গম্বুজের মত দোতলা ঘরটা মন্দিরের বাইরের দিকে। তার ওধারেই সেই বিরাট হ্রদ।
টারজান দেখল একতলায় একটা মিট মিট করে আলো জ্বলছে। চাপা গলায় দু’জন লোক কথা বলছে। সে তার ঘ্রাণশক্তির তীক্ষ্ণতার দ্বারা বুঝতে পারল এই ঘরে একজন মহিলা আছে। সে ক্রমে বুঝতে পারল লুদনই কথা বলছে জেনের সঙ্গে। জেনই হচ্ছে বিদেশিনী মহিলা।
টারজান খেয়াল করেনি ঘরটার নিচেরতলাটা দুভাগে বিভক্ত ছিল। লুন জেনের সঙ্গে যেখানে কথা বলছিল তার পাশে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা একটা অন্ধকার কুঠরি ছিল। টারজান না জেনেই সেই অন্ধকার কুঠরিটায় ঝাঁপ দিল।
ঝাঁপ দিতেই টারজান দেখল ঘরটা ভীষণ অন্ধকার। অন্ধকারে হাতড়ে কাউকে না পেয়ে সে জেনের নাম ধরে ডাকতে লাগল। কিন্তু জেন কোন উত্তর দিল না। তার বদলে লুদন তার গলার স্বর চিনতে পেরে চীৎকার করে বলল, তোমার পিতা জাদ-বেন-ওখোর কাছে যাও।
সেই কুঠরিটার পিছন দিকে একটা জানালা ছিল। জানালাটা খোলা থাকায় সেখান দিয়ে চাঁদের আলো আসছিল। টারজান দেখল জানালাটার পাশ দিয়ে একটা টানা বারান্দা চলে গেছে। তার একদিকে সেই বিরাট হ্রদ আর একদিকে সাদা রঙের একটা উচুঁ পাঁচিল।
সহসা টারজান চাঁদের আলোয় দেখল কোর-উলের অরণ্যে দেখা সেই গ্রীক বা ডাইনোসর নামে একটা ভয়ঙ্কর জন্তু রয়েছে বারান্দায়। সে বুঝল এই ছোট্ট কুঠরিটা থেকে সেই বিরাটকায় জন্তু আর তার ভয়ঙ্কর লম্বা লেজ থেকে পরিত্রাণ পাবার কোন উপায় নেই।
এদিকে জন্তুটা তার উপস্থিতির কথা বুঝতে পেরে শিং উঁচিয়ে তেড়ে আসছে তার দিকে। টারজান তখন অন্য কোন উপায় না পেয়ে ছুটে গিয়ে হ্রদের জলে ঝাঁপ দিল।
এদিকে লুদন রাত্রিতে একা জেনকে বিয়েতে রাজী করাবার জন্য সেই ঘরটায় এসেছিল। দিনেরবেলায় কোতানের ভয়ে এখানে আসতে পারে না সে।
লুদনের কথায় জেন যখন রাজী হলো না তখন লুদন তাকে জোর করে ধরতে গেল। কিন্তু জেন। তাকে বলল, খবরদার, তুমি আমাকে ছোঁবে না। তাহলে দু’জনের একজন মরবেই।
এমন সময় পাশের ঘরে টারজনের পড়ার শব্দ হয়। টারজান ‘জেন জেন’ বলে চীৎকার করতে থাকে এবং তার গলার স্বর শুনে উপহাস করে লুদন তার পিতা জাদ-বেন-ওথোর কাছে ফিরে যেতে বলে।
এরপর লুদন আবার জেনের দিকে এগিয়ে এলে সহসা জাদন এসে ঘরে ঢোকে। লুদন তাকে দেখেই বলে ওঠে, জাদন এমন সময় এখানে?
