স্তাবুচ ধমক দিয়ে বলল, এবার ওরা আমাকে ভয় করবে। আর কেউ পালালে আমি-আমি
কিন্তু সে কথা আর বলা হল না। একজন কুলি হঠাৎ দাঁড়িয়ে সভয়ে চীৎকার করে পশ্চিম দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ দেখ! দস্যুরা আসছে।
দূরে আকাশ-পটে কালো ছায়ার মত দেখা দিল একদল অশ্বারোহী। তারা সবেগে ধেয়ে আসছে। সাদা আলখাল্লা বাতাসে উড়ছে, রাইফেলের নল ও বর্শার ফলা রোদ্দুরে চকচক করছে।
হঠাৎ একটা কুলি ছুটে গিয়ে একটা তল্পি কাঁধে তুলে নিল। সঙ্গে সঙ্গে সকলেই ছুটে গেল স্কুপ করা তল্পিতল্পার দিকে।
সর্দার ও আস্কারিরা ছুটে গেল। কুলিরা ততক্ষণে তল্পিতল্পা নিয়ে পিছনের পথ ধরে পালাতে ব্যস্ত। সর্দার বাধা দেয়াতে একটা কুলি ঘুষি মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর সকলেই পালাতে লাগল কুলিরা, আস্কারিরা, এমন কি সর্দার পর্যন্ত।
স্তাবুচ একা। সেও পালাতে যাচ্ছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল পালাবার চেষ্টা বৃথা। হুংকার দিতে দিতে অশ্বারোহীরা ছুটে আসছে শিবির লক্ষ্য করে। একেবারে তার সামনে এসে তারা ঘোড়ার রাশ টেনে ধরল। বদখৎ চেহারাতেই তাদের স্বভাব পরিস্ফুট।
দস্যু-সর্দার স্তাবুচকে কি যেন বলল, কিন্তু সে তার কিছুই বুঝতে পারল না। দু’জন দস্যকে স্তাবুচের পাহারায় রেখে বাকিরা শিবিরে ঢুকে সব কিছু লুটপাট করে এসে ঘোড়ার পিঠে চাপাল। তারপর স্তাবুচকে নিরস্ত্র ও বন্দী করে সব কিছু নিয়ে যে দিক থেকে এসেছিল সেই দিকেই ঘোড়া চালিয়ে দিল।
ঘন জঙ্গলের আড়ালে থেকে দুটি তীক্ষ্ণ ধূসর চোখে কিন্তু সব কিছুই দেখল। স্তাবুচরা দুপুরের বিশ্রামের জন্য থামার পর থেকেই সে শিবিরের উপর নজর রেখেছিল। দস্যুরা চলে যেতেই এক লাফে গাছে চড়ে সে দুলতে দুলতে চলল উল্টো পথে অর্থাৎ যে পথে স্তাবুচের লোকেরা পালিয়েছে।
দলের সর্দার গোলোবা সদলে ছুটছে বনের পথ ধরে। কিন্তু যখন দেখল যে দস্যুরা তাদের তাড়া করছে না, তখন সে থামল। এমন সময় গাছের আড়াল থেকে একটি ব্রোঞ্জ-কঠিন সাদা মানুষ পথের সামনে হঠাৎ দেখা দিল। একটুকরো কটিবস্ত্র ছাড়া সে প্রায় নগ্নদেহ। তাকে দেখেই ভয়ে ও বিস্ময়ে সকলে থেমে গেল।
লোকটি নিজের ভাষায় প্রশ্ন করল, তোমাদের সর্দার কে? সকলেরই চোখ ঘুরে গেল গোলোবার দিকে।
নিগ্রো সর্দার বলল, আমি।
তোমার বাওয়ানাকে রেখে চলে এলে কেন?
উত্তর দিতে গিয়েও গোলোবার থেমে গেল। ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, সর্দার গোলোবাকে সে কথা শুধোবার তুমি কে হে?
