টারজান বলল, কোন দুঃসংবাদ আছে কোতান?
কোতান কিন্তু উত্তর দিল না একথার। সহসা মুখ তুলে তার যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বলল, ধরো ওকে, কারণ প্রধান পুরোহিত লুদন বলছে, ও প্রতারক।
কোতান আরও বলল, লুদন বলছে, তুমি জাদ-বেন-ওথোর পুত্র নও। তোমাকে অভিযোগকারীর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তোমার বিচার হবে। মনে রাখবে এসব ব্যাপারে রাজার কোন হাত নেই। তাঁকে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ মেনে চলতে হয়।
অবশেষে ঠিক হলো বিচার হবে মন্দিরে। লুদন টারজান ও কোতানকে একটি বড় বেদীর কাছে নিয়ে গেল। সেখানে একটা উঁচু জায়গার উপর টারজানকে বসতে বলল লুদন। টারজান দেখল বেদীর উপর একটি জলভরা গামলার মধ্যে এক নবজাত শিশুর মৃতদেহ রয়েছে।
টারজান লুদনকে জিজ্ঞাসা করল, এর মানে কি?
কুটিল হাসি হেসে লুদন বলল, দেবতা হয়ে তুমি এটা জান না? এই না জানাটাই তোমার দেবত্ব সম্বন্ধে দাবির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সর্বজ্ঞ দেবতার পুত্র হয়েও একথাটা তুমি জান না যে প্রতিদিন সূর্য অস্ত যাবার সঙ্গে সঙ্গে যেমন এক বয়স্ক ব্যক্তিকে পূর্ব দিকের একটি বেদীতে বলি দেয়া হয় তেমনি প্রতিদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি নবজাত শিশুকে বলি দেয়া হয় পশ্চিম দিকের বেদীতে। যে কথা প্রতিটি হোদন শিশু জানে, সে কথা তুমি জাদ-বেন-ওথোর পুত্র হয়েও জান না।
এই বলে লুদন একজন কৃষ্ণকায় ক্রীতদাসকে ডাকল। সে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলে লুদন টারজানকে দেখিয়ে বলল, বল তুমি এর সম্বন্ধে কি জান?
সেই ওয়াজদন ক্রীতদাসটি বলল, আমি কোর-উলফ-লুনের এক অধিবাসী। দিনকতক আগে কোর উলফ-জার একদল যোদ্ধার সঙ্গে আমাদের লড়াই হয়। ও তখন কোর-উলফ-জার পক্ষে লড়াই করছিল। ওকে তারা টারজান জাদ-গুরু বলে ডাকছিল। কিন্তু ও দেবতা নয়। কারণ এক সময় ওর পিছন থেকে একজন ওর মাথায় একটা লাঠির আঘাত মারতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে যায় এবং তখন আমাদের লোকেরা ওকে বন্দী করে নিয়ে যায়। পরে ও প্রহরীকে হত্যা করে সেখান থেকে পালিয়ে আসে।
জাদন বলল, একজন দেবতার বিরুদ্ধে একজন ক্রীতদাসের একথা মেনে নেওয়া উচিৎ নয়।
লুদন বলল, রাজকন্যার কথা হয়ত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে আপনার পক্ষে।
কোতান লুদনকে জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু আমার মেয়ে এ সম্বন্ধে কি জানে? তুমি নিশ্চয় আমার মেয়েকে সর্বসমক্ষে হাজির করাবে না।
লুদন বলল, না, তাঁর দাসীর সাক্ষ্যই যথেষ্ট হবে।
এই বলে একজন অধীনস্থ পুরোহিতকে পানাৎ লীকে আনার জন্য হুকুম করল লুন।
পানাৎ লীকে আনা হলে লুদন বলল, পানাৎ লী নামে এই মেয়েটিকে গতকাল যখন ধরে আনা হয় তখন সে বলেছিল এই লোকটিই তাকে কোর-উলফ-গ্রীফের অরণ্যে একজন তেরোদন আর দুটো ভয়ঙ্কর জন্তুর হাত থেকে উদ্ধার করে। পরে সে তার দেশ কোর-উলফ-জার পথে যাবার সময় ধরা পড়ে আমাদের হাত।
লুদন আবার বলল, এর দ্বারা এই কথাই প্রমাণ হয় না কি যে লোকটা কোন দেবতার পুত্র নয়?
পানাৎ লী বলল, কিন্তু ওঁকে দেখে মানুষ বলেও মনে হয়নি।
লুদন আবার জিজ্ঞাসা করল পানাৎ লীকে। বলল, ও কি তোমাকে একথা বলেছিল যে ও দেবতা জাদ-বেন-ওথোর পুত্র?
পানাৎ লী ভয়ে ভয়ে বলল, না।
লুদন বলল, খুব হয়েছে। আর না। এই কে আছে, ওকে বন্দী করো। আগামীকালই জাদ-বেন ওথোর নির্দেশমত ওকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে।
যোদ্ধারা পুরোহিতদের মধ্যে সবচেয়ে আগে যে লোকটা হাত বাড়িয়ে টারজানকে ধরতে গেল, টারজান সেই লোকটার একটা হাত আর পা বজ্রমুষ্ঠিতে ধরে বেদীর উপর তুলে ধরল। তারপর লুদন ছুরি হাতে টারজনের দিকে এগিয়ে গেল। টারজান সেই পুরোহিতের দেহটা সজোরে লুদনের গায়ের উপর ছুঁড়ে দিল। লুদন টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল।
এই অবকাশে টারজান বেদীর পিছনের দিকে নগর প্রাচীরের যে অংশ ছিল তার উপরে বেদী থেকে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল। সেখান থেকে আবার লাফ দিয়ে একেবারে আলুর নগরীর বাইরে চলে যাবার আগে বলে গেল সে, মনে ভেবো না জাদ-বেন-ওথো তার পুত্রকে ত্যাগ করেছেন।
এই বলে নগর প্রাচীর থেকে লাফ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আলুরের মন্দিরের মাঝে পুরোহিতরা যখন টারজানকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল তখন একজন নগ্ন বিদেশী রাইফেল হাতে পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকা পার হয়ে কোর-উলফ-জার দিকে এগিয়ে চলেছিল। সে দেখল একজন লম্বা শ্বেতাঙ্গ শিকারে যাচ্ছে। তার হাতে ছিল একটা মোটা লাঠি আর এটা ছুরি খাপের মধ্যে কোমরে ঝোলানো ছিল। এই শিকারী হলো তাদেন।
তাদেন দেখল টারজান যে জাতির লোক এই বিদেশীও সেই জাতির লোক। বিদেশী হাত তুলে বোঝাতে চাইল সে শান্তি ও বন্ধুত্ব চায়।
তাদেন বিদেশীকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে?
বিদেশী বলল, সে তার ভাষা বুঝতে পারছে না। বিদেশী তাদেনের লেজ দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। তাদেন তাকে হাবেভাবে বুঝিয়ে দিল সে শিকার করে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু আপাতত শিকারের কথা ভুলে গিয়ে তাদেন বিদেশীকে তার বন্ধু ওমতের কাছে নিয়ে যেতে চাইল। তার এই মনের কথাটা বিদেশীকে বুঝিয়ে দিতে সেও রাজী হয়ে গেল। তখন তারা দুজনেই কোর-উলফ-জার পথে এগিয়ে যেতে লাগল।
ওমৎ তখন তার গুহায় ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওমৎ এসে গেল।
তাদেন ওমৎকে বলল, আমার মনে হয় এই বিদেশী টারজানকেই খুঁজছে।
