এগিয়ে চলল গ্রামটার দিকে–আশ্রয় ও আহার্যের আশায়। হ্রদের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা দৃশ্য চোখে পড়তেই সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। দুটো ক্রুশ-কাষ্ঠের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুটি মেয়ে। আগুনের আভা পড়েছে তাদের মুখে। দু’জনই সুন্দরী।
লাফায়েৎ স্মিথ বুঝতে পারল একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছে। ক্রুশ দুটোর নিচে স্তূপীকৃত করা হয়েছে শুকনো ঘাস-পাতা ও জ্বালানি-কাঠ। একদল যুবকের হাতে জ্বলন্ত মশাল। জ্বালানি-কাঠে আগুন ধরাবার আয়োজন চলছে।
একটি বৃদ্ধ মন্ত্র পাঠ করছে। এখানে-ওখানে মাটিতে পড়ে আছে কিছু মানুষ। নিশ্চয় দশা পড়েছে। বুড়ো লোকটি সংকেত করতেই শুকনো কাঠে আগুন ধরানো হল।
আর দেরী করা চলে না। এক লাফে এগিয়ে গিয়ে গ্রামবাসীদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে লাফায়েৎ স্মিথ ক্রুশকাষ্ঠের কাছে হাজির হল। পায়ের বুট দিয়ে জ্বলন্ত কাঠগুলোকে লাথি মরে সরিয়ে দিল। তারপর ৩২- টাকে উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়াল বিস্মিত ক্রুদ্ধ জনতার দিকে।
আব্রাহাম পুত্র আব্রাহাম হতচকিত। কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য। সম্বিত ফিরে পেয়ে সে চীৎকার করে বলল, কে এই মহাপাপী? ওকে আক্রমণ কর! ওর হাত-পা-মুণ্ডু ছিঁড়ে ফেল।
স্মিথের পেছন থেকে ভেসে এল একটি ইংরেজ কণ্ঠঃ এই মুহূর্তে গুলি চালাও; নইলে ওরা তোমাকে শেষ করে ফেলবে।
লাফায়েৎ স্মিথের বিস্ময়ের শেষ নেই। এ যে এক ইংরেজ মহিলার কণ্ঠস্বর। একজন মশালধারী এগিয়ে আসতেই স্মিথ গুলি করল। আর্তনাদ করে বুক চেপে ধরে সে স্মিথের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। তা দেখে আর যারা এগিয়ে আসছিল তারা পিছিয়ে গেল। অতি-উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে অ্যাঙ্গাস্টাসের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অপম্মার রোগগ্রস্ত বাকি লোকগুলো মাটিতে পড়ে গোঙ্গাতে লাগল।
তাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার সেই সুযোগে লাফায়েৎ স্মিথ দুই বন্দিনীর হাত-পায়ের বাঁধন কেটে দিল। দু’জনকে দুই হাতে তুলে ধরল। জেজেবেলকে ক্রুশে বাঁধা হয়েছিল অনেকক্ষণ আগে। সে কোনমতেই একাকী দাঁড়াতে পারছিল না। লেডি বারবারা ও স্মিথ দু’জনেই তাকে ধরে রইল যতক্ষণ না। তার পায়ের স্বাভাবিক রক্ত-চলাচল ফিরে আসে।
পয়গাম্বরের দিকে পিছন ফিরে তারা দাঁড়িয়েছিল। সেই সুযোগে বুড়ো পয়গাম্বর বলির খড়টা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল তাদের দিকে। তার সব রাগ পড়ল লেডি বারবারার উপর। সেই তো যত নষ্টের গোড়া। চুপি চুপি এগিয়ে লেডি বারবারার পিছনে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পয়গাম্বর খসমেত ডান হাতটা মাথার উপর তুলল আঘাত হানার উদ্দেশ্যে। সমবেত দর্শকরা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। সহসা তাদের কানে এল পয়গাম্বরের রুদ্ধশ্বাস আকস্মিক আর্তনাদ; তার অবশ মুঠি থেকে খগা পড়ে গেল; সে নিজেও ভূতলশায়ী হল। নবাগতদের দৃঢ় মুষ্ঠি আর গলা চেপে ধরেছে।
