দাড়িওয়ালা ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ইংরেজি ভাষা আমি একটু-একটু বুঝি। তুমি কে? কোন্ দেশ থেকে এসেছ তুমি?
স্তাবু বলল, আমি একজন বিজ্ঞানী। আগে কথা বলেছিলাম রুশ ভাষায়।
রাশিয়া কি তোমার দেশ?
হ্যাঁ।
এবার পরিবর্তিত সুরে দাড়িওয়ালা শুধাল, তোমার নাম কি কমরেড?
আমার নাম লিওনা স্তাবুচ। আর তোমার নাম কি?
দোমিনিক কাপিয়েত্রো। এস, ভিতরে গিয়ে সব কথা হবে। আমার কাছে একটা বোতল আছে। সেটা দিয়েই শুভ-সূচনা করা যাবে।
পাত্রের পর পাত্র মদ ফুরোতে লাগল। ক্রমে দু’জনের মেজাজও দিলদরিয়া হয়ে উঠল। সামনে দুটো খালি বোতল; আর একটা নতুন ভোলা হয়েছে। মদের ঝোঁকে স্তাবুচের গলা জড়িয়ে ধরে ভদ্রলোকটি নিজে থেকেই বলতে শুরু করল, কমরেড তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। অতএব আমাকে বলতেই হবে কেন আমি এই নোংরা গলা-কাটা লোকগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়েছি। আমি ছিলাম ইতালীয় বাহিনীর একজন সৈনিক। আমার রেজিমেন্ট তখন ইরিত্রিয়াতে অবস্থিত। একজন সাচ্চা কমুনিস্ট হিসেবে সেখানেই বিভেদ ও বিদ্রোহের উস্কানি দিতে শুরু করলাম, আর একটা ফ্যাসিস্ট কুকুর কম্যান্ডিং অফিসারকে বলে দিল। আমি গ্রেফতার হলাম। আমাকে নির্ঘাৎ গুলি করে মারা হত, কিন্তু তার আগেই আমি আবিসিনিয়াতে পালিয়ে গেলাম।
পথে নেমে কিছু ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র চুরি করলাম। পথে একদল ডাকাতকেও দলে ভিড়িয়ে নিলাম। তাদের নিয়েই শুরু করলাম পথে পথে চুরি-ডাকাতি। কিন্তু তাতে মালকড়ি সামান্যই জুটত। কাজেই সুদূর ঘেঞ্জি অঞ্চলে গিয়ে শুরু করে দিলাম কালো হস্তিদন্তের ঢালাও লাভের ব্যবসা।
কালো হস্তিদন্ত? এরকম কোন জিনিসের নাম তো শুনিনি।
কাপিয়েত্রো হেসে বলল, আরে, দু-পেয়ে হাতি।
স্তাবুচ শিস্ দিয়ে বলে উঠল, এবার বুঝতে পেরেছি। তুমি একজন ক্রীতদাস-শিকারী থাক, ওসব কথা। এবার তোমার কথা বল।
আমি একটি লোকের সন্ধান করছি।
আফ্রিকার উপকূল অঞ্চলে তো অনেক লোক আছে। তার জন্য এই সুদূর ঘেঞ্জি অঞ্চলে এসেছ কেন?
স্তাবুচ উত্তরে বলল, আমি যার খোঁজ করছি তাকে ঘেঞ্জির দক্ষিণেই কোথাও পাওয়া যাবে বলে আমার ধারণা।
নেশার ঘোরে না থাকলে হয় তো একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত লোককে নামটা বলত না। সে নির্দ্বিধায় বলল, অরণ্যরাজ টারজান নামে একজন ইংরেজকে আমি খুঁজছি।
কাপিয়েত্রোর চোখ দুটো কুঁচকে গেল। প্রশ্ন করল, সে কি তোমার বন্ধু?
তাকে কখনও দেখিও নি, স্তাবুচ জবাব দিল।
কাপিয়েত্রো বলল, তার দেশ ঘেঞ্জির অনেক দক্ষিণে। কিন্তু অরণ্যরাজ টারজনের সঙ্গে তোমার কি কাজ?
