ক্রমে রাত বাড়ল। চারদিক নিস্তব্ধ। পাহাড়ের উপর থেকে সব কিছু দেখে-শুনে-বুঝে টারজান নিঃশব্দে নেমে এল গ্রামের পাঁচিলের পাশে। এক লাফে উঠে গেল পাঁচিলের মাথায়। আর এক লাফে পাঁচিল থেকে নামল। এগিয়ে গেল সেই কুটিরটার দিকে যেখানে ঘুমিয়ে আছে সাদা যুবকটি। দরজার পাশে বসে আছে পাহারাদার। রাইফেলটা হাঁটুর নিচে। ধীরে ধীরে সে পা ছড়িয়ে বেড়ার গায়ে হেলান দিল। প্রহরী ঘুমিয়ে পড়েছে।
নিঃশব্দে টারজান এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। দুই হাত বাড়াল। মটু করে একটা শব্দ হল। ইস্পাত-কঠিন মুঠোর এক মোচড়ে গলার হাড়টা ভেঙে গেল।
অন্ধকারেই মৃতদেহটাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে টারজান ঘরের ভিতরে ঢুকল। খুব সাবধানে ঘুমন্ত বন্দুকবাজ-কে ঠেলে দিল। কিন্তু তার ঘুম ভাঙল না। আরও জোরে ঠেলা দিয়েও যখন কোন কাজ হল না তখন এক চড় কসিয়ে দিল তার গালে।
বন্দুকবাজ নড়েচড়ে বলে উঠল, গীজ! তোমরা কি একটু ঘুমতেও দেবে না। বলেছি ত মুক্তিপণ পাবে।
মুচকি হেসে টারজান ফিসফিস্ করে বলল, উঠে পড় হে। হৈ-চৈ করো না। আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
তুমি আবার কে?
অরণ্যরাজ টারজান।
গীজ! বন্দুকবাজ উঠে বসল।
টারজান বলল, আমাকে অনুসরণ কর। যাই ঘটুক না কেন আমার খুব কাছে কাছেই থেকো। আমি তোমাকে ছুঁড়ে দেব পাচিলের মাথায়। কোন রকম শব্দ করো না, আর খুব সাবধানে ও-পাশে নেমো, ওদিকের মাটি অনেকটা নিচু।
পাঁচিলের কাছে পৌঁছে বন্দুকবাজ উপরে তাকাল। তার সন্দেহ ঘনীভূত হল। তার একশ’ আশি পাউন্ড ওজনের দেহটাকে ছুঁড়ে দেবে পুঁচিলের উপরে- পাগল না কি!
বন্দুকবাজে’র কলার ও ব্রীচেস চেপে ধরে তাকে কয়েকবার ঝুলিয়ে টারজান ছুঁড়ে দিল পাঁচিলের উপরে। পর মুহূর্তে ড্যানি প্যাট্রিকের প্রসারিত আঙুলগুলো পাঁচিলে মাথাটাকে আঁকড়ে ধরল।
বন্দুকজাব ড্যানি প্যাট্রিক তো হতবাক। কী মানুষ রে বাবা! জীবনে কখনও সে এ রকমটি দেখেনি, দেখার আশাও করে না।
পাঁচিল থেকে নেমে দু’জন নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল। পাহাড়ের অনেক উপরে যেখানে সে গত রাতটা কাটিয়েছে, সেখানেই দু’জন পৌঁছে গেল। টারজান বলল, ভোর পর্যন্ত যতটা পার বিশ্রাম করে নাও। তুমি খুব ক্লান্ত।
গীজ! আহা, এ রকম দরদভরা কথা কতকাল শুনিনি, ড্যানি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
একটু দূরে টারজান শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু ভোর হবার সাথে সাথেই তার ঘুম ভেঙে গেল। সঙ্গীটি তখনও ঘুমোচ্ছে। নিঃশব্দে সে কাছাকাছি একটা জলার দিকে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে ড্যানির ঘুম ভাঙল। উঠে দেখে টারজান নেই। কোথায় গেল? তাকে ফেলে পালিয়েছে? তাকে তো সে রকম মানুষ বলে মনে হয়নি। তবু-কিছুই বলা যায় না।
বন্দুকবাজ ভাবতে লাগল; এখন আমি কি করি? গীজ! ক্ষিধেও পেয়েছে খুব। তার জন্যে অপেক্ষা করব, না চলতে শুরু করব? যাবই বা কোথায়? কি খাব? মহা মুস্কিল।
যতদূর দৃষ্টি যায় চারদিকে তাকাল। কোথায় টারজান?