লেডি বারবারা বলল, এখনই পালাও। মুহূর্তের মধ্যে ওরা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
স্মিথ বলল, তোমার বন্ধুটিকে সঙ্গে নিতে আমার সঙ্গে তোমাকেও হাত লাগাতে হবে। সে একা হাঁটতে পারবে না।
লেডি বারবারা বলল, তুমি ওকে বাঁ হাত দিয়ে ধর। তাহলে ডান হাতে পিস্তল চালাতে পারবে। আমি অপর দিকটা ধরছি।
জেজেবেল মিনতি করে বলল, আমাকে রেখে যাও। আমার জন্য তোমরাও পালাতে পারবে না।
স্মিথ বলল, বাজে কথা রাখ। আমার গলা জড়িয়ে ধর।
লেডি বারবারা আশ্বাস দিয়ে বলল, রক্ত-চলাচল স্বাভাবিক হলেই তুমি হাঁটতে পারবে। চলে এস। যত তাড়াতাড়ি পারি পালাই এখান থেকে।
বাধা দিল জোবাব। নোংরা জামার ভিতর থেকে একটা ছুরি বের করে চীৎকার করে বলল, ওদের আইকাও।
জোবাবের দিকে পিস্তল তাক করে স্মিথ হুকুম করল, একপাশে সরে দাঁড়াও!
মুহূর্তের মধ্যে জোবাবের পাঁজরে নলটা ঠেকিয়ে ঘোড়া টিপল। বিকৃতস্বরে চীৎকার করে সে মাটিতে পড়ে যেতেই নলের মুখটা জনতার দিকে ঘুরিয়ে আবার গুলি করল। ভয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে মিডিয়ানরা পালিয়ে গেল।
জেজেবেল বলল, যে কোন মুহূর্তে ওরা আবার আসতে পারে। এই সুযোগে আমাদের পালাতে হবে।
স্মিথ বলল, আমার পিছনে পিছনে এস। আমি যে পথে এসেছি সেই পথে তোমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাব।
বেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে পথ চলার পরে লাফায়েৎ স্মিথই প্রথম মুখ খুলল। বলল, তোমাদের দুজনের পরিচয়টা কিন্তু এখনও জানা হয়নি।
লেডি বারবারা বলল, জেজেবেল এখানকারই মেয়ে।
আর তুমি? তুমিও কি এখানকার মেয়ে?
লেডি বারবারা জবাব দিল, আমি ইংরেজ।
অথচ কোন্ পথে এখানে এসেছ তাও জান না?
জানি-আমি এখানে নেমেছি প্যারাসুটে।
স্মিথ হাঁ করে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি লেডি বারবারা কলিস!
তুমি কি করে জানলে? তুমি কি আমাকে খুঁজছ?
না, কিন্তু লন্ডন হয়ে আসার সময় খবরের কাগজে তোমার বিমানে ওড়া ও নিখোঁজ হবার খবর অনেক পড়েছি–ছবি ছাপাও বেরিয়েছিল। বুঝলে তো?
আর ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে গেল তোমার সঙ্গে। আশ্চর্য যোগাযোগ! কি সৌভাগ্য আমার।
স্মিথ মুখ নিচু করে বলল, কি জান, আসলে আমিও পথ হারিয়ে ঘুরছি। ফলে তোমার ভাগ্যের বিশেষ হেরফের কিছু হয়নি।
তা কেন? তুমিই তো আমাকে কবরে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছ। ও
রা কি সত্যি তোমাকে পুড়িয়ে মারত না কি? আজকের সভ্য জগতেও কি তা সম্ভব?
