মহান বাওয়ানা! আমি কাবারিগা-বুঙ্গালো উপজাতির সর্দার। মহান বাওয়ানার কাছে আমি এসেছি আমার লোকজনদের দুঃখ-দুর্দশা মোচনের আশায়।
তোমার লোকজনদের কিসের দুঃখ? কার জন্য দুঃখ? টারজান জানতে চাইল।
কাবারিগা বলল, দীর্ঘকাল ধরে আমরা সকলের সঙ্গে শান্তিতে বাস করছি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোনরকম যুদ্ধ-বিগ্রহ করি না। কিন্তু একদা আবিসিনিয়া থেকে একদল লোক আমাদের দেশে এসে বাসা বেঁধেছে। তারা আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে, আমাদের ফসল, ছাগল ও লোকজনদের চুরি করে নিয়ে যায়, তারপর দূর দেশে সে সব বিক্রি করে দেয়।
কিন্তু তুমি আমার কাছে এসেছ কেন? আমার দেশের সীমানার বাইরে কোন জাতির ব্যাপারে আমি তো হস্তক্ষেপ করি না।
নিগ্রো-সর্দার বলল, মহান বাওয়ানা, আমি তোমার কাছে এসেছি কারণ তুমি একজন সাদা মানুষ, আর যারা আমাদের উপর উৎপীড়ন করছে তাদের সর্দারও একজন সাদা মানুষ। সকলেই জানে, তুমি খারাপ সাদা মানুষদের যম।
টারজান বলল, সে কথা আলাদা। আমি তোমার সঙ্গে তোমাদের দেশে যাব।
এইভাবে নিগ্রো-সর্দার কাবারিগার কাজের ভার চাপিয়ে দিয়ে ভাগ্যদেবী টারজানকে নিয়ে গেল উত্তরের দিকে। তার নিজের লোকেরা জানলও না সে কোথায় গেল, কেন গেল- এমন কি তার একান্ত বন্ধু ছোট্ট নকিমাও জানল না।
অনেক উঁচু একটা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছে আব্রাহামের ছেলে আব্রাহাম। সকলেই দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে মুখ করে। সকলের মুখেই ফুটে উঠেছে বিস্ময়, জিজ্ঞাসা, ভয়। সকলেই কান পেতে শুনছে, ঘন কাল মেঘের আড়াল থেকে ভেসে আসছে এমন একটা বিচিত্র বিপজ্জনক গুঞ্জন-ধ্বনি যা তারা আগে কখনও শোনেনি।
সমবেত নর-নারীর একেবারে পিছনে দাঁড়িয়েছিল একটি কিশোর। হঠাৎ সে মাটিতে পড়ে গোঙাতে লাগল; তার মুখ দিয়ে ফেনা গড়াতে লাগল। একটি নারীও আর্তনাদ করে মূৰ্ছা গেল।
আব্রাহাম প্রার্থনার ভঙ্গীতে বলে উঠল, হে প্রভু, সত্যি যদি তুমি এসে থাক তাহলে তোমার অনুগত জনরা তোমার আশীর্বাদ ও নির্দেশ শুনবার জন্য অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু তুমি যদি আমাদের প্রভু না হও, তাহলেও তোমার কাছে আমাদের প্রার্থনা-তুমি আমাদের সকলকে বিপদ থেকে রক্ষা কর।
এ হয়তো গেব্রিয়েল, লম্বা দাড়িওয়ালা একজন বলল।
একটি নারী কেঁদে বলল, ওই শোন তার শিঙার আওয়াজ-শেষের দিনের শিঙাধ্বনি।
চুপ কর! আব্রাহাম কর্কশ গলায় বলল।
কিশোরটি তখনও মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আরও একজন পড়ে গিয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে লাগল। তারও মুখ দিয়ে ফেনা গড়াতে লাগল।
এবার চারদিকে অনেকেই পড়ে যেতে লাগল। কারও শরীর কাঁপছে। কেউ মূৰ্ছা যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে কারও নজর নেই।
আবার সেই ভয়ঙ্কর শব্দ তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। শব্দটা ক্রমেই বাড়ছে। একেবারে মাথার উপর এসে গেছে। এমন সময়
