এখন তার একমাত্র কাজ মেয়েটিকে উদ্ধার করা। মাটিতে নেমে বেড়া টপকে সে গ্রামের ভিতরে ঢুকল পিছন দিক দিয়ে; তারপর কাছেই একটা গাছে চড়ে লুকিয়ে সব দেখতে লাগল। আর ঠিক তখনই একটি কুৎসিত বুড়ি মেয়েটির চুলের মুঠি ধরে হাতের ছুরিটা তুলল তার গলায় বসিয়ে দিতে।
মুহূর্তমাত্র সময় নেই; টারজান সঙ্গে সঙ্গে ধনুকে তীর ছুঁড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ফটকের দিকে দিয়ে হুংকার ছুটে এল একটি সাদা মানুষ। বুঝতে পারল, মেয়েটিকে উদ্ধার করতেই সে এসেছে। তারপরের ঘটনা তো সকলেরই জানা।
টারজান গাছ থেকে নামবার আগেই যে ডালে সে দাঁড়িয়ে ছিল সেটা সশব্দে ভেঙ্গে পড়ল। সেই সঙ্গে টারজানও মাটিতে ছিটকে পড়ল। তার জ্ঞান হারিয়ে গেল। আবার জ্ঞান ফিরে আসতে দেখল, তার শরীরের উপর চেপে বসে বামনরা তার হাত পাকে বেশ শক্ত করে বেঁধে ফেলেছে। টারজান একবার আড়মোড়া ভাঙতেই বামনরা চারদিকে ছিটকে পড়ে গেল, কিন্তু তার হাত-পায়ের বাঁধন ছিঁড়ল না। সে বুঝল, একদল নির্মম, নিষ্ঠুর মানুষের হাতে সে বন্দী হয়েছে।
আত্মরক্ষা ও ফটক রক্ষার যথেষ্ট আয়োজন করা সত্ত্বেও বামনরা ভীষণ ভয় পেয়েছে। তাদের সর্দার মরেছে; মুখের গ্রাস সাদা মেয়েটা উধাও হয়েছে; দৈত্যের মত একটা সাদা মানুষ আকাশ থেকে নেমে এসে তাদের হাতে বন্দী হয়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এতগুলো ঘটনা ঘটে যাওয়ায় তারা বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
এই সব ভাবতে ভাবতেই নিচের গ্রাম থেকে একটা অদ্ভুত হুংকার তাদের কানে এসে লাগল। ওটা কিসের শব্দ ভাল করে বুঝতে না পেরে আদিবাসীরাও ভয়ে আঁতকে উঠল। জঙ্গলের অন্ধকারে অনেক দূর থেকে ভেসে আসা এ ধরনের রহস্যময়, ভয় জাগানো ডাক তারা আগেও শুনেছে, কিন্তু আগে কখনও গ্রামের এত কাছ থেকে শোনে নি; এ যে প্রায় গ্রামের মধ্যে।
যে দুটি বামন বন্দী দৈত্যটির পাহারায় ছিল তারাই ছুটতে ছুটতে এসে জানাল, শব্দটা এসেছে তাদেরই ফাঁকা ঘরটার ভিতর থেকে। তাদের চোখ বিস্ফারিত, শ্বাসরুদ্ধ হবার উপক্রম। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, যাকে আমরা বন্দী করেছি সে মানুষ নয়, একটা দৈত্য। শোন নি তার হুংকার?
এদিকে বামনদের নতুন সর্দার নিয়ালওয়া দলবল নিয়ে টারজনের ঘরটাকে ঘিরে দাঁড়াল। সকলেরই হাতে বিষ মাখানো তীর ও বর্শা। নিয়ালওয়ার সংকেত পেলেই সেই সব ছোঁড়া হবে। টারজনের জীবন মুহূর্তকালের সুতোয় ঝুলছে। এমন সময় বেড়ার ওপাশ থেকে ভেসে এল অনেক ক্রুদ্ধ কণ্ঠের গর্জন। নিয়ালওয়ার মুখের হুকুম তার ঠোঁটে এসেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
চীৎকার করে সে বলে উঠল, ও কি?
