হোদন যোদ্ধা আশ্চর্য হয়ে বলল, সত্যিই তুমি জাদ-বেন-ওথোর লোক? তা হলে তুমি হোদন বা। ওয়াজদন কেউ নও, আর তোমার লেজও নেই। এস আমার সঙ্গে, আমি তোমাকে রাজা কোতানের কাছে। নিয়ে যাব।
এই বলে সে নগরীর ভিতর দিয়ে টারজানকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল।
টারজনের পথ-প্রদর্শক সেই হোদন যোদ্ধা টারজানকে নিয়ে নগরদ্বারে যেতেই বারোজন প্রহরী ঘিরে ধরল তাদের। একজন যোদ্ধা প্রাসাদের ভিতরে রাজা কোতানকে খবর দিতে গেল। পনের মিনিট পরে একজন যোদ্ধা এসে টারজানকে খুঁটিয়ে দেখে বলল, কে তুমি? রাজা কোতানের কাছ থেকে কি চাও তুমি?
টারজান বলল, আমি কোতানের বন্ধু, কোতানের সঙ্গে দেখা করার জন্য জাদ-বেন-ওথোর দেশ থেকে এসেছি।
টারজনের কথায় হোন যোদ্ধারা ইতস্তত করতে লাগল। তাদের একজন তাকে বলল, তুমি কেমন করে এখানে এলে?
টারজান তখন রেগে গিয়ে বলল, ওখোর রোষ থেকে যদি বাঁচতে চাও তাহলে আমাকে এখনি রাজা কোতানের কাছে নিয়ে চল।
এ কথায় হোদরা ভয় পেয়ে গেল সবাই।
প্রথমে জাদ-বেন-ওথোর দূত ও পরে পুত্র হিসেবে পরিচয় দিল টারজান। তার এই শেষের কথাটায় কাজ হলো।
যে হোদন যোদ্ধাটি টারজনের সঙ্গে কথা বলছিল সে টারজানকে ভয়ে ভয়ে বলল, হে ডোর-উলফ ওথো, হতভাগ্য ডাকলতের উপর দয়া করো।
এই বলে সে পাশের লোকদের সরিয়ে টারজানকে সঙ্গে করে কোতানের প্রাসাদে নিয়ে গেল।
ডাকলৎ রাজা কোতানের পানে তাকিয়ে বলল, হে রাজন, একবার দেখ আমাদের একমাত্র দেবতা জাদ-বেন-ওখো তার ছেলেকে দূত হিসেবে পাঠিয়ে আমাদের কত অনুগ্রহ করেছেন।
উঠে দাঁড়াল কোতান। এক গভীর কৌতূহল আর আগ্রহের সঙ্গে দেখতে লাগল আগন্তুককে।
এদিকে টারজান তখন খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার হাত দুটো আড়াআড়িভাবে তার বুকের উপর চাপানো ছিল।
অবশেষে রাজসভার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে সিংহাসন থেকে ডাকলৎকে উদ্দেশ্য করে কোতান বলল, কে তোমাকে বলেছে যে আগন্তুক ডোর-উলফ-ওথো?
ডাকল টারজানকে দেখিয়ে উত্তর করল ভয়ে ভয়ে, উনি বলেছেন।
কোতান বলল, আর এই বিশ্বাস করতে হবে সত্য বলে?
