মন্দিরে ঘুরতে ঘুরতে টারজান দেখল অনেক ওয়াজদন ক্রীতদাস একটা ঘেরা জায়গার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হোদরা ওয়াজদনদের গায়ে গিয়ে তাদের ধরে এনেছে।
টারজান এক সময় লুদেনকে জিজ্ঞাসা করল, এরা কারা?
লুদেন বলল, জাদ-বেন-ওথোর পুত্র একথা ভালই জানেন।
টারজান শান্তভাবে বলল, ডোর-উলফ-ওথোর কোন প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করতে নেই। মনে রেখ ভণ্ড পুরোহিতের রক্ত জাদ-বেন-ওথোর প্রিয় বস্তু।
লুদেন তখন বলল, প্রতিদিন তোমার পিতা জাদ-বেন-ওখো দিনের শেষে পশ্চিম দিকে অস্ত গেলে ঐ সব ক্রীতদাসদের একজনের রক্ত দিয়ে পূর্ব দিকের বেদীটা ধুয়ে দিতে হয়।
টারজান বলল, কে তোমাদের বলল যে জাদ-বেন-ওথো তাঁর সৃষ্ট মানুষদের রক্ত চান? তাঁর বেদীর উপর মানুষ খুন করতে কে বলল তোমাদের?
লুদেন বলল, তাহলে কি হাজার হাজার মানুষ বৃথা রক্ত দান করছে?
কোতান, অন্যান্য যোদ্ধারা, পুরোহিতরা এবং ক্রীতদাসরা টারজনের কথাগুলো সব শুনছিল। টারজান বলল, ঐ সব ক্রীতদাসদের মুক্ত করে দাও। জাদ-বেন-ওথোর নামে আমি বলছি তোমরা ভুল করছ।
লুদেনের মুখখানা ম্লান হয়ে গেল। সে চীৎকার করে তার পাশের পুরোহিতদের বলল, জাদ-বেন ওথোর পুত্র বলেছেন। অতএব বন্দীদের ছেড়ে দাও। তাদের মুক্ত করে যেখান থেকে এনেছ সেখানে পাঠিয়ে দাও।
ক্রীতদাসরা সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত হয়েই টারজনের সামনে তারা প্রণিপাত হয়ে ভক্তিভরে প্রণাম জানাল।
কোতান তখন ভয়ে ভয়ে বলল, তাহলে কি করলে জাদ-বেন-ওথো তুষ্ট হবেন?
টারজান বলল, যদি তাকে তোমরা তুষ্ট করতে চাও তাহলে তার বেদীতে এমন সব খাদ্য ও উপহার পূজো হিসেবে দাও যেগুলো পরে শহরের গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা যাবে। এইভাবেই তোমরা দেবতার অনুগ্রহ লাভ করতে পারবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে টারজান একা একা প্রাসাদের চারদিকে ঘুরে দেখতে লাগল। প্রাসাদের। কেন্দ্রস্থলে চারদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা দেখতে পেল সে। জায়গায়টার মাথার উপরে কোন ছাদ নেই এবং পাঁচিলটার গায়েও কোন জানালা দরজা নেই। পাঁচিলের গায়ে এক জায়গায় একটা গাছ ছিল। টারজান সেই গাছটায় উঠে পড়ে গাছের উপর থেকে চারদিকে তাকাতে লাগল। সে দেখল পাঁচিলঘেরা সেই জায়গাটা আসলে একটা ঘেরা বাগান।
বাগানের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে টারজান এক সময় দেখতে পেল একজন সুন্দরী হোদন যুবতী তার সোনার বক্ষবন্দনীর উপর চেপে ধরে একটা পাখিকে আদর করছে আর তার পাশে একজন ওয়াজদন তরুণী বসে রয়েছে।
টারজান দেখল এই তরুণীই পানাৎ লী এবং তারই সে খোঁজ করছে গতকাল থেকে।
হোদন যুবতীটি তখন টারজানকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল, হে অতিথি, কে আপনি?