সাদা লোকটি বলল, আমি অরণ্যরাজ টারজান।
গোলোবা বজ্রাহত। অরণ্যরাজ টারজানকে সে কখনও চোখে দেখে নি, কিন্তু এই বড় বাওয়ানার কীর্তি-কাহিনী সবই শুনেছে। প্রশ্ন করল, তুমি টারজান?
সে মাথা নাড়ল। গোলোবা সভয়ে নতজানু হয়ে বলল, দয়া কর বড় বাওয়ানা! গোলোবা জানত না।
টারজান ধমক দিয়ে উঠল, আমি সব জানি। এবার ভালয় ভালয় ফিরে যাও।
গোলাবা ভয়ে ভয়ে বলল, দস্যুরা যদি আবার তাড়া করে?
করবে না। তারা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। তোমার বাওয়ানাকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে। ভাল কথা। লোকটা কে? এখানে কি করছে?
অনেক দূরে উত্তরের দেশ থেকে সে এসেছে। সে বলে দেশটার নাম রুশা।
টারজান বলল, হ্যাঁ। আমি সে দেশের কথা জানি। সে এখানে এসেছে কেন?
তা জানি না। তবে শিকার করতে আসে নি, কারণ খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া সে শিকার করে না।
সে কি টারজনের কখা কখনও বলেছে?
হ্যাঁ, প্রায়ই বলে। সব গ্রামেই সে টারজনের কথা জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না।
টারজান বলল, ঠিক আছে। তুমি যেতে পার।
মিডিয়ান দেশের উপত্যকার একেবারে নিচে অবস্থিত হ্রদটার দিকে এগিয়ে চলেছে লেডি বারবারা কলিস ধূলি-ধূসরিত পথ ধরে। তার ডানদিকে চলেছে আব্রাহামের ছেলে আব্রাহাম, বাঁদিকে চলেছে স্বর্ণ কেশিনী জেজেবেল। তাদের পিছনে বিষমুখ একটি তরুণীকে ঘিরে এগিয়ে চলেছে শিষ্যের দল। তারও পিছনে সর্দারের নেতৃত্বে চলেছে বাকি গ্রামবাসীরা।
শোভাযাত্রীরা হ্রদের তীরে এসে হাজির হল। এখানকার লোকেরা মনে করে হ্রদটা অতলান্ত। যে জায়গাটায় এসে তারা থামল সেখানে জমাট লাভা-পাথরের কয়েকটা বড় চাই হ্রদের উপর ঝুলে আছে। আব্রাহামের পুত্র আব্রাহাম শিষ্যদের নিয়ে তারই একটা পাথরের উপর বসল। তাদের মাঝখানে সেই তরুণীটি। জিহোবাবের একটিমাত্র ইঙ্গিতে আধা ডজন যুবক এগিয়ে এল। তাদের একজনের হাতে শক্ত সুতোর একটা জাল, অপর দুজনের হাতে একটা ভারী জমাট লাভার চাই। দ্রুতগতিতে তারা ভীত, ত্রস্ত, আর্তনাদকারী তরুণীটির উপর জালটাকে ছড়িয়ে দিয়ে লাভা-পাথরটাকে তার সেঙ্গ বেধে দিল।
আব্রাহামের পুত্র আব্রাহাম মাথার উপর হাত তুলে সংকেত করতেই অন্য সকলে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ল। সে তখন অপরিচিত হযবরল-র মত এমন কতকগুলো শব্দ উচ্চারণ করতে লাগল যেটা মিডিয়ান ভাষা নয়, কোন ভাষাই নয়।
মেয়েটি ততক্ষণে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এলিয়ে পড়েছে। যুবকরা জালটাকে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
সহসা আব্রাহাম পুত্র আব্রাহাম অর্থহীন মন্ত্র ছেড়ে স্থানীয় ভাষায় বলতে লাগল, মেয়েটি পাপ করেছে, তাই তাকে শাস্তি পেতেই হবে। তবে অপার করুণাময় জিহোবার ইচ্ছায় তাকে আগুনে পোড়ানো হবে না, চিন্নেরেথের জলে তাকে তিনবার ডোবানো হবে যাতে শরীর থেকে সব পাপ ধুয়ে যায়।
