কথা শেষ করে ইঙ্গিত করতেই চারটি যুবক দু’দিক থেকে জালটাকে তুলে ধরল, আর বাকি দুজন ধরে রইল জালের লম্বা দড়িটার দুই প্রান্তে। এবার তারা দুই প্রান্ত থেকে মেয়েটিকে দোলাতে লাগল ঘড়ির পেন্ডুলামের মত। চেনেথের হ্রদের শান্ত জলরাশির উপর দোদুল্যমান মেয়েটির আর্ত চীষ্কারের সঙ্গে মিশে গেল সেই সব দর্শকদের চীৎকার ও আর্তনাদ যাদের দুর্বল স্নায়ু এই চরম উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে আকস্মিক অপর রোগের প্রকোপে মাটিতে পড়ে গোঙ্গাতে শুরু করেছে।
ভীত এস্ত মেয়েটিকে যুবকরা ক্রমেই দ্রুততর বেগে দোলাতে লাগল। হঠাৎ তাদের একজনও মাটিতে এলিয়ে পড়ল। তার ফেনায়িত মুখ থেকে গোঁ-গোঁ শব্দ বের হতে লাগল। মেয়েটির নরম দেহটা শক্ত লাভা-পাথরের উপর আছড়ে পড়ল। জেহোবার ইঙ্গিতে আর একটি যুবক এসে তার জায়গায়। দাঁড়িয়ে পড়ল। মেয়েটি অবিরাম দুলতে লাগল একবার চিনেরেথের জলের উপর, একবার শক্ত লাভা পাথরের উপর।
জাল দোলানোর তালে তালে আব্রাহামের পুত্র আব্রাহাম মন্ত্রের মত উচ্চারণ করতে লাগল, জিহোবার নামে! আর তার পুত্র পলের নামে!
এটাই বোধ হয় সংকেত। চার যুবক সঙ্গে সঙ্গে জালের দড়িতে ঢিলে দিল আর জল শুষ্টু মেয়েটি সটান ডুবে গেল হ্রদের জলে। খানিকটা জল ছলকে উঠল। তার ঢেউ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল হ্রদের বুকে। কয়েক সেকেন্ড সব চুপচাপ। শুধু শোনা যেতে লাগল মিডিয়ানদের অনিবার্য নিয়তির শিকার আরও অনেক অপম্মার গ্রস্ত মানুষের আর্তনাদ ও গোঙানির শব্দ।
কয়েক সেকেন্ড পরে আব্রাহাম পুত্র আব্রাহাম আবার সংকেত দিতেই ছয় যুবক জলশুদ্ধ মেয়েটিকে টেনে তুলল জলের উপরে। কিছুক্ষণ সেইভাবে রেখে পয়গাম্বরের নির্দেশে আবার তাকে জলের মধ্যে ডুবিয়ে ধরল।
ছয় যুবক জালটাকে তুলে মেয়েটির অসার দেহটাকে পাথরের উপর নামিয়ে দিল ঠিক সেইখানে যেখানে লেডি বারবারা নতজানু হয়ে প্রার্থনায় রত।
পয়গাম্বর তার দিকে ফিরে বলল, কি করছ তুমি?
অসহায় মেয়েটির জীবন রক্ষার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি।
মুখ বিকৃত করে পয়গাম্বর বলল, ওই দেখ তোমার প্রার্থনার জবাব। মেয়েটি মরে গেছে। এর দ্বারা জেহোবা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিল, আব্রাহাম-পুত্র আব্রাহামই তার পয়গাম্বর, আর তুমি একটি ধাপ্পাবাজ!
জেজেবেল অস্পষ্ট গলায় বলল, আর আমাদের রক্ষা নেই!
