সে আমার শিবিরে নিরাপদেই আছে।
আর বারবারা? সে কোথায়?
সে স্মিথের সঙ্গেই আছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের সঙ্গে দেখা হবে।
ডাকাতদলের বন্দীদের সঙ্গে কথা বলতে টারজান সেই দিকে চলে গেল।
বন্দীদের নানা দলে ভাগ করে তাদের একজন করে দলপতি স্থির করে টারজান সকলকে যার যার গায়ে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করল। গালাদের নেতৃত্বে বন্দী ডাকাতদের পাঠানো হল আবিসিনিয়ার পথে।
আধ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রামটা খালি হয়ে গেল। গ্রামের নানান অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে দেয়া হল। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডুলি পাকিয়ে উঠতে লাগল নীল আকাশের দিকে। নানা দলে ভাগ হয়ে বন্দীরা সকলেই যাত্রার জন্য প্রস্তুত। যাবার আগে সব দলপতি অরণ্যরাজের সম্মুখে নতজানু হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানাল।
লাফায়েত স্মিথ ও লেডি বারবারার বিস্মিত চোখের সামনে লর্ড পাসূমোরের শান্ত শিবিরটি কর্ম কোলাহলে মুখর হয়ে উঠল। সারাটা দিন সৈনিকরা তৈরি হয়ে নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করে রইল। সে অপেক্ষা চলল রাত পর্যন্ত। সর্বত্র চাপা উত্তেজনা। শিবিরে আগেকার মত গান নেই, হাসি নেই। যোদ্ধারা বসে আছে আগুনের ধুনিকে ঘিরে। হাতে-হাতে রাইফেল মজুদ।
ডাক এল অনেক রাতে। কালো কালো মানুষগুলোর ছায়া মিলিয়ে গেল জঙ্গলের অন্ধকারে। মাত্র চারজন রইল পাহারায়, আর রইল দুই সাদা অতিথি।
সকালে তাঁবু থেকে বেরিয়ে লেডি বারবারা দেখল, শিবির প্রায় পরিত্যক্ত। আছে শুধু রাঁধুনি ছোকরা আর তিনটি কালা আদমি।
দিন গড়িয়ে বিকেল হল। অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটল না। লর্ড পাস্মোর বা তার যোদ্ধারা কেউ ফিরল না।
হঠাৎ ছোকরাটি উঠে দাঁড়িয়ে কান পাতল। বলে উঠল, ওরা আসছে।
ক্রমে সৈন্যদের পায়ের শব্দ স্পষ্টতর হল। সেদিকে তাকিয়ে লাফায়েত স্মিথ উচ্ছ্বসিত গলায় বলে, উঠল, ঐ তো বন্দুকবাজ! সঙ্গে জেজেবেল। কী আশ্চর্য! ওরা দুজন এক সঙ্গে।
লেডি বারবারা চীৎকার করে বলল, সঙ্গে আবার অরণ্যরাজ টারজান! সেই ওদের দুজনকে উদ্ধার করেছে।
অবশেষে চারজনকে মিলিত হতে দেখা টারজনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলে গেল।
লেডি বারবারা বলল, বড়ই দুঃখের কথা যে এই সুখের ক্ষণে লর্ড পাসূমোর এখানে নেই।
আছে, বলল, টারজান।
চারদিকে তাকিয়ে লেডি বারবারা প্রশ্ন করল, কোথায়?
আমিই লর্ড পাসূমোর; টারজান জবাব দিল।
তুমি?
হ্যাঁ। কাপিয়েত্রো ও তার দলবলের কথা শুনেই আমি এই ভূমিকাটি নিয়েছিলাম। আমি জানতাম কাপিয়েত্রোর দল আমার শিবিরও আক্রমণ করতে আসবে।
বন্দুকবাজ বলে উঠল, গীজ! ব্যাটারা নিশ্চয় জোর ঠেঙানি খেয়েছে।
লেডি বারবারা হেসে বলল, তাই আমাদের আশ্রয়দাতা লর্ড পাসূমোরকে কখনও চোখে দেখতে পাইনি।
টারজান বলল, আমি কিন্তু তোমাদের কাছাকাছিই ছিলাম। তোমার বন্ধুদের খুঁজতে গিয়ে নিজেই বন্দী হয়েছিলাম। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সব বিপদ কেটে গেছে।
ড্যানি বলে উঠল, আমরা কালিফোর্নিয়ায় ফিরে যাচ্ছি। সেখানে একটা গ্যারেজ ও ফিলিং-স্টেশন কিনব।
আমরা? লেডি বারবারা প্রশ্ন করল।
নিশ্চয়; আমি আর জেজ, ড্যানি বলল।
সত্যি? লেডি বারবারা উচ্ছ্বসিত। ও কি সত্যি বলছে জেজেবেল?
