নতুন করে বনের দিকে এগোতে গিয়েও হঠাৎ সে থেমে গেল। বন-বাদাড় ভেঙে কে যেন ছুটে আসছে। দেখা দিল সেই ছুটন্ত মূর্তি।
তার সামনে লাফিয়ে পড়ে ড্যানি চেঁচিয়ে ডাকল, জেজেবেল! তার গলা আবেগে কাঁপছে।
আর্তনাদ করে মেয়েটি থেমে গেল। ড্যানি! উত্তেজনায় তার স্নায়ুর সব শক্তি উবে গেল। মাটিতে বসে পড়ে পাগলের মত কেঁদে উঠল।
বন্দুকবাজ ও কয়েক পা এগিয়ে টলতে টলতে বসে পড়ল। তার পরই ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। তার চোখ ফেটে জল এল। উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে সেও ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
তারা যখন গল্পে মত্ত, অরণ্যরাজ টারজান তখন বন ছেড়ে তাদের খোঁজে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছে।
ওদিকে দিন হতেই একশ’ ডাকাত ঘোড়ায় চেপে গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়ল। কাপিয়েত্রোর মৃতদেহ দেখে বুঝতে পারল যে রুশীয়টি তাদের ধোঁকা দিয়ে সর্দারকে মেরে পালিয়ে গেছে।
দূর থেকে টারজানকে দেখতে পেয়ে হুংকার ছেড়ে ডাকাত-সর্দার জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। বাকি দলটিও হৈ-হৈ রবে তার পিছু নিল।
টারজান বুঝতে পারল, পাহাড়ে উঠবার আগেই ওরা তাকে ধরে ফেলবে। তবু সে সমান বেগে ঘোড়া ছোটাতে লাগল।
অসভ্য চীৎকার করতে করতে ডাকাতদল ধেয়ে আসছে। সকলের আগে সর্দার।
ডাকাতদের অর্ধবৃত্ত পূর্ণ হয়ে এল। টারজান তীরের পর তীর ছুঁড়ছে। তূণ শূন্য হয়ে গেল। আর তীর নেই। ডাকাতরা তাকে ঘিরে ধরল।
পিছন থেকে একজন চীৎকার করে উঠল, মেরো না! ও যে অরণ্যরাজ টারজান। ওর জন্য অনেক টাকা মুক্তিপণ মিলবে।
অনেক প্রাণের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত ডাকাতরা টারজানকে বন্দী করল। হাত-পা বেঁধে তাকে একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে দিল। চার ডাকাত তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল গ্রামে। বাকিরা স্তাবুচ ও জেজেবেলের খোঁজে এগিয়ে গেল।
জেজেবেল ও বন্দুকবাজ হাতে হাত ধরে এগিয়ে চলেছে।
ড্যানি বলল, আশ্চর্য এই দুনিয়া। ভাব তো জাহাজে যদি স্মিথের সঙ্গে আমার দেখা না হত তাহলে তোমার সঙ্গে এখানে আমার দেখা হত না। সেই থেকেই তো শুরু। একটু থেমে আবার বলতে লাগল, এখান থেকে আমরা এমন কোথাও চলে যাব যেখানে কেউ আমাদের চেনে না। নতুন করে জীবন শুরু করব। একটা গ্যারেজ নেব, অথবা একটা ফিলিং-স্টেশন; আর একটা ফ্ল্যাট। গীজ, সেখানে তোমাকে এমন সব জিনিস দেখাব যা কোন দিন চোখে দেখনি–মুভি, রেল, জাহাজ! গীজ! তুমি তো কিছুই দেখনি। আর আমি ছাড়া দেখাবেই বা কে?
জেজেবেল বলল, সত্যি ড্যানি, কী যে ভাল লাগছে!
ভেসে এল রাইফেলের গর্জন। চমকে জেজেবেল বলল, ওটা কি?
