বন্দুকবাজ ড্যানি প্যাট্রিক ডেক-চেয়ারে হেলান দিয়ে আরামে শুয়ে আছে। তার পোশাকের মধ্যে নিরাপদে লুকানো আছে ২০ জি, বা বগলের নিচে বিশেষভাবে তৈরি খাপের মধ্যে লুকানো আছে একটা ৪৫। বন্দুকবাজ প্যাট্রিক জানে, বেশ কিছুদিন এটাকে ব্যবহার করতে হবে না, তবু তৈরি থাকা ভল। বন্দুকবাজ শিকাগোর লোক। সেখানে যে সমাজে সে চলাফেলা করে তারা সকলেই তৈরি থাকার। ব্যাপারটায় বিশ্বাসী।
আপাতত জাহাজের ডেক-চেয়ারে বসে সে রোদ পোয়াচ্ছে। একটানা তিন দিনের সমুদ্রযাত্রায় ড্যানি বিরক্ত হয়ে উঠেছে। সহযাত্রীরা কেউ তার সঙ্গে বড় একটা কথাবার্তা বলে না। কেন বলে না তাও সে বুঝতে পারে না।
যাই হোক আজ তৃতীয় দিনে একটি যুবক এসে তার পাশে বসল। তার দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, সুপ্রভাত। আবহাওয়াটা ভারি সুন্দর।
ড্যানি নিরুত্তাপ নীল চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তাই বুঝি? তারপর আবার চোখ ফেরাল তরঙ্গমুখর অসীম সমুদ্রের বুকে।
লাফায়েৎ স্মিথ হেসে একটা বই খুলে চেয়ারে হেলান দিল। ধীরে ধীরে অভব্য প্রতিবেশীটির কথা ভুলেই গেল।
সেদিন বিকেলে ড্যানি যুবকটিকে আবার দেখতে পেল সুইমিং পুলে। একটি জিনিস তাকে মুগ্ধ করল। কি সাঁতারে, কি ডাইভিং-এ, যুবকটি অন্য সকলের চাইতে অনেক বেশি দক্ষ। তার রোদে-পোড়া তামাটে রং দেখেই বুঝল, যুবকটি দীর্ঘ সময় সুইমিং পুলে কাটাতে অভ্যস্ত।
পরদিন সকালে ডেকে এসেই ড্যানি দেখল, যুবকটি তার আগেই এসে চেয়ারে বসে আছে। নিজের চেয়ারে বসে সে বলল, সুপ্রভাত। সকালটা বড় ভাল।
বই থেকে মুখ তুলে যুবকটি বলল, তাই বুঝি? তারপর আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখল।
ড্যানি হেসে বলল, আমার কথাটাই আমাকে ফিরিয়ে দিলে? কি জান, আমি ভেবেছিলাম তুমিও ওই সব উঁচু টুপিওয়ালাদের একজন। কিন্তু কাল তোমাকে পুকুরে দেখেছি। তুমি বেশ ভাল লাফাতে পার।
লাফায়েৎ স্মিথ, এ. এম. পি-এইচ. ডি. এস-সি.,ডি, বইটা কোলের উপর রেখে যুবকটির দিকে তাকাল। মুখে দেখা দিল বন্ধুত্বের হাসি।
প্রমোদ ভ্রমণে চলেছ বুঝি? ড্যানি প্রশ্ন করল।
আশা করি, ভ্রমণটা সুখেরই হবে। তবে এটাকে ব্যবসায়িক ভ্রমণও বলা যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা। আমি একজন ভূ-তত্ত্ববিদ।
ইংল্যান্ডে যাচ্ছ কি?
দিন দুই মাত্র লন্ডনে থাকব, স্মিথ জবাব দিল।
আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি ইংল্যান্ডে যাচ্ছ।
লাফায়েৎ স্মিথ বিব্রত বোধ করল। তারপর হেসে বলল, দেখ, লন্ডন হচ্ছে ইংল্যান্ডের রাজধানী। কাজেই লন্ডনে থাকা মানেই ইংল্যান্ডে থাকা।
ড্যানি চেঁচিয়ে বলল, গী! কি জান, আমি কোনদিন আমেরিকার বাইরে যাইনি।
স্মিথ বলল, আমার তো মনে হয় লন্ডন তোমার ভালই লাগবে।
তারপর ড্যানি পাল্টা প্রশ্ন করল, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
আফ্রিকা।
সেই বাঘ-হরিণ সিংহ-হাতির দেশে যাচ্ছ কেন? শিকারে?