ডাকলৎ বলল, শোন কোতান, তুমি নিজের চোখে যা দেখছ তা সত্য বলে মেনে নেয়াই উচিৎ। তুমি দেখ, ওঁর চেহারাটা সত্যিই দেবতার মত, ওঁর হাত পা আমাদের হাত পা থেকে আলাদা। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের পরম পিতা ওথোর মতই উনি লেজহীন।
এগুলো সত্যিই আগে ভাল করে দেখেনি কোতান। দেখে সত্যিই সে অবাক হয়ে গেল। এমন সময় একজন যুবক বয়সী হোন যোদ্ধা ভিড় সরিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে বলল, হ্যাঁ, কোতান ডাকলতের কথাই ঠিক। আমরা যখন গতকাল কোর-উলফ-লুন থেকে বন্দীদের ধরে নিয়ে আসছিলাম তখন আমি এই। দেবতাকে একটা ভয়ঙ্কর জন্তুর পিঠের উপর চড়ে আসতে দেখেছিলাম। ব্যাপারটা দেখেই ভয়ে পালিয়ে যাই আমরা বনের আড়ালে। কোন মানুষের পক্ষে কোর-উলফ অরণ্যের স্ত্রীফ নামে ঐ ভয়ঙ্কর জন্তুকে বশ করে তার পিঠে চড়ে তাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
এই কথায় বেশির ভাগ সভাসদ বিগলিত হয়ে পড়ল। তাদের মনে আর কোন সন্দেহ রইল না।
কোতান তখন টারজানকে বলল, তুমি যদি সত্যিই ডোর-উলফ-ওথো হও তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে আমার এই অবিশ্বাস আর সংশয় একেবারে অমূলক নয়, কারণ আমাদের দেবতা জাদ-বেন-ওখো যে দয়া করে তার পুত্রকে আমাদের কাছে পাঠাচ্ছেন সে কথা ত কোনভাবে জানাননি আমাদের। তাছাড়া আমরা কি করে জানব যে তাঁর পুত্র আছে?
টারজান বলল, রাজার উপযুক্ত কথাই বলেছ। জাতীয় দেবতা সম্পর্কে এই ধরনের ভয় আর সম্মানের সঙ্গে কথা বলা উচিৎ। জাদ-বেন-ওখো জানতে চান তুমি ঠিকমত কাজকর্ম করছ কি না। তা দেখার জন্যই তিনি আমাদের পাঠিয়েছেন এখানে। আমি এসে প্রথমেই যা দেখেছি তাতে বুঝেছি তুমি সত্যিই রাজা হবার উপযুক্ত।
রাজা কোতান তখন পিরামিডের মত সিংহাসন থেকে নেমে তাকে সশ্রদ্ধ অভ্যর্থনা জানিয়ে সিংহাসনে তার পাশে বসার জন্য আহ্বান জানাল।
টারজান সেই পিরামিডের উপর উঠে পাথরের যে বেঞ্চটায় কোন বসত তার উপর বসল। ঐটাই ছিল কোতানের সিংহাসন। কিন্তু তার পাশে কোন বসতে গেলে সে তাকে বাধা দিয়ে বলল, দেবতার পাশে কোন মানুষকে বসতে নেই।
টারজান বসার পর কোতানকে বলল, তবে দেবতা তার বিশ্বস্ত ভক্তকে তার পাশে বসার জন্য আহ্বান করতে পারে। এস কোতান, আমি তোমাকে জাদ-বেন-ওথোর নামে বসতে বলছি আমার পাশে।
কোতান তার আসনে টারজনের পাশে বসলে রাজসভার কাজকর্ম আবার শুরু হলো। টারজান হঠাৎ এসে পড়ায় সভার কাজ সব বন্ধ ছিল এতক্ষণ।
এক সময় সভার কাজকর্ম শেষ হয়ে গেলে কোতান নিজে সঙ্গে করে মন্দির দেখাতে নিয়ে গেল। টারজানকে। টারজান দেখল মন্দিরটা রাজপ্রাসাদেরই একটা অংশ। সেই মন্দিরের ভিতর নানা আকারের বেদী ছিল। সেই সব বেদীর অনেকগুলোতে লাল রং লেগে ছিল। টারজান তার তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তির সাহায্যে বুঝতে পারল ওগুলো শুকিয়ে যাওয়া মানুষের রক্তের দাগ।
টারজান দেখল প্রধান পুরোহিত সুদেনের চোখে মুখে তার দেবত্ব সম্বন্ধে এক সংশয়ের ছাপ ফুটে রয়েছে। তবু সে তার আচরণের মধ্যে এক আপাত আনুগত্যের ভাব দেখাচ্ছে। টারজান দেখল এখন তার একমাত্র ভয় লুদেনকে। প্রধান পুরোহিত হিসেবে একমাত্র সেই তার প্রতারণাকে ধরে ফেলতে পারে।
