স্মিথ! কোন্ স্মিথ? ড্যানির সাগ্রহ প্রশ্ন।
ও, সে খুব সুন্দর, জেজেবেল খোলাখুলি বলল।
ড্যানি বলল, এখানে তো একমাত্র সুন্দর তুমি জেজেবেল!
নিজেদের কথা নিয়ে তারা এতই মশগুল হয়ে পড়েছিল যে অন্য কোন দিকেই তাদের নজর ছিল না। হঠাৎ জেজেবেল চেঁচিয়ে বলে উঠল, ওই দেখ, কারা যেন আসছে। অনেকগুলো কালো মানুষ। ওঃ ড্যানি, আমার ভয় করছে।
একনজর দেখেই বন্দুকবাজ তাদের চিনতে পারল। বলল, ওরা ডাকাত জেজেবেল, পালাও।
দু’জনে ছুটতে শুরু করল, কিন্তু ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ডাকাতরা সহজেই তাদের ধরে ফেলল। ড্যানি দ্রুতগতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা ডাকাতের পা ধরে টেনে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। তার হাতের ছিটকে পড়া রাইফেলটা তুলে নিয়ে তারই মাথায় সজোরে আঘাত করল। ডাকাতের মাথাটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
এইভাবে তিনটে ডাকাতকে ঘায়েল করার পরে ড্যানি নিজেই ঘায়েল হল। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গিয়েও একটা ডাকাত ড্যানির পা ধরে টেনে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে অন্য ডাকাতরা আঘাত করল তার মাথায়।
জেজেবেল সভয়ে দেখল, ড্যানির মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। সে ছুটে গেল তার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তারা তাকে ধরে ফেলল। একটা ঘোড়ার পিঠে তাকে তুলে নিয়ে ডাকাতরা জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।
বন্দুকবাজ ড্যানি প্যাট্রিকের নিশ্চল দেহটা তার নিজের রক্তের মধ্যেই পড়ে রইল।
ক্রীতদাস-শিকারীরা নতুন সুন্দরী বন্দিনীকে নিয়ে গ্রামে ঢুকতেই সকলে হৈ-চৈ করে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে লাগল। কাপিয়েত্রো ও স্তাবুচও তাদের কুটিরের দরজায় এসে দাঁড়াল।
কালো শয়তানরা কি এনেছে? কাপিয়েত্রো শুধাল।
মনে হচ্ছে একটি সুন্দরী, স্তাবুচ জবাব দিল।
কাঁপিয়ে বলল, আরে, তাই তো! একে কোথায় পেলে?
খুব কাছেই। সঙ্গে একটা পুরুষও ছিল। নর-বানরের সঙ্গে যে পালিয়েছিল সেই।
সে কোথায়? তাকেও ধরে আনলে না কেন?
সে আমাদের সঙ্গে লড়ল; তাই তাকে মেরে ফেলতে বাধ্য হয়েছি।
কাপিয়েত্রো জেজেবেলের হাত ধরে কুটিরের ভিতরে নিয়ে গেল। স্তাবুচও পিছন-পিছন গেল।
জেজেবেল বলল, আমাকে এখানে এনেছ কেন? আমি তো তোমাদের কোন ক্ষতি করিনি। আমাকে ড্যানির কাছে ফিরে যেতে দাও। সে গুরুতর আহত।
আহত নয়, মৃত, কাঁপিয়ে বলল। তার জন্য দুঃখ করো না। এক বন্ধু গেছে, দুই বন্ধু পেয়েছ।
ক্ষুধার্ত চোখে স্তাবুচ মেয়েটিকে দেখছিল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ওকে পেতেই হবে। বলল, কেঁদো না। আমি তোমার বন্ধু। সব ঠিক হয়ে যাবে।
সকৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে চোখ তুলে জেজেবেল বলল, তুমি যদি আমার বন্ধু, তাহলে আমাকে ড্যানির কাছে। নিয়ে চল।
একটু পরেই সব হবে। বলে স্তাবুচ কাপিয়েত্রোকে শুধাল, কত চাও?