মেঘের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ভৌতিক মূর্তি একটা প্রকাণ্ড সাদা বস্তু আর তার নিচে এদিক-ওদিক দুলছে একটা ছোট্ট পুতুল। সেটা ধীরে ধীরে নেমে আসছে। তা দেখে আরও ডজনখানেক মানুষ মাটিতে পড়ে গোঙাতে লাগল, তাদের মুখ থেকেও ফেনা গড়াতে লাগল।
প্রায় পাঁচশ’ নর-নারী ও শিশুর চোখের সামনে লেডি বারবারা কলিস ভাসতে ভাসতে নেমে এল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে সকলে নতজানু হয়ে বসে পড়ল।
কী আশ্চর্য, তারা সকলেই সাদা মানুষ! আফ্রিকার বুকের মধ্যে সে নেমেছে একটি সাদা মানুষদের উপনিবেশে। লেডি বারবারা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। মানুষগুলোর দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষ করে তার চোখে পড়ল-সকলেরই বড় বড় নাক আর ছোট থুতনি। নাকটা এত বড় যে মুখটাই কদাকার দেখায়, আর অনেকেরই থুতনি বলে কিছু নেই বললেই চলে।
আরও দুটি পরস্পরবিরোধী জিনিস তার চোখে পড়ল–প্রায় এককুড়ি অপস্মারগ্রস্ত মানুষ মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে, আর একটি স্বর্ণকেশী সুন্দরী উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখ মেলে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
লেডি বারবারা কলিস মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসল। মেয়েটিও হাসল, কিন্তু পরক্ষণেই সভয়ে চারদিকে তাকাল।
লেডি বারবারা শুধাল, আমি কোথায় এসেছি? এটা কোন্ দেশ? এরা সব কারা?
মাথা নেড়ে মেয়েটি শুধাল, তুমি কে? তুমি কি প্রভুর দেবদূত?
এবার বারবারার মাথা নাড়ার পালা। মেয়েটির ভাষা সে কিছুই বুঝতে পারেনি।
সাদা লম্বা দাড়িওয়ালা লোকটি এবার সাহস করে এগিয়ে এসে মেয়েটিকে বলল, চলে যাও জেজেবেল! এই স্বর্গীয় অতিথির সঙ্গে কথা বলার দুঃসাহস তোমার হলো কেমন করে?
মেয়েটি ভয়ে পিছিয়ে গেল। হঠাৎ কি মনে করে সে থেমে গিয়ে লেডি বারবারার দিকে তাকাল। বারবারার ঠোঁটে সেই মিষ্টি হাসি। তা দেখে মেয়েটির সাহস বেড়ে গেল। দুষ্টুমি করে বলল, জান জাবোব, ও বলল যে স্বর্গ থেকে তোমাদের জন্য বার্তা নিয়ে এসেছে, আর সে বার্তা জানাবে শুধু আমার মুখ দিয়ে, আর কাউকে নয়।
সঙ্গে সঙ্গে কথাটা রাষ্ট্র হয়ে গেল। সরল মনে সকলেই কথাটা বিশ্বাস করল। ফলে লেডি বারবারার সঙ্গে জেজেবেলের প্রতিও সকলের শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। তাদের দুজনের একত্রে থাকার সব রকম ব্যবস্থা করে দেয়া হল।
রাতে শুয়ে লেডি বারবারা এখানকার লোকদের লম্বা নাক, ঘোট থুতনি ও অপআর রোগের কথাই ভাবতে লাগল। কিন্তু কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যাই খুঁজে পেল না। পাবেই বা কেমন করে? কেউ তো তাকে বলে নি অ্যাঙ্গাস্টাস ও সুকেশী ক্রীতদাস মেয়েটির প্রাচীন কাহিনী। আসলে এখানকার কেউ জানেই না যে অ্যাঙ্গাস্টাসের ছিল বড় নাক, ছোট থুতুনি ও অপর রোগ। প্রায় উনিশ শতাব্দী আগে যে। ক্রীতদাসী মেয়েটি মারা গেছে তার যে ছিল সুস্থ্য মন ও উজ্জ্বল স্বাস্থ্য যার জন্য আজও এদের মধ্যে জেজেবেলের মত সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী মেয়ে জন্মায় সে কথাও এরা কেউই জানে না।