জেন দেখল গম্ভীর মুখে এক যোদ্ধা সুদনের দিকে কঠোরভাবে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে তাকে তার ত্রাণকর্তা বলে মনে হলো।
জাদন বলল, আমি কোতানের কাছ থেকে আসছি। বিদেশিনী মহিলাকে নিষিদ্ধ বাগানের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে।
লুদন চুপ করে রইল। সে জানত কোতান কেন জাদনের উপর এ কাজের ভার দিয়েছে। কারণ এই জাদনই তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সামন্ত আর শক্তিশালী যোদ্ধা। এই জাদনই পুরোহিতদের সবরকমের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করে আসছে রাজা কোতানকে।
লুদন তাই সরাসরি জাদনের বিরোধিতা না করে তাকে কৌশলে ফাঁদে ফেলার জন্য বলল, ঠিক আছে, পাশের ঘরে এস, এ নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
কিন্তু তখন জেন জাদনকে বলল, আপনি যদি বাঁচতে চান তাহলে ওঘরে যাবেন না।
জাদন এবার জেনকে জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু কেন তুমি ওকথা বলছ?
জেন বলল, ওঘরটা অন্ধকার কারাগার। ওখানে একটা জন্তু আছে। ও আমাকে ওঘরে জোর করে ঢুকিয়ে দেবে বলে মাঝে মাঝে ভয় দেখাত।
জাদন সাবধান হয়ে যেতে লুদন চলে গেল। জাদন জেনকে বলল, কেন তুমি আমাকে সাবধান করে দিলে? আমি ত তোমায় মুক্তি দিতে পারব না।
জেন বলল, লুদন হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কিন্তু তোমাকে দেখে একজন সত্যিকারের বীর এবং সম্মানিত ব্যক্তি বলে মনে হয়।
জাদন বলল, তুমি বুদ্ধিমতী। এখন আমার সঙ্গে এস। তুমি এখন নিষিদ্ধ বাগানের পাশে রাজকন্যা ওলোয়ার ঘরে থাকবে। এই কারাগারের থেকে সেখানটা নিরাপদ।
জেন ভয়ে ভয়ে বলল, কিন্তু কোন?
জাদন বলল, তোমাকে বিয়ে করার আগে কতকগুলো অনুষ্ঠানের ব্যাপার আছে। তাতে বেশ কয়েকদিন লেগে যাবে। তাছাড়া বিয়ের ব্যাপারে একটা সমস্যা আছে। কারণ রাজার বিয়ে একমাত্র পুরোহিতই দিতে পারে এবং লুদনের এতে মত নেই।
জেন বলল, ঠিক আছে, যত দেরী হয় ততই ভাল।
মন্দিরের সীমানা পার হয়ে প্রাসাদে ঢুকতে যাবার মুখে দু’জন পুরোহিত জাদন আর জেনকে ঢুকতে দিতে চাইল না। তারা বলল, একমাত্র প্রধান পুরোহিত লুদনের হুকুম ছাড়া বন্দিনী প্রাসাদে ঢুকতে পারবে না।
জাদন তার ছুরিতে হাত দিয়ে বলল, রাজা কোতানের আদেশে ও প্রাসাদ অন্তঃপুরে যাচ্ছে এবং অন্যতম সামন্ত জাদন তাকে নিয়ে যাচ্ছে। সরে যাও। ওকে ঢুকতে দাও।
তারা সরে যেতেই জাদন জেনকে নিয়ে প্রাসাদে ঢুকে পড়ল। জাদন এবার অন্তঃপুরের দিকে এগিয়ে গেল। যেখানে একজন প্রহরীকে বলল, এই বিদেশিনী মহিলাকে রাজকন্যা ওলোয়ার ঘরে নিয়ে যাও।
প্রহরী জেনকে সঙ্গে করে ওলোয়ার ঘরের সামনে গিয়ে বাইরে থেকে বলল, রাজকুমারী, এই সেই বিদেশিনী বন্দিনী এসেছে, আপনার ঘরে যাবে।
ভিতর থেকে ওলোয়া বলল, ওকে আসতে বল এখানে।
জেন ঘরের ভিতরে ঢুকলে প্রহরী চলে গেল।
সেদিন রাত্রিতে কোতানের রাজপ্রাসাদে ভোজসভাটা একটু আগেই শুরু হয়েছিল। পরদিন বুলাতের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে হবে। সেই উপলক্ষ্যে রাজা কোতান এই রাজসভার আয়োজন করেছে। বুলাতের বাবা মোসার রাজ্যের একজন শক্তিশালী সামন্ত।