কোথাও লড়াই হচ্ছে। চল, লুকিয়ে পড়ি, বলে জেজেবেলের হাত ধরে ড্যানি একটা ঝোপের ভিতরে ঢুকে গেল। আরও কাছে এগিয়ে এল ডাকাতদলের অশ্বক্ষুরের শব্দ। তাদের পাশ দিয়েই ডাকাতরা একে একে ছুটে গেল। হঠাৎ এক ডাকাতের চোখ পড়ল তাদের উপর। তার চীকারে অন্য ডাকাতরা ঘুরে এসে দু’জনকে ঘিরে ফেলল।
বেচারি বন্দুকবাজ! বেচারি জেজেবেল! বড় ক্ষণস্থায়ী তাদের সুখের জীবন। আবার তারা বন্দী হল। দুই কালা শয়তানের পাহারায় দু’জন এগিয়ে চলল গ্রামের দিকে।
অন্ধকার কুটিরে টারজান প্রাণপণে বন্ধর-মুক্তির চেষ্টা করে চলেছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে তার কপালে।
অবশেষে চেষ্টা সফল হল। বেড়ির ভিতর দিয়ে একটা হাত গলে বেরিয়ে এল। তারপর বাকি বেড়ি খুলতে দেরি হল না। টারজান মুক্ত হল।
নিচু গলায় গর্জন করে সে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে এগিয়ে গেল। উঠোনে ডাকাতরা বসে আছে।
টারজান এক লাফে পাঁচিলে উঠে গেল। কয়েকটা গুলি ছুটে এল তাকে লক্ষ্য করে; ততক্ষণে সে লাফিয়ে ওপারে পড়েই রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
জেজেবেল দাঁত দিয়ে ড্যানির হাতের বাঁধন কেটে দিল। দু’জনেই উঠে দাঁড়াল।
বাঁচা গেল, বলেল উঠল বন্দুকবাজ।
এবার মুক্তি, বল জেজেবেল।
কি মনে পড়ায় বন্দুকবাজ বলল, প্রথমেই দেখতে হবে আজ আমি কিসের উপর শুয়েছিলাম। কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছিল।
কুটিরের এককোণে রাখা ছেঁড়া কম্বলগুলো হাতড়ে একটু পরেই সে উঠে দাঁড়াল। এক হাতে টমসন। মেশিনগান ও রিভলবার, অন্য হাতে একটা খাপ ও বেল্ট।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভেসে এল বহু কণ্ঠের হুংকার ও ফটকে পাহারারত শাস্ত্রীর রাইফেল থেকে গুলির শব্দ। অস্পষ্ট দিনের আলোয় সে দেখতে পেয়েছে একটা শত্ৰু-বাহিনী নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে গ্রামের দিকে।
দরজার কাছে ছুটে এসে বাইরে তাকিয়ে ড্যানি প্যাট্রিক অবস্থা কিছুটা বুঝতে পারল। দু’পক্ষ থেকেই গুলি-বিনিময় চলছে। কিন্তু সে বুঝতে পারল না–ডাকাতদলের এই শত্রু কারা।
ফটকে অনেক ডাকাত জমায়েত হয়েছে। দূরের শত্রুপক্ষকে লক্ষ্য করে তারা রাইফেল চালাচ্ছে। বন্দুকবাজ হাঁটু গেড়ে বসে মেশিনগান কাঁধে তুলে নিল। ডজনখানেক ডাকাত মাটিতে উপুর হয়ে পড়ল।
সামনে-পিছনে দু’দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে বাদবাকি ডাকাতরা রাইফেল ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল।
বন্দুকবাজ ও জেজেবেলকে অক্ষতদেহে দেখতে পেয়ে টারজান তাদের সাদর সম্ভাষণ জানাল। ড্যানি বলল, ভাগ্যিস ঠিক সময়ে তুমি এসে পড়লে। কিন্তু তোমার এই বন্ধুরা কারা? এদের কোথায় পেলে?
ওরা সবাই আমার লোক।
বন্দুকবাজ সোৎসাহে বলে উঠল, বহুৎ আচ্ছা! কিন্তু বুড়ো স্মিথকে দেখেছ কি?
