মেয়েটি বলল, আমি যখন বিপদে পড়েছিলাম তখন তুমি তো পালিয়ে যাও নি।
লোকটি কি যেন বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই গোরিলাটা আক্রমণ করে বসল। বুড়ো টাইমার মুগুর দিয়ে তাকে আঘাত করল; মেয়েটিও আঘাত করতে লাগল। সব বৃথা! জন্তুটা বুড়ো টাইমারের হাত থেকে মুগুরটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর অন্য হাতে আঘাত করল কালি বাওয়ানাকে; মেয়েটির মাথা ঘুরতে লাগল। গোরিলাটা মুহূর্তের মধ্যে বুড়ো টাইমারকে একটা ভাঙ্গা পুতুলের মত তুলে নিয়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল।
আঘাতের জের কাটিয়ে টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটি বুঝল সে একেবারে একা; বুড়ো টাইমার ও জন্তুটা উধাও। চেঁচিয়ে ডাকল; কোন সাড়া নেই। ভাবল, তাকে খুঁজতে যাবে, কিন্তু তারা, কোন্ পথে গেছে তাই তো সে জানে না তাহলে? এই প্রথম কালি বাওয়ানার মনে একটা নতুন অনুভূতি জাগল। এই মানুষটি তো তারই মানুষ। সেই তো তাকে ডেকেছিল- আমার কালি।
অরণ্যরাজ টারজান ভাগ্যের হাতেই নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে। হাত-পায়ের যে বন্ধন অচ্ছেদ্য তাকে ছিন্ন করার ব্যর্থ চেষ্টায় সে শক্তি ক্ষয় করে নি, আবার অকারণ অনুশোচনার গ্লানিও ভোগ করে নি। সে চুপচাপ শুয়ে থাকে। নকিমাও মনমরা হয়ে তার পাশেই বসে থাকে।
বেলা পড়ে আসছে। এমন সময় কার যেন পদধ্বনি টারজনের কানে এল। নকিমা বা বড় গোরিলা সে শব্দ শোনার আগেই সে শুনতে পেল; সঙ্গে সঙ্গে গরু-র গরু-র, শব্দ করে সে সকলকে সজাগ করে দিল। লোমশ জন্তুগুলো কান খাড়া করল। মেয়ে জন্তুগুলোও এসে হাজির হল।
একটা প্রকাণ্ড মূর্তি হেলে-দুলে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল। সে গা-ইয়াট। তার এক বগলে একটা মানুষ।
বুড়ো টাইমারকে নিয়ে গা-ইয়াট টারজনের সামনে মাটিতে নামিয়ে দিল। বলল, আমি গা-ইয়াট। এই নাও একটা টার্মাঙ্গানি। কোন গোমাঙ্গানির দেখা পেলাম না।
গোরিলারা ক্রমেই বুড়ো টাইমারের কাছাকাছি আসতে লাগল। গোরিলাদের এত বড় দল সে আগে কখনও দেখে নি; গোরিলা যে এত বড় হয় তাও সে জানত না। হয়তো এগুলো গোরিলাই নয়; এরা গোরিলার চাইতে অনেক বেশি মানুষের মত দেখতে। আদিবাসীরা এই সব লোমশ মানুষদের কথা বলে বটে, কিন্তু সে সব গল্প বিশ্বাস করত না। সে আরও দেখত, হাত-পা বাঁধা একটি অসহায় সাদা মানুষ গোরিলাদের মাঝখানে শুয়ে আছে। প্রথমে সে তাকে চিনতে পারে নি। ভাবল, সেও হয়তো এই সব বন মানুষদের হাতে বন্দী। বন-মানুষটা যে কালির বদলে তাকে ধরে এনেছে সে জন্য সে কৃতজ্ঞ। বেচারী কালি! না জানি তার কপালে কি ঘটেছে।
গোরিলারা বুড়ো টাইমারকে ঘিরে ধরেছে। তাদের উদ্দেশ্যও স্পষ্ট। সে বেশ বুঝল, তার শেষের দিন সমাগত। তার পরই-কী আশ্চর্য! পাশেই মানুষটি গর্জন করে উঠল; ঠোঁট উল্টে যাওয়ায় তার ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল। বলল, সাবধান! এই টার্মাঙ্গানি টারজনের সম্পত্তি; কেউ তার কোন ক্ষতি করো না।
গা-ইয়াট ও জু-টো ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্য সব গোরিলাদের তাড়িয়ে দিল। বুড়ো টাইমার অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। টারজনের কথা সে বুঝতে পারে নি; সে যে গোরিলাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে এটা তার বিশ্বাস হয় না; কিন্তু নিজের চোখকে সে অবিশ্বাস করবে কেমন করে?
