মিডিয়ানরা দু’হাজার বছর আগেকার যুগে বাস করে। তা ছাড়া, তারা যেমন ধর্মভীরু তেমনি জন্মগত উন্মাদ।
স্মিথ জেজেবেলের দিকে তাকাল। সদ্য-উদিত চাঁদের আলো পড়েছে তার মুখে। স্মিথের মনোভাব বুঝতে পেরে লেডি বারবারা বলল, জেজেবেলের কথা আলাদা। কারণটা বুঝিয়ে বলতে পারব না, কিন্তু সে তার দেশের অন্য লোকদের মত নয়। সেই আমাকে বলেছে, মাঝে মাঝে নাকি তার মত দু’একটি ছেলেমেয়েও এ দেশে জন্মায়।
কিন্তু সে তো ইংরেজিতে কথা বলে, স্মিথ বলল।
আমি ওকে ইংরেজি শিখিয়েছি, লেডি বারবারা বলল।
বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনকে ছেড়ে ও কি সত্যি আমাদের সঙ্গে যাবে?
এবার কথা বলল জেজেবেল। নিশ্চয় যাব। এখানে থাকব কি খুন হবার জন্যে? আজ রাতে আমার বাবা, মা, ভাই-বোনরা সকলেই ছিল ক্রুশকাষ্ঠের কাছে। তারা আমাকে ঘৃণা করে। জন্মের মুহূর্ত থেকেই ঘৃণা করে। আমি তাদের মত নই। তাছাড়া, মিডিয়ানদের দেশে ভালবাসা বলে কিছু নেই। আছে শুধু ধর্ম। তারা মুখে ধর্মের কথা বলে আর কার্যক্ষেত্রে ছড়ায় শুধু ঘুণা।
জেজেবেলের পায়ের অবশ ভাবটা কেটে গেছে। এখন সে একাই হাঁটতে পারছে। নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে তিনটি প্রাণী। আফ্রিকার ভরা চাঁদ উঠেছে আকাশে। তারই আলোয় পথ চলা সুগমতর হয়েছে। চিন্নেরেথের নীল জলরাশিকে ডাইনে রেখে তারা এগিয়ে চলেছে।
মাঝরাতের কিছু পরেই স্মিথ প্রথমবার হোঁচট খেয়ে পড় গেল। তাড়াতাড়ি উঠে আবার হাঁটতে লাগল। পিছন থেকে জেজেবেল বুঝতে পারল, তার পা টলছে। স্মিথ আবার পড়ে গেল। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু সে যখন তৃতীয়বার পড়ে গেল তখন লেডি বারবারা ও জেজেবেল তাকে ধরে তুলল।
লেডি বারবারা বলল, তুমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ।
না, না, আমি ঠিক আছি।
তুমি শেষবার কখন খেয়েছ? লেডি বারবারা শুধাল।
স্মিথ বলল, সঙ্গে কিছু চকোলেট ছিল। বিকেলের দিকে তাই খেয়েছি।
লেডি বারবারা তবু প্রশ্ন করল, আমি জানতে চাইছি, পুরো খাবার কখন খেয়েছ?
দেখ, হাল্কা লাঞ্চ খেয়েছি গতকাল দুপুরে, বরং বলতে পার তার আগের দিন।
লেডি বারবারা সবিস্ময়ে বলল, আর এখন মাঝ রাত পার হয়ে গেছে। অথচ সেই থেকে তুমি হেঁটেই চলেছ?
দুর্বল হাসি হেসে স্মিথ বলল, কিছুক্ষণ দৌড়তেও হয়েছে; একটা সিংহ তাড়া করেছিল যে।
ইংরেজ মেয়েটি বলল, তুমি একটু সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই বিশ্রাম নেব।
স্মিথ মাথা নেড়ে বলল, না, না, তা করো না। দিনের আলো ফুটবার আগেই আমাদের এই উপত্যকাটা পার হতে হবে। সূর্য উঠলেই তারা আমাদের খুঁজতে বের হবে।
লেডি বারবারা কঠিন গলায় বলল, সে যা হয় হবে। তোমাকে বিশ্রাম নিতেই হবে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও লাফায়েত বসে পড়ল। বলল, আমার দ্বারা তোমাদের বিশেষ কোন সাহায্য হবে বলে তো মনে হয় না। এ সময় ড্যানি থাকলে খুব ভাল হত।
কে ড্যানি?
