অচেনা প্রাণীটা গাছ থেকে টারজনের সঙ্গীটির সামনে নেমে পড়ল লাফ দিয়ে। তারপর তার হাতের লাঠিটা তার মাথায় এমন জোরে মারল যে সে অচেতন হয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে।
টারজান যখন দেখল তার সঙ্গী অচেতন হয়ে পড়ে গেছে তখন সে আগন্তুক জন্তুটাকে একটা ঘুষি মেরে আক্রমণ করল।
টারজান এবার দেখল মাটির উপর অচেতন হয়ে এতক্ষল পড়ে থাকা তার সঙ্গীটি চোখ মেলে তাকিয়েছে। জ্ঞান ফিরে পেয়ে সে এখন সুস্থ হয়ে উঠেছে। সে উঠে দাঁড়াতেই আগন্তক গোরিলাটা তার সঙ্গে কথা বলতে লাগল। টারজান দেখল তারা পরস্পরের কথা বুঝতে পারছে এবং তাদের হাবভাব ও অঙ্গভঙ্গী দেখে মনে হলো তারা এখন বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চায় নিজেদের মধ্যে।
এরপর তারা দুজনে মিলে যাবার জন্য উদ্যত হয়ে টারজানকে তাদের সঙ্গে ইশারায় যেতে বলল।
টারজানও দেখল ওদের সঙ্গে গিয়ে এ অঞ্চলের অজানা জায়গাগুলোকে জেনে নেয়া ভাল। তাতে জেনকে খোঁজার কাজ সহজ হবে। সে তাই কোন আপত্তি না করে তাদের সঙ্গে সঙ্গে যেতে লাগল।
তিন দিনের দিন ওরা একটা ছোট পাহাড়ের পাদদেশে একটা বড় গুহার কাছে এসে থামল। এই গুহাটাতেই আশ্রয় নিলে ওরা।
দেয়ালে ওরা যে নাম লিখল তার থেকে ওদের সাহায্যে টারজান বুঝল লোমহীন সাদা গোরিলাটির নাম হলো তাদেন আর লোমশ কালো গোরিলাটির নাম ওমৎ। তারা দুজনেই টারজানকে তাদের ভাষা শেখাতে লাগল এবং অল্পদিনের মধ্যেই টারজান ওদের ভাষায় কথা বলতে শিখল।
টারজান তখন তার স্ত্রী জেনের চেহারার বর্ণনা দিয়ে তাকে তারা কোথাও দেখেছে কি না তা জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু তারা বলল, একমাত্র টারজান ছাড়া অন্য কোন মানুষ জীবনে তারা দেখেনি কখনো।
তাদের বলল, আমার বাড়ি হচ্ছে আলুর।
টারজান বলল, আলুর কোথায়?
তাদেন বলল, আমাদের দেশ আলুর হচ্ছে ঐ পাহাড়গুলোর ওপারে। কোন যতদিন বেঁচে থাকবে। আমি সেখানে ফিরে যাব না।
টারজান জিজ্ঞাসা করল, কোতান কে?