বেড়ার দিকে তাকিয়ে বামনরা সভয়ে দেখল, কালো কালো সব মূর্তি বেড়া ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকেছে। সকলেই এক সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল, দৈত্যরা আসছে।
আর একজন চেঁচিয়ে বলল, ওরা সব জঙ্গলের লোমশ মানুষের দল।
হাতের বর্শা ছুঁড়ে ফেলে বামনরা পালাতে লাগাল। একটা বাড়ির ছাদে উঠে নকিমা চেঁচাতে শুরু করে দিল, এই পথে জু-টো! গোমাঙ্গানির বাসায় এখানেই আছে অরণ্যরাজ টারজান।
একটা প্রকাণ্ড থঙ্খলে মূর্তি সেই বাড়িটার দিকে দুলে দুলে এগোতে লাগল। যেমন চওড়া তার কাঁধ, তেমিন লম্বা তার হাত। তার পিছু নিল আধ ডজন মস্ত বড় বড় গোরিলা।
টারজান ডাক দিয়ে বলল, এখানে! টারজান এখানে আছে জু-টো।
বড় গোরিলাটা নিচু হয়ে দরজা দিয়ে ভিতরে তাকাল। তার ভিতর দিয়ে তার প্রকাণ্ড শরীরটা ঢুকল না। দুই হাত দিয়ে দরজার চৌকাঠ ধরে গোটা বাড়িটাকেই মাটি থেকে তুলে নিজের পিঠের উপরে আছড়ে ভেঙে ফেলল।
টারজান হুকুম করল, আমাকে জঙ্গলে নিয়ে চল।
জু-টো তাকে কোলে করে বেড়ার কাছে নিয়ে গেল। রাগে গর গর করতে করতে অন্য গোরিলারাও তাকে অনুসরণ করল। মানুষের গন্ধ তাদের ভাল লাগছে না। তারা যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল। মুহূর্তকাল পরেই তারা জঙ্গলের ঘন অন্ধকারে মিশে গেল।
বুড়ো টাইমার ও মেয়েটি নিঃশব্দে অনেকটা পথ হাঁটল। কারও মুখে কথা নেই। থমথমে ভাব। কালি বাওয়ানা হাঁটছে একটু পিছনে থেকে। বারবার সে লোকটিকে দেখছে। কি যেন গভীর চিন্তায় সে মগ্ন।
একটা খোলা জায়গায় পৌঁছে বুড়ো টাইমার থামল। পাশেই নদী। নদীর তীরে একটা বড় গাছ। বলল, এখানেই আমরা বিশ্রাম নেব।
মেয়েটি কিছুই বলল না।
গাছের ডালপালা ও পাতা দিয়ে একটা আস্তানা বানাতে শুরু করে দিল বুড়ো টাইমার। তা দেখে কালি বাওয়ানাও সে কাজে হাত লাগাল। কাজ হয়ে গেলে দুজনে মিলে শুকনো ডালপালা কুড়িয়ে এনে আগুন জ্বালাল কারও মুখে কথা নেই।
এক সময় জঙ্গলের দিকে চোখ পড়তেই মেয়েটি চীৎকার করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
হা ঈশ্বর! দেখ! দেখ!
চীৎকার শুনেই লোকটিও চোখ তুলে তাকাল। পরক্ষণে সেও লাফিয়ে উঠে বলল, পালাও! ঈশ্বরের দোহাই কালি, পালাও! মেয়েটি কিন্তু পালাল না। ছোট লাঠিটা হাতে নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। একটা বড় মুগুর হাতে নিয়ে লোকটিও অপেক্ষা করতে লাগল।
অদ্ভুত ভঙ্গীতে দুলতে দুলতে তাদের দিকে এগিয়ে এল একটা প্রকাণ্ড গোরিলা। এতবড় গোরিলা বুড়ো টাইমার আগে কখনও দেখে নি। মেয়েটি তখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে মিনতিভরা গলায় বলল, কালি, দয়া করে পালাও। ঐ জন্তুটাকে আমি কিছুক্ষণ আটকে রাখতে হয়তো পারবো, কিন্তু ওকে থামাতে পারব না। তুমি কি বুঝতে পারছ না কালি যে ও তোমাকেই চাইছে? মেয়েটি তবু নড়ল না। গোরিলাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। দোহাই তোমার! লোকটি আবার মিনতি জানাল।