সেটা লেডি বারবারাও বুঝতে পারল; তবু সংকটকালে আত্মহারা হয়ে পয়গাম্বরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে বলল, হ্যাঁ, মেয়েটি মারা গেছে, কিন্তু জেহোবা তাকে নতুন জীনব দান করতে পারে।
আব্রাহাম পুত্র আব্রাহাম বলল, তা পারে, কিন্তু দেবে না।
তোমার কথায় দেবে না, কারণ সে তোমার উপর ক্রুদ্ধ হয়েছে, তার পয়গাম্বর হয়েও তুমি তাকে অমান্য করেছ। দ্রুতপায় প্রাণহীন দেহটার পাশে এগিয়ে গিয়ে লেডি বারবারা আবার বলল, কিন্তু আমার প্রার্থনায় জেহোবা ওকে নতুন জীবন দেবে। এস জেজের্বেল, আমাকে সাহায্য কর।
আধুনিক খেলা-ধূলায় অভিজ্ঞ অন্য অনেক নারীর মতই লেডি বারবারাও জলমগ্ন মানুষের চিকিৎসা পদ্ধতি বেশ ভালই জানে। সেই সব প্রক্রিয়াই সে মেয়েটির উপর প্রয়োগ করতে লাগল। কিন্তু তার সঙ্গে একটু ভড়ং যোগ করল সমবেত নর-নারীদের মনে বিস্ময় ও শ্রদ্ধা জাগাতে। তার নানা রকম নির্দেশমত জেজেবেল কাজ করতে লাগল, আর লেডি বারবারা মন্ত্রোচ্চারণের ভঙ্গীতে গড় গড় করে আবৃত্তি করতে লাগল কখনও চার্জ অব দি লাইট ব্রিগেড থেকে, কখনও এলিস ইন ওয়ারল্যান্ড থেকে, আবার কখনও কিপ লিং বা ওমর খৈয়াম থেকে। এইভাবে দশ মিনিট চিকিৎসার পরে মেয়েটির দেহে যখন জীবনের লক্ষণ দেখা দিল তখন সে লিংকনের গেটিবুর্গ ভাষণ-এর অংশবিশেষ আবৃত্তি করে তার মন্ত্র পাঠ শেষ করল।
পয়গাম্বর, শিষ্যবৃন্দ, প্রধানগণসহ সমবেত জনতা মুগ্ধবিস্ময়ে এই অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করল।
উঠে দাঁড়িয়ে লেডি বারবারা তখনও আবৃত্তি করে চলেছে, জনগণের কল্যাণে জনগণকে নিয়ে গঠিত জনগণের এই সরকার কখনও পৃথিবী থেকে লুপ্ত হবে না। মুখ ফিরিয়ে জালধারী ছয়জন যুবককে আদেশ করল, মেয়েটিকে ওই জঙ্গলের মধ্যে শুইয়ে তার বাবা-মার কাছে নিয়ে যাও। এস জেজেবেল। আব্রাহাম পুত্র আব্রাহামের দিকে একবার ফিরেও তাকাল না।
একজন অশ্বারোহী লুটেরার পিছনে বসে বন্দী লিও স্তাবুচ অজ্ঞাত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। ঘটনাচক্রে একবার মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলেও যে কোন দ্বিতীয় সুযোগেই লুটেরারা যে তাকে শেষ করে ফেলবে তা সে বুঝতে পারছে।
একটা পাহাড়ি খাড়ি-পথ ধরে লুটেরারা এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণ পরেই দূরে একটা প্রাচীরঘেরা গ্রামে লুঠেরারা ঢুকে পড়ল। গ্রামবাসীরা চীৎকার করে তাদের অভ্যর্থনা জানাল।
একটা ভাঙা ঘর থেকে বেরিয়ে এল একজন বেঁটে দাড়িওয়ালা সাদা মানুষ। তাকে দেখেই স্তাবুচ যেন কিছুটা স্বস্তি পেল।
দলের সর্দার সেই দাড়িওয়ালার কাছে গিয়ে সব কথা বলতে লাগল। সেই ফাঁকে স্তাবুচকে সেখানে নিয়ে আসা হল।
সর্দারের কথা শুনে দাড়িওয়ালা হাসিমুখে স্তাবুচকে কি যেন বলল। স্তাবু বুঝল যে লোকটি ইতালীয় ভাষায় কথা বলছে। কিন্তু সে ভাষা তো সে বুঝতেও পারে না। তখন সে ইংরেজিতে কথা বলল।