তাদেন বলল, সে হচ্ছে সেখানকার রাজা। আমি তার সৈন্য বিভাগে কাজ করতাম। তার মেয়ে ওলোয়াকে আমি ভালবাসতাম। কিন্তু কোতান আমাকে দেখতে পারত না। তাই কৌশলে মারার জন্য ভাকাত নামে এক বিদ্রোহী গ্রাম্য সর্দারকে দমন করার জন্য আমাকে পাঠায় কোতান। কিন্তু তার সে চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। কারণ আমি ডালককে পরাজিত ও বন্দী করি এবং সেখানকার বিদ্রোহ দমন করে গৌরবের সঙ্গে ফিরে আসি। কিন্তু কোতান আমাকে দেখে আরো রেগে উঠল আগের থেকে। আমার বাবা জাদন হচ্ছেন সিংহমানুষ। আলুরের বাইরে একটা বড় গাঁয়ের সর্দার তিনি। আমাদের দেশে মন্দিরের পুরোহিতদের আমরা খুবই শ্রদ্ধা করি। রাজা যদি একবার কাউকে পুরোহিত পদে নিযুক্ত করে তাহলে সে পদ প্রত্যাখ্যান করা মানেই দেশদ্রোহিতা বা ধর্মদ্রোহিতা করা। কিন্তু পুরোহিতরা বিয়ে করতে পারে না জীবনে। কুটিল কোতান তাই আমাকে পুরোহিত পদে নিযুক্ত করে আমার বিয়ে হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিতে চাইল চিরদিনের মত।
একদিন ওলোয়া এসে আমাকে খবর দিল, তার বাবার দূত আমাকে মন্দিরে নিয়ে যাবার জন্য আসছে। তখন আমি পাচিল ডিঙ্গিয়ে নগর পার হয়ে পালিয়ে এলাম।
টারজান বলল, সেখানে যাওয়ার দারুণ ঝুঁকি আছে বিপদের।
তাদেন বলল, ঝুঁকি আছে বটে, কিন্তু এমন কিছু নয়। আমি যাবই।
টারজান বলল, আমিও যাব তোমার সঙ্গে। কারণ আমি তোমাদের শহরটা দেখব এবং আমার স্ত্রীরও খোঁজ করব একবার। ওমৎ, তুমিও আমাদের সঙ্গে যাবে?
ওমৎ বলল, কেন যাব না? আমাদের জাতির লোকেরা আলুরের উপর দিকের পাহাড়গুলোতে বাস করে। আমাদের সর্দারের নাম হলো ঈসাৎ। ঈসাৎ আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেখানে পানাৎ লী নামে একটা মেয়ে আছে যাকে দেখে আমি খুশি হব এবং সেও আমাকে দেখে খুশি হবে।
ওমৎ বলল, তাহলে এগিয়ে চল।
এবার তিনজনে বিপদসংকুল পাহাড়ী পথ দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।
এরপর ওমৎ তাদের এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেল যার এক রহস্যময় সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেল টারজান। চারদিকে সাদা ধবধবে পাহাড় দিয়ে ঘেরা সবুজ ঘাসে ঢাকা এক বিরাট উপত্যকা দেখতে পেল ওরা। মাঝখানে স্বচ্ছনীল জলে ভরা একটা নদী বয়ে যাচ্ছিল। তারই মাঝখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আলুর নগরী।
ওমৎ বলল, আমার উপত্যকাটা দিয়ে এগিয়ে যাব। বাঁদিকের পাহাড়গুলোর গুহায় আমাদের জাতির লোকরা থাকে। আমি পানাৎ লীকে আবার দেখব। তাদেনও তার বাবার সঙ্গে দেখা করবে। টারজান। আলুরে গিয়ে তার স্ত্রীর খোঁজ করবে।
তাদেন বলল, আমরা এখন যতক্ষণ পারব এক সঙ্গেই তিনজন থাকব। ওমৎ রাত্রিবেলায় পানাৎ লীর সঙ্গে দেখা করবে চুপি চুপি। কারণ আমরা তিনজনে একসঙ্গে গেলেও ঈসাতের যোদ্ধাদের আমরা পরাস্ত করতে পারব না।
টারজান একাই কি মনে করে আলুর নগরীর দিকে হাঁটতে শুরু করে দিল। নগরীর বাইরে পৌঁছতেই একজন হোন যোদ্ধার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
টারজানই প্রথমে কথা বলল তার সঙ্গে। বলল, তোমাদের রাজা কোতানের সঙ্গে আমার একবার দেখা করিয়ে দেবে।
হোদন যোদ্ধা বলল, আমাদের এই নগরদ্বারে একমাত্র শত্রু বা ক্রীতদাস ছাড়া বাইরের আর কেউ আসে না।
টারজান উত্তর করল, আমি শত্রু বা ক্রীতদাস কিছুই নই। আমি দেবতা জাদ-বেন-ওথোর কাছ থেকে আসছি।