শিকারেই বটে, তবে জন্তু-জানোয়ার নয়, পাথর শিকারে।
গী! পাথর শিকারে কে না যাচ্ছে? তা নিয়ে কত রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটছে।
স্মিথ হেসে বলল, সে পাথর নয়।
তার মানে তুমি হীরের খোঁজে যাচ্ছ না?
না। আমি যাচ্ছি পাহাড়ের গঠন-রীতি জানতে।
সেটা বাজারে বিক্রি করতে পারবে?
না।
কি ভেবে মাথা নাড়তে নাড়তে ড্যানি শুধাল, আচ্ছা, আমি যদি তোমার সঙ্গে যাই তো কি বল মিস্টার?
লাফায়েৎ স্মিথ অবাক হল। এই যুবকটিকে তার ভাল লেগেছে। হয়তো সঙ্গী হিসেবে সে ভালই হবে। আফ্রিকার জঙ্গলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটাতে আর একজন শ্বেতকায় সঙ্গী পেলে সময়টাও ভাল কাটবে। তবু সে ইতস্তত করতে লাগল। এই লোকটি সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। কোন পলাতক আসামীও তো হতে পারে।
তাকে ইতস্তত করতে দেখে ড্যানি বলল, খরচের কথা নিয়ে ভেবো না। আমার খরচটা আমিই দেব।
না, না, খরচ নিয়ে আমি ভাবছি না। কি জান, আমরা কেউ কাউকে জানি না। দুজনের মতের মিল নাও হতে পারে।
ড্যানি এবার জোর দিয়ে বলল, আমি কিন্তু আফ্রিকা যাবই। আর তুমিও যখন যেখানেই যাবে তখন দু’জন একসঙ্গে গেলে ক্ষতি কি? তাতে খরচ কম পড়বে, আর একজন সাদা মানুষের বদলে দু’জন সাদা মানুষ নিশ্চয়ই ভাল। এখন ভেবে বল, আমরা একসঙ্গে যাব না আলাদা-আলাদা?
লাফায়েৎ স্মিথ হো-হো করে হেসে উঠল। বলল, একসঙ্গে।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটল। ট্রেনের ঝক-ঝক। স্টীমারের ধ্ব-ধ্ব। পুরনো পথে অনেক কালো মানুষের পায়ের ছাপ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত সাদা মানুষদের নেতৃত্বে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সাফারি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে ঘেঞ্জি পর্বতমালার অরণ্য-অঞ্চলের দিকে। কেউ কারও খবর রাখে না, কার কি উদ্দেশ্য তাও জানে না।
পশ্চিম দিক থেকে এল লাফায়েৎ স্মিৎ ও বন্দুকবাজ প্যাট্রিক; দক্ষিণ দিক থেকে এল বড় ইংরেজ শিকারী লর্ড পাস্মোর; পূর্ব দিকে থেকে লিওন স্তাবুচ।
ঘেঞ্জি পর্বতমালার সানুদেশের ঢালু জমিতে স্তাবুচরা থেমেছে দুপুরের বিশ্রামের জন্য। তার লোকজনদের মধ্যে কিছুটা গোলমাল চলেছে। একদল কুলি গোল হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। তাদের দেখিয়ে স্তাবুচ সর্দারকে জিজ্ঞাসা করল, ওরা কি করছে?
সর্দার বলল, ওরা ভয় পেয়েছে বাওয়ানা।
জেনেশুনেও স্তাবুচ বলল, কিসের ভয়?
দস্যুর ভয় বাওয়ানা। কাল রাতে ওরা তিনজন পালিয়েছে। আরও পালাবে। সকলেই ভয় পাচ্ছে।