কাপিয়েত্রো বলল, প্রিয় বন্ধুটির কাছে ওকে বিক্রি করব না। এস, একটু পান করা যাক, তারপর সব বুঝিয়ে বলব।
বোতল থেকে দু’জনই বেশ খানিকটা করে মদ গিলল।
মদের নেশায় ক্রমে দু’জনের মধ্যে তর্কাতর্কি শুর হল। তা থেকে ধস্তাধস্তি। চীৎকার করে উঠে কাঁপিয়ে এক ঘুষি কল স্তাবুচের চোয়ালে। স্তাবুচও পাল্টা ঘুষি চালাল। দুজন দুজনের গলা টিপে ধরল। স্তাবুচ তার কোটের নিচে থেকে একটা সরু ছুরি বের করল। কাপিয়েত্রো তা দেখতে পেল না। স্তাবুচের ডান হাতের ছুরিটা সজোরে বসে গেল কাপিয়েত্রোর পিঠে। কাপিয়েত্রো আর্তনাদ করে উঠল। তারপরই কাঠ হয়ে পড়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। এবার কি ঘটবে ভেবেই স্তাবুচ শিউরে উঠল।
তাড়াতাড়ি জেজেবেলকে ধরে একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে স্তাবুচ নিজে উঠল আর একটা ঘোড়ায়। তারপর প্রায় পঞ্চাশজন ডাকাতের চোখের সামনে দিয়ে তারা গ্রামের ফটকটা পার হয়ে গেল।
তারা যখন ঘোড়ার মুখ পাহাড়ের উপরের দিকে সরিয়ে দিল ততক্ষণে রাতের আঁধার নেমে এসে তাদের ঢেকে দিল।
বন্দুকবাজ ড্যানি প্যাট্রিক চোখ মেলে আফ্রিকার সুনীল আকাশের দিকে তাকাল। ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এল। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। হাতটা তুলে মাথায় রাখল। একি! হাতটা রক্তে লাল হয়ে গেছে।
আপন মনেই বলে উঠল, গীজ! ওরা আমাকে খুব ঠেঙিয়েছে!
হঠাৎ তার মনে পড়ল শিবিরে ফিরতে হবে। সে না ফিরলে স্মিথ খুব চিন্তা করবে। ওবান্বিই বা কোথায়? চারদিকে তাকাল। জীবিত অথবা মৃত-তাকে কোথাও দেখতে পেল না। অগত্যা সে একাই শিবিরের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
চলতে চলতে পাহাড়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল। সেখান থেকে নিচের গ্রামটা দেখা যায়। সেখানে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েই সে ডাকাতদের গ্রামের উপর চোখ রাখল।
দেখল, স্তাবুচ কুটির থেকে বেরিয়ে ঘোড়াগুলোর কাছে গেল। ফিরে এল দুটো ঘোড়া নিয়ে। কুটিরের ভিতরে ঢুকে বেরিয়ে এল জেজেবেলকে সঙ্গে নিয়ে।
হঠাৎ ‘বন্দুকবাজ’ ড্যানি প্যাট্রিকের মাথার মধ্যে একটা অদ্ভুত খেলা শুরু হয়ে গেল। সব কথা মনে পড়ে গেল। জেজেবেলকে দেখামাত্রই তার স্মৃতি ফিরে এল।
উঠে দাঁড়িয়ে সেও পাহাড়ের ধার ধরে ছুটতে লাগল দুই অশ্বারোহীর সমান্তরালে থেকে। গোধূলি নেমে এসেছে। একটু পরেই অন্ধকার হবে। সব ক্লান্তি ভুলে সে ছুটতে লাগল। তবু এক সময় ঘন অন্ধকারে তারা দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল।
ওদের ধরতে হবে- ধরতে হবেই। হোঁচট খেতে খেতে সে ছুটে চলল। বার বার চলতে লাগল, বেচারি খুকি! বেচারি খুকি! ঈশ্বর! আমার সহায় হও।