সবই ও. কে., স্বর্ণকেশিনী উত্তর দিল।
ভয়ঙ্কর টারজান (টারজান দি টেরিবল)
আজ প্রায় ছ’মাস হলো আফ্রিকার জঙ্গলের ভয়ঙ্কর গভীরে টারজান তার হারানো স্ত্রীর খোঁজ করে চলেছে দিনরাত। সে এক মৃত জার্মান ক্যাপ্টেনের ডায়েরী থেকে জানতে পেরেছে তার স্ত্রী এখনো জীবিত আছে।
একদিন গভীর রাতে বনভূমিতে অস্বাভাবিক একটা শব্দে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল টারজনের। সে উঠেই দেখল যে গাছে সে ছিল তার তলাতেই ঘাসে ঢাকা প্রান্তরটার উপর দিয়ে নগ্নপ্রায় এক শ্বেতাঙ্গ ছুটে আসছে। লোকটার পিছনে একটা সিংহ তাকে তাড়া করে আসছিল। সিংহটা আর এক মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়বে লোকটার উপর। টারজান তাই এক লাফে সিংহ আর শ্বেতাঙ্গ লোকটার মাঝখানে নেমে পড়ল।
টারজানকে সামনে পেয়েই সিংহটা তার একপাশে থাবা বসিয়ে একটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করল। কিন্তু টারজান সেদিকে নজর না দিয়ে সিংহটার পিঠের উপর চেপে তার ছুরিটা সিংহটার বুকের দিকে বসিয়ে দিতে লাগল। শ্বেতাঙ্গ লোকটাও তার হাতে যে একটা ধারাল খাড়া ছিল তাই দিয়ে সিংহটার মাথার উপর জোরে একটা কোপ বসিয়ে দিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সিংহটা মারা গেল।
সিংহটার মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে টারজান তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে এক বিকট চীৎকার করল চাঁদের দিকে তাকিয়ে। লোকটা ভয় পেয়ে কিছুটা সরে গেল। কিন্তু টারজান তার ছুরিটা খাপের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে তার দিকে ফিরে দাঁড়াতে লোকটা আর ভয় পেল না।
টারজান এবার লোকটার সঙ্গে বাঁদর-গোরিলাদের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু সে টারজনের কোন কথাই বুঝতে পারল না। তখন টারজান লোকটার বাঁ হাতটা টেনে তার বুকের উপর। রেখে লোকটার বুকের উপর নিজের ডান হাতটা রাখল। লোকটা এবার বুঝতে পারল এই অচেনা লোকটি তার জীবন বাঁচানোর পর তার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চাইছে।
এরপর টারজান তার পেটে হাত দিয়ে লোকটিকে খাবার জন্য ইশারা করল।
টারজান তার সঙ্গীর আনা যখন সেই বাদাম, ফলমাকড় আর শুকনো মাংসগুলো খাচ্ছিল দু’জনে তখন ওরা খেয়াল করেনি গাছের উপর থেকে একটা কালো রঙের বিরাটকায় লোমশ প্রাণী ওদের দিকে তাকিয়ে আছে কুটিল দৃষ্টিতে। সেই অদ্ভুত বিরাটকায় প্রাণীটার উপর টারজনের চোখ পড়তেই সে দেখল এই প্রাণীটার সঙ্গে তার সঙ্গীর চেহারার অনেক মিল রয়েছে। দুজনকেই মানুষের মত অনেকটা দেখতে। দু’জনেরই লেজ আছে। দু’জনেরই অস্ত্রশস্ত্র এক এবং হাঁটার ভঙ্গিমাও এক। দুজনেই এক ভাষায় কথা বলে। তবে আগন্তুক সঙ্গী প্রাণীটির গোটা গাটা বড় বড় লোমে ঢাকা আর অচেনা আগন্তুক প্রাণীটির রংটা কালো; কিন্তু তার সঙ্গীর রংটা সাদা।
