রাণী। আমি তোমার অযোগ্য কাপুরুষ ছেলেকে কখনই বিয়ে করতে চাইনি। এখনই চলে যাও এখান থেকে।
মোসার এবার রেগে গিয়ে বুলাকে বলল, বুলাৎ, তোমার স্ত্রীকে নিয়ে যাও আর আমি এই বিদেশিনী নারীকে নিয়ে যাচ্ছি।
এই বলে ওলোয়া ও পানাৎ লী কিছু বুঝতে পারার আগেই জেনকে ধরে কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
মোসারের ব্যাপার দেখে উৎসাহিত হয়ে বুলাৎ ওলোয়াকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য উদ্যত হলো। কিন্তু পানাৎ লী পুলাতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বাধা দিতে লাগল। বুলাৎ তখন তার ছুরি পানাৎ লীকে হত্যা করতে যেতেই বাইরে থেকে কে একজন ঘরে ঢুকে বুলাতের হাত ধরে তার মুখে একটা ভয়ঙ্কর ঘুষি মারল।
টারজানকে দেখে পানাৎ লী আর ওলোয়া দুজনেই চিনতে পারল। টারজান দেখল আর সময় নেই। সে বলল সেই বিদেশিনী মহিলা কোথায়? সে আমারই স্ত্রী।
পানাৎ লী বলল, এই মৃত লোকটার বাবা মোসার তাকে নিয়ে পালিয়েছে একটু আগে। ওর বাড়ি তুলুর।
টারজান বলল, ঠিক আছে আমি তাকে উদ্ধার করার জন্য যাচ্ছি। পরে ফিরে এসে তোমাদের উদ্ধার করব।
গ্রীফের হাত থেকে বাঁচার জন্য হ্রদের জলে ঝাঁপ দেয় টারজান। টারজান পাথরের পাঁচিলটা অতি কষ্টে পার হয়ে সাঁতার কেটে কূলে গিয়ে উঠল।
ইচ্ছা করলে কূলে উঠে আলুর নগরীর বাইরে চলে যেতে পারত টারজান। কিন্তু জেনের কথা ভেবে তা পারল না। সে নিষিদ্ধ বাগানে জেনের খোঁজে যাবার জন্য পুরোহিতের পোশাক পরে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে লুদন সেই ঘর থেকে ফিরে এসে তার ঘরের মধ্যে তার বিশ্বস্ত পুরোহিতদের ডেকে তাদের সঙ্গে এই অপমানের প্রতিশোধ নেবার কথা আলোচনা করতে লাগল। টারজান লুদনের ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় বারান্দার এক পাশে নৈশ্য ছায়ায় গা-ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে লুদনদের চক্রান্তমূলক আলোচনার কথা শুনতে লাগল। সুদন প্রথমে একজন পুরোহিতের হাতে কোতানকে হত্যা করার ভার দিল। বলল, কোতান প্রধান পুরোহিতের আদেশ লঙ্ঘন করে তাকে অপমানিত করেছে। সুতরাং তাকে হত্যা করে মন্দিরের পুরোহিতদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
লুন এবার পানসাৎ নামে এক পুরোহিতকে শহরের মধ্যে গিয়ে তার অনুগামী যোদ্ধাদের গুপ্তদ্বার দিয়ে প্রাসাদে আনবার জন্য যেতে বলল। সে বলল, কোতানের মৃত্যুর পর জাদন রাজা হতে চাইবে। কিন্তু তোমরা মোসারকে তার বাড়ি থেকে নিয়ে এস। শুনছি সে গোলমালের সময় বাড়ি পালিয়ে গেছে। তাকে আমি রাজা করব। সে আমার মতের লোক। সে রাজা হলে আমাদের আধিপত্য সবক্ষেত্রে বজায় থাকবে।
লুদন একজন পুরোহিতকে জিজ্ঞাসা করল, সেই বন্দিনী মহিলাটি কোথায়?
পুরোহিত বলল, জাদন তাকে জোর করে প্রাসাদের অন্তঃপুরে ঢুকে রাজকন্যার ঘরে নিয়ে গেছে।