পানাৎ লী বলল, গতকাল রাজসভায় যে অতিথি আসে তার কথা শোননি?
যুবতীটি আশ্চর্য হয়ে বলল, আপনিই তাহলে ডোর-উলফ-ওথো?
টারজান বলল, হ্যাঁ। তুমি কে
? যুবতীটি বলল, আমি রাজা কোতানের কন্যা, নাম ওলোয়া।
টারজান বুঝল, এই ওলোয়াই হলো তাদেনের প্রেমিকা। সে এবার ওলোয়ার কাছে এসে বলল, হে কোতানকন্যা, জাদ-বেন-ওথো তোমার উপর তুষ্ট হয়ে অনুগ্রহ করে তোমার প্রেমাস্পদকে বহু বিপদ। আপদের কবল থেকে উদ্ধার করে আজও নিরাপদে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
ওলোয়া বলল, কিন্তু বুলাতের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে বলে বাবা কথা দিয়েছে।
টারজান বলল, কিন্তু বুলাকে তুমি ত ভালবাস না। তাছাড়া তিনি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েই তাদেনকে উদ্ধার করেছেন।
এই বলে টারজান উপরে মুখ তুলে বলল, থাম, জাদ-বেন-ওথো কি বলে শুনি।
উপরে মুখ তুলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, ওঠ, জাদ-বেন-ওখো আমাকে আকাশবাণীর মাধ্যমে বললেন, এই ক্রীতদাসী তরুণী পানাৎ লী। এর বাড়ি হলো কোর-উলফ-জা যেখানে তাদেন আছে।
ওলোয়া আর পানাৎ লী টারজনের সামনে নতজানু হয়ে বসেছিল। ওলোয়া উঠে দাঁড়িয়ে পানাৎ লীর মুখের দিকে তাকাল। পানাৎ লী বলল, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে।
ওলোয়া তখন টারজনের পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করে বলল, জাদ-বেন-ওথোর অসীম দয়া আমার উপর। আমি কৃতজ্ঞ তার কাছে।
টারজান বলল, যদি পানাৎ লীকে তোমরা তার বাড়িতে পাঠিয়ে দাও তাহলে আমার পিতা সন্তুষ্ট হবেন তোমাদের উপর।
ওলোয়া বলল, এ ব্যাপারে আমার কোন ক্ষমতা নেই। আমার বাবাকে একথা জানাবে সে।
সহসা পিছনের ঝোপ থেকে কে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে উঠল।
ওরা সবাই পিছন ফিরে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখল রাজা কোতান কখন এসে দাঁড়িয়েছে ওদের পিছনে।
টারজানকে দেখতে পেয়েই কোতান বলল, ও, আপনি ডোর-উলফ-ওথো? কিন্তু এখানে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে দেবতাদেরও যাওয়া নিষিদ্ধ, যেমন এই নিষিদ্ধ উদ্যান। আসুন ডোর-উলফ-ওথো।
এরপর কোন অন্য একটা পথ দিয়ে টারজানকে নিয়ে একটা ছোট ঘরে ঢুকল।
দরজার সামনেই প্রধান পুরোহিত লুদন দাঁড়িয়ে ছিল। টারজান তার চোখেমুখে এক কুটিল চক্রান্তের ভাব লক্ষ্য করল। কিছুকক্ষণ পর একজন যোদ্ধা ঘরের ভিতরে ঢুকে কোতানকে বলল, প্রধান পুরোহিত আপনাকে মন্দিরে ডাকছেন।
কোতান বলল, তাঁকে বল আমি যাচ্ছি।
এই বলে টারজনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল কোতান, আমি এখনি আসছি ডোর-উলফ-ওথো।
কিন্তু কোতান ফিরে এল এক ঘণ্টা পরে। কোতানের পানে তাকিয়েই চমকে উঠল টারজান। তার চোখে মুখে ভয়ের স্পষ্ট চিহ্ন ফুটে ছিল। তার হাতদুটো কাঁপছিল।