আমার বন্ধু; এই অভিযানে আমার সঙ্গী।
তার কি আফ্রিকা-অভিযানের অভিজ্ঞতা আছে?
তা নেই, তবে সে কাছে থাকলেই যে ভরসা পাওয়া যায়। তাছাড়া সে গুলিগোলা ছুঁড়তে খুব ওস্তাদ।
চিৎ হয়ে শুয়ে স্মিথ চাঁদের দিকে তাকাল। এখন সে অনেকটা সুস্থ বোধ করছে। শুয়ে শুয়ে গত ত্রিশ ঘণ্টার ঘটনাবলীই তার মনের মধ্যে নড়াচড়া করতে লাগল। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল।
পাছে তার ঘুম ভেঙে যায় তাই লেডি বারবারা ইশারায় জেজেবেলকে ডেকে নিয়ে খানিকটা দূরে গিয়ে বসল। বলল, আহা বেচারী! অনেক ধকল গেছে ওর উপর দিয়ে।
ও কি তোমার দেশের মানুষ? জেজেবেল প্রশ্ন করল।
না, ও মার্কিনী। কথা শুনেই বুঝেছি।
ও খুব সুন্দর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেজেবেল বলল।
কয়েক সপ্তাহ ধরে কেবল আব্রাহাম পুত্র আব্রাহামকে দেখলে তোমার সঙ্গে আমাকেও একমত হতে হবে যে সন্ত গান্ধীও একটি এডোনিস, লেডি বারবারা বলল।
তারপর একটা হাই তুলে বলল, ও সব কথা পরে হবে। এস একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক।
লেডি বারবারা মাটির উপর শুয়ে অচিরেই ঘুমিয়ে পড়ল। সারাটা দিন তার উপর দিয়েও তো অনেক ধকল গেছে।
মাঝ রাতের পরে একটা শব্দ শুনেই টারজনের ঘুম ভেঙ্গে গেল।
মাথা তুলে কান পাতল; তারপর মাথা নিচু করে মাটিতে কান রাখল। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই বলল, অশ্ব ও অশ্বারোহী।
এত রাতে অশ্বারোহী আসছে কেন? তারা কারা?
টারজান তো জানে না ড্যানি ডাকাতের সর্দার কাপিয়েত্রো-র হাতে বন্দী হয়েছে। তাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলেছে তাদের শিবিরে।
অন্ধকারে বন্দুকবাজ টলতে টলতে চলেছে। বিশ বছরেও বেশি কালের জীবনে এত ক্লান্তি সে কোনদিন অনুভব করেনি। প্রতিটি পদক্ষেপই মনে হচ্ছে শেষ পদক্ষেপ।
শেষ পর্যন্ত ডাকাতের দলটা ডোমিনিক কাপিয়েত্রোর গ্রামের ফটক দিয়ে ঢুকল। বন্দুকবাজ-কে নিয়ে যাওয়া হল এক কুটিরে। হাতের বাঁধন কেটে দিতেই সেখানকার কঠিন মাটিতেই তার দেহটা এলিয়ে পড়ল।
ঘুম ভেঙে কোন রকমে কিছু পেটে দিয়েই সে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। একটা ক্লান্ত ডাকাত কুটিরের মুখে ঘুমে ঢুলতে লাগল।
ডাকাতরা যখন সারি দিয়ে গ্রামের ভিতরে ঢুকছিল টারজান তখন নেমে এসেছিল উপরকার পাহাড়ের মাথায়। ভরা জ্যোৎস্নায় অশ্বারোহীদের বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। কাপিয়েত্রো ও স্তাবুচকে দেখেই সে চিনতে পারল; মার্কিন ভূ-তত্ত্ববিদের দলের সর্দার ওপোনিয়োকেও দেখতে পেল; আরও দেখল, বন্দুকবাজ অত্যন্ত কষ্টে টলতে টলতে চলেছে।