গম্ভীর নিচু গলায় ইংরেজি ভাষায় কেন যেন বলে উঠল, এক বিপদ পার হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আর এক বিপদে পড়েছ।
বুড়ো টাইমার বক্তার দিকে ফিরে তাকাল। গলাটা যেন চেনা-চেনা লাগছে। এতক্ষণে চিনতে পেরেই সোল্লাসে বলে উঠল, তুমিই তো আমাকে মন্দিরের বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলে!
আর এখন আমিই পড়েছি বিপদে, টারজান বলল।
বুড়ো টাইমার বলল, বিপদ তো দু’জনেরই। ওরা আমাদের নিয়ে কি করবে বলে আমার ধারণা?
কিছুই করবে না, টারজান বলল।
তাহলে আমাকে এখানে এনেছ কেন?
টারজান বলল, আমিই ওদের বলেছিলাম একটি মানুষকে ধরে আনতে। ঘটনাক্রমে তোমাকেই সে প্রথম দেখতে পেয়েছিল।
ওই জানোয়ারটাকে তুমি পাঠিয়েছিলে? তুমি যা বল তাই ওরা করে? তুমি কে? আর কেনই বা একটা মানুষকে আনতে ওকে পাঠিয়েছিলে?
আমি অরণ্যরাজ টারজান। আমার হাত-পায়ের এই তারের বাঁধনগুলো খুলতে পারে এরকম একজনকে আমার প্রয়োজন। এই সব গোরিলা বা নকিমাকে দিয়ে সে কাজটা হয় নি।
বুড়ো টাইমার বলে উঠল, তুমিই অরণ্যরাজ টারজান! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আদিবাসীদের উপকথার এক নায়ক। বলতে বলতেই সে অতি সহজে টারজনের হাত-পায়ের তামার তারের বাঁধন খুলতে লাগল।
টারজান শুধাল, সেই সাদা মেয়েটির কি হল? তুমি তো তাকে নিয়ে বামনদের গাঁ থেকে বেরিয়ে গেলে, কিন্তু আমি পারলাম না, বেঁটা শয়তান আমাকে আটক করল!
তুমি সেখানে ছিলে! ওহো, এবার বুঝতে পেরেছি; তুমিই তীরগুলো ছুঁড়েছিলে।
হ্যাঁ।
তারা তোমাকে ধরল কেমন করে, আর তুমি ছাড়াই বা পেলে কেমন করে? আমি ছিলাম একটা গাছের উপরে-ডালটা ভেঙে পড়ল। মুহূর্তের জন্য জ্ঞান হারিয়েছিলাম। সেই সুযোগে তারা আমাকে বেঁধে ফেলে।
ঠিক বটে। গ্রাম ছেড়ে আসার সময় একটা মড়মড় শব্দ শুনেছিলাম।
টারজান বলল, নিঃসন্দেহে বড় গোরিলাদের আমি ডেকেছিলাম, আর তারাই গিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে এসেছে। ভাল কথা, সাদা মেয়েটি কোথায়?
আমরা দুজন শিবিরের দিকেই যাচ্ছিলাম, এমন সময় গোরিলাটা আমাকে পাকড়াও করল, বুড়ো টাইমার বলল। সেখানে সে এখন একা রয়েছে। তার খুলে দেবার পরে আমি তার কাছে ফিরে যেতে পারব তো?