আমি মস্কো থেকে এসেছি তাকে হত্যা করতে। কথাটা বলে ফেলেই স্তাবুচের মনে হল, কাজটা ভাল হয় নি।
কাপিয়েত্রো বলল, যাক, আশ্বস্ত হলাম।
কেন?
কালো হস্তিদন্ত সগ্রহের ছোটখাট কাজে সেই আমার পথে সবচাইতে বড় বাধা। সে আমার পথ থেকে সরে গেলেই আমি বেঁচে যাই।
লর্ড পাসমোরের সাফারি ঘেঞ্জি পর্বতমালার পশ্চিম দিক ধরে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ দিকে। তার দীর্ঘদেহ কুলিরা সুশিক্ষিত সেনাদলের মত সঠিক পদক্ষেপে এক তালে এগিয়ে চলেছে। সর্বত্র শৃঙ্খলার চিহ্ন সুপরিসস্ফুট।
পূর্ব দিকে কয়েক মাইল এগিয়ে একটা চড়াই বেয়ে উঠবার সময় দুটি সাদা মানুষ একটি মাত্র ভৃত্য ও একটি বন্দুকবাহককে নিয়ে দল ছেড়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে চলেছে।
লাফায়েৎ স্মিথ বন্দুকবাজকে বলল, তুমি সাফারির সঙ্গে এখানে থাক। জায়গাটা ভাল, এখানে একটা শিবির বসাবার ব্যবস্থা কর। আরও কিছুটা দেখে আসি। এখনও অনেক বেলা আছে।
খোলা জায়গা পেরিয়ে লাফায়েৎ স্মিথ জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। পথ ক্রমেই আরও দুরারোহ; যেমন চড়াই, তেমনি ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি। বেশ কষ্ট করে সে উপরে উঠতে লাগল।
এক সময় একটা পাহাড়ের মাথায় উঠল। সামনে দূরে মাইলের পর মাইল জুড়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি। এ পাহাড় থেকে সামনের পাহাড়ে যাবার পথে একটা বড় খাড়ি।
লাফায়েৎ স্মিথ খাঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। যতটা ভেবেছিল খাড়িটা তার চাইতেও বেশি গভীর। তবু গভীর আগ্রহে নিচে নেমে সে আবার উপরে উঠতে লাগল পরের পাহাড়টা বেয়ে। কৌতূহল তাকে এতই অভিভূত করে রেখেছে যে সময়ের দিকে কোন খেয়ালই রইল না।
খাড়ির উপরে উঠেই রাত নেমে এল। তবু সে ধীরে ধীরে উঠতে লাগল। আরও কয়েক ঘণ্টা পার হবার আগে স্মিথ বুঝতেই পারেনি যে সে পথ হারিয়ে ফেলেছে।
একটু একটু করে লাফায়েৎ স্মিথ এগিয়ে চলল সুড়ঙ্গ-পথ ধরে। আবিষ্কারের নেশায় ভুলে গেল ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও নিরাপত্তার কথা। সুড়ঙ্গটা ক্রমেই সরু হয়ে আসছে। এক সময় দু’দিকের দেওয়াল এত বেশি চেপে এসেছে যে কোনরকমে একটা মানুষ তার ভিতর দিয়ে গলে যেতে পারে।
অন্ধকার ক্রমেই বাড়ছে। এক সময় সে হাতে পায়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল। মনে সর্বদাই ভয়-না জানি কি আছে এ পথের শেষে।
এক সময় একটুকরো দিনের আলো হঠাৎ ঝলমলিয়ে উঠল গুহার মুখে। হামাগুড়ি দিয়ে বের হতেই সামনে পড়ল একটা উপত্যকা। সম্মুখে প্রসারিত ঝোপঝাড়ে ভর্তি বিস্তীর্ণ প্রান্তর; মাঝখানে একটা নীল হ্রদ পড়ন্ত সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করছে।
সেখান থেকে চারদিকে তাকিয়ে একটা আশ্চর্য দৃশ্য তার চোখে পড়ল। কুঁড়ে ঘরে সাজানো একটা গ্রাম। কিন্তু না, সে নিশ্চয় স্বপ্ন দেখছে। এই পরিত্যক্ত জায়গায় গ্রাম আসবে কোথা থেকে? নিশ্চয় এটা তার চোখের ভুল।
