রাত নেমেছে। লেডি বারবারা কলিস ও লাফায়েৎ স্মিথকে নিয়ে অরণ্যরাজ টারজান চলেছে মিডিয়ান দেশের উপত্যকা পেরিয়ে। কিন্তু জেজেবেল ও বন্দুক বাজ’-এর কোন চিহ্নই খুঁজে পাচ্ছে না।
সঙ্গী দুটি ক্লান্তির শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে। কিন্তু কেউই টারজানকে সে কথা বলেনি, কারণ তারা। জানে, তাতে জেজেবেল ও ড্যানির অনুসন্ধানে বাধা পড়বে।
হোঁচট খেতে খেতে লেডি বারবারা একবার মাটিতে পড়ে গিয়ে অস্ফুট চীৎকার করে উঠল। তা শুনে পিছন ফিরে তাকে ঐ অবস্থায় দেখে টারজান ঘরে এসে তাকে কোলে তুলে নিল।
বলল, আর বেশি দূর নয়।
শিবিরের প্রান্তে গিয়ে টারজান দাঁড়িয়ে পড়ল।
কয়েকজন আস্কারি ছিল পাহারায়। তাদের সঙ্গে কিছু কথা বলে টারজান লেডি বারবারাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল, ওদের বলে দিলাম, তাদের বাওয়ানাকে যেন বিরক্ত না করে। এখানে একটা বাড়তি তাঁবু আছে; লেডি বারবারা সেটাতে থাকতে পারবে। সর্দার নিজেই স্মিথের থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। এখানে তোমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। ওরা বলছে ওদের বাওয়ানা লর্ড পাসমোর। সেই তোমাদের রেল-স্টেশনে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবে। আপাতত আমি চললাম তোমাদের বন্ধুদের খোঁজে।
কথা শেষ হল। তারা মৌখিক ধন্যবাদ জানাবার আগেই টারজান রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ওদিকে স্তবুচ ও জেজেবেল সারা রাত ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে। স্তাবুচ পথ হারিয়ে নাস্তানাবুদ।
ভোরের দিকে একটা বনের প্রান্তে তারা থামল। স্তাবুচের আর চলবার শক্তি নেই। ঘোড়া থেকে। নেমে বলল, একটু না ঘুমিয়ে পারছি না।
জেজেবেলও ঘোড়া থেকে নামল। ঘোড়া দুটোকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে মাটিতে টান-টান হয়ে শুয়ে পড়ল স্তাবুচ। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।
দূরে পাহাড়ের মাথায় পুবের আকাশে আলো ফুটছে। স্তাবুচ ঘুম থেকে উঠে বলল, বড় ক্ষিধে পেয়েছে। তুমি ঐ গাছটাতে উঠে বস। আমি বনের মধ্যে ঢুকে দেখি শিকার পাই কি না।
জেজেবেল গাছে চলে বসল; স্তাবুচ শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে গেল।
একটা ছোট হ্রদ দেখতে পেয়ে স্তাবুচ একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। কোন জন্তু জল খেতে এলেই তাকে গুলি করবে।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। হঠাৎ একটা প্রাণী এসে আবির্ভূত হল হ্রদের অপর তীরে।
স্তাবুচের শয়তানী চোখ দুটি সংকুচিত হল। এই তো সেই লোক যাকে খুন করতে সে মস্কো থেকে এত দূরে এসেছে। সুবর্ণ সুযোগ! ভাগ্য সুপ্রসন্ন।
হাতের রাইফেল তুলে খুব সাবধানে তাক করল। ঝোপের আড়াল পড়ায় টারজান বন্দুকের নলটা দেখতে পেল না।
স্তাবুচ বুঝতে পারল, উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে। শিকারও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনি গুলি করতে হবে। লোকটা তো চিরকাল একভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে না। সে ঘোড়ায় আঙুল রাখল।
রাইফেল গর্জে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শিকার এক লাফে একটা নিচু ডাল ধরে মুহূর্তের মধ্যে পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। স্তাবুচ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
এবার সে ভয় পেল। ছুটে পালিয়ে গেল। মন থেকে মুছে গেল সুন্দরী জেজেবেল। এখন চাচা আপন প্রাণ বাঁচা!
বনের ভিতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ বাহুতে একটা যন্ত্রণা বোধ করায় তাকিয়ে দেখল একটা তীরের পালক-লাগানো দিকটা বাহুর সঙ্গে ঝুলছে।
তীরটা বাহুতে বিঁধে এফোঁড়-ওফোড় হয়ে গেছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে আরও জোরে ছুটতে লাগল। মাথার উপরেই রয়েছে তার যম!
আর একটা তীর এসে বিধল তার অপর বাহুর মাংস-পেশীতে। আতংকে ও যন্ত্রণায় স্তাবু নতজানু হয়ে বসে পড়ল। দুই হাত তুলে বলল, বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও। আমি তোমার কোন ক্ষতি করিনি।
আর একটা তীর সোজা এসে তার গলায় বিধে গেল। আর্তনাদ করে সেটাকে চেপে ধরে স্তাবুচ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
অরণ্যরাজ টারজান নীরবে গাছ থেকে নেমে মুমূর্ষ লোকটির দিকে এগিয়ে গেল। যন্ত্রণায় কাত্রাতে কাত্রাতে স্তাবুচ পাশ ফিরেই ধনুর্ধর টারজানকে দেখতে পেল। যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সে এতদূর এসেছে সেটা সম্পূর্ণ করার জন্য সে কোমরের রিভলবারটার দিকে হাত বাড়াল।
সঙ্গে সঙ্গে অরণ্যরাজের হাত থেকে ছুটে এল আর একটা তীর। বিদ্ধ হল স্তাবুচের বুকে। হৃৎপিণ্ড বিদীর্ণ হল। একটা আর্তনাদও ফুটল না মুখে। লিও স্তাবুচের মাথাটা ঢলে পড়ল। মুহূর্তকাল পরে একটা গোরিলা মানুষের বিজয় হুংকার জলের মধ্যে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
সেই হুংকার শুনে জেজেবেলের বুকটা কেঁপে উঠল। সভয়ে গাছ থেকে নেমে সে ছুটতে শুরু করল। কোথায় চলেছে তা জানে নাতার একমাত্র লক্ষ্য এই নির্জনতার আতংক থেকে দূরে চলে যেতে হবে।
দিনের আলোয় বন্দুকবাজ দেখল কাছেই একটা বন। সারারাত ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ কানে আসেনি। এখন দিনের আলোেয় চারদিকে ভাল করে তাকাল। স্তাবুচ ও জেজেবেলের চিহ্ন নেই।
সব ক্লান্তি ভুলে আবার সে উত্তর দিকে ছুটতে লাগল। হয় তো এখনও জেজেবেলকে বাঁচাতে পারবে।
একটু পরেই সিংহটা থমকে দাঁড়িয়ে উত্তর-পূর্ব দিকের ঢাল বেয়ে নেমে গেল। ড্যানি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। নিজের জন্য নয়- জেজেবেলের নিরাপত্তার আশায়।
দূর থেকে একটা গুলির আওয়াজ কানে এল। স্তাবুচের রাইফেলের শব্দ। বন্দুকবাজ আরও জোরে পা চালিয়ে দিল। কয়েক মিনিট পরেই কানে এল রুশীয়টির আর্তনাদ, আর পরক্ষণেই ভেসে এল টারজনের বিজয়-হুংকার।