সামনের লম্বা ঘাসকে দু’ভাগ করে দেখা দিল টারজান। তার কাঁধে একটা মরা শুয়োর। আজকের খাদ্য।
টারজান শুয়োরটাকে নামিয়ে রেখে বলল, এই নাও, প্রাতরাশ এনেছি। এবার শুরু করে দাও।
ড্যানি বলল, খুব ভাল করেছ; আমি এটাকে কাঁচাই খেয়ে ফেলব।
খুব ভাল কথা। টারজান বসে পড়ল। দুটুকরো মাংস কেটে একটা কুটররা ড্যানিকে দিয়ে বলল, খাও।
আহারাদি শেষ করে দু’জন পথে নামল লাফায়েত স্মিথের খোঁজে। টারজান অচিরেই তার পায়ের দাগ দেখতে পেয়ে সেই পথ ধরে এগোতে লাগল; কিন্তু ড্যানির চোখে এমন কিছু পড়ল না যাকে মানুষের পায়ের দাগ বলে মনে হতে পারে।
অদূরে একটা গ্রাম দেখতে পেয়ে কৌতূহলবশে টারজান স্মিথের পায়ের দাগ ছেড়ে সেই গ্রামের দিকে হাঁটতে লাগল। ড্যানি প্যাট্রিক তখনও ফাটলের পথের পাথরের ঠোক্কর খেতে খেতে কোন রকমে এগিয়ে চলেছে।
এইভাবে ক্লান্ত দেহে সে যখন ফাটলের শেষ প্রান্তে পৌঁছে একটি আশ্চর্য উপত্যকার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল ততক্ষণে টারজান তার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে।
বন্দুকবাজ বলে উঠল, গীজ! কে জানত যে এমন একটা জায়গা এখানে আছে? আর টারজানই বা কোন পথে গেল?
খানিক ভেবেচিন্তে ভুল পথ ধরে সে এগোতে লাগল।
বন্দুকবাজ ড্যানি প্যাট্রিক ক্লান্ত, বিরক্ত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে হেঁটেছে কিন্তু বন্ধুর কোন হদিস পায়নি। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
সে হ্রদের দিকে চলতে লাগল। পথময় বড় বড় পাথর ছড়ানো। একটা বড় পাথরের চাই ঘুরে হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল। তার দিকেই এগিয়ে আসছে একটি স্বর্ণকেশী মেয়ে। সেও দাঁড়িয়ে পড়ল। মৃদু হেসে সে বলল, আরে, তুমি আবার কে?
তার মিডিয়ান ভাষা বন্দুকবাজ কিছুই বুঝতে পারল না।
ড্যানি বলল, এতদিনে আমার আফ্রিকা আসার একটা মানে পাওয়া গেল। এবার বলতো খুকি, তুমি ভাল আছ তো?
জেজেবেল ইংরেজিতে বলল, ধন্যবাদ। আমাকে তোমার ভাল লেগেছে জেনে খুশি হলাম।
ড্যানি বলল, গীজ, তুমি দেখছি যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলছ? তুমি কোন দেশের মেয়ে?
আমি মিডিয়ান থেকে আসছি।
সে দেশের নাম তো কখনো শুনিনি। তা তুমি এখানে কি করছ?
আমি অপেক্ষা করছি লেডি বারবারার জন্য; আর স্মিথের জন্য।
