এক হাজার আটশ’ পঁয়ষট্টি বছর আগেকার কথা (সঠিক তারিক সম্পর্কে পণ্ডিতরা একমত নয়)। টারসাসের পল রোমে শহিদ হয়েছিল।
দূর অতীতের সেই শোকাবহ ঘটনাটি যে একজন ইংরেজ বিমান-চালিকা ও আমেরিকার একজন ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানের অধ্যাপকের জীবন ও ভাগ্যের উপর এতখানি প্রভাব বিস্তার করবে সেটা আমাদের কাছে আশ্চর্য মনে হলেও ভাগ্যদেবীর কাছে তা নয়। যে ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে আমি বসেছি, প্রায় দু’হাজার বছর ধরে সে তো ধৈর্য সহকারে তারই অপেক্ষা করেছিল।
কিন্তু পল এবং এই দুটি যুবক-যুবতীর মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। সে ইফেসের অ্যাঙ্গাস্টাস। অ্যাঙ্গাস্টাস ছিল ওনেসিফোরাস পরিবারের ছেলে। খেয়ালী ও অপম্মার রোগগ্রস্ত যুবক। টাসাসের পল যখন প্রাচীন আইওনিয়ার ইফেসাস শহরে প্রথম এসেছিল তখন যে সমস্ত লোক নবধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল তাদের অন্যতম ছিল অ্যাঙ্গাস্টাস।
ছেলেবেলা থেকেই সে অপম্মার রোগগ্রস্ত। ধর্মের ব্যাপারেও অত্যধিক উন্মাদনা প্রিয়। যীশুর অন্যতম প্রধান শিষ্যটিকে মর্ত্যে ঈশ্বরের প্রতিনিধিরূপেই পূজা করে। তাই পলের শহিদ হবার সংবাদ তাকে এতই অভিভূত করে যে সে মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলে।
পাছে তার উপরেও অত্যাচার হয় এই ভয়ে সে আলেক্সান্দ্রিয়ার জাহাজ ধরে ইফেসাস থেকে পালিয়ে যায়। ছোট জাহাজটার ডেকের উপর ভয়ার্ত রুগ্ন অবস্থায় কোন রকমে ঢাকাটুকি দিয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় রেখেই তার কথা আমরা শেষ করতে পারতাম। কিন্তু আরও একটা ঘটনা ঘটল। জাহাজটা রোডস দ্বীপে থামলে অ্যাঙ্গাস্টাস সেখানে নেমে পড়ে এবং (ধর্মান্তরের পথেই হোক আর অর্থের বিনিময়েই হোক) সুদূর উত্তর থেকে আগত বর্বর জাতির একটি সুকেশী ক্রীতদাসীকে সগ্রহ করে।
এখানেই আমরা অ্যাঙ্গাস্টাস ও সিজারের কালকে বিদায় জানাই, আর কল্পনা করি, অ্যাঙ্গাস্টাস ও সুকেশী ক্রীতদাসী মেয়েটি আলেক্সান্দ্রিয়া বন্দর থেকে মেসি ও থিবির ভিতর দিয়ে আফ্রিকায় পালিয়ে গেল।
আফ্রিকার সূর্য অস্ত যেতে তখনও ঘণ্টাখানেক বাকি। নিষিদ্ধ ঘেঞ্জি পর্বতমালার রহস্যময় দুরারোহ সুউচ্চ শিখরশ্রেণী ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। পড়ন্ত সূর্যও ঢাকা পড়েছে সে মেঘের আড়ালে।
সেই ঘন মেঘের ভিতর থেকে ভেসে আসছে ভয়াল বিচিত্র ভ্রমণের গুঞ্জণ। ঘেঞ্জি বন্ধুর শিখরগুলোকে ঘিরে ভ্রমরটা পাক খাচ্ছে। শব্দটা কখনও বাড়ছে, কখনও কমছে।
লেডি বারবারা কলিস চিন্তিত হয়ে পড়েছে। পেট্রল ফুরিয়ে আসছে। এই সংকটকালে কম্পাসটাও অকেজো হয়ে পড়েছে। মেঘের ভিতর দিয়ে সে অন্ধের মত উড়ে চলেছে।
জ্বালানি নিঃশেষ হবার মুখে। মেঘের নিচে পাহাড়ের উপর নামবার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। তাই শেষ পথটিই সে বেছে নিল। ক্ষণিক প্রার্থনা সেরে দশ গুণতে গুণতেই প্যারাসুটের দড়িতে টান দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘেঞ্জি পর্বতমালার বহুদূর দক্ষিণে বুঙ্গালো উপজাতির সর্দার কাবারিগা অরণ্যরাজ টারজনের সামনে নতজানু হয়ে বসেছে।
আর মস্কোতে লাল রাশিয়ার ডিক্টেটর স্তালিনের কার্যালয়ে ঢুকল লিওন্ স্তাবুচ।
নিগ্রো সর্দার কাবারিগা, অথবা লিও স্তাবুচ বা লেডি বারবারা কলিসের কথা কিছুমাত্র না জেনেই ফিল শেরিডন মিলিটারি একাডেমির ভূতত্ত্ববিজ্ঞানের অধ্যাপক লাফায়েৎ স্মিথ, এ. এম. পি-এইচ, ডি, এস-সি. ডি. নিউ ইয়র্কের বন্দর থেকে একটি স্টিমশিপে চেপে বসল। মিঃ স্মিথ একজন শান্ত, বিনয়ী, পণ্ডিতদর্শন যুবক। চোখে সিং-এর ফ্রেমের চশমা। তার চোখের কোন দোষ নেই, তবু সে চশমা পরে কারণ তার বিশ্বাস চশমা পরলে তাকে মর্যাদাসম্পন্ন ও বয়স্ক দেখায়। এক বছর হল পশ্চিমের একটা অখ্যাত মিলিটারি একাডেমিতে সে পড়াচ্ছে। সেই সুযোগে জীবনের আর একটি ইচ্ছাকে পূরণ করতে সে আফ্রিকাতে যাচ্ছে সেই অন্ধকার মহাদেশের পাহাড়ের বড় বড় ফাটলের গঠন-রীতি নিয়ে গবেষণা করতে।
নিউ ইয়র্কে সময় যখন মধ্যাহ্নের দু’ঘণ্টা আগে, মস্কোতে তখন সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা বাকি। কাজেই লাফায়েৎ স্মিথ যখন সকালবেলা জাহাজে চাপল, ঠিক সেই সময় পড়ন্ত অপরাহ্নে লিওন, স্তাবুচ রুদ্ধদ্বার কক্ষে স্তালিনের সঙ্গে আলোচনায় রত।
স্তালিন বলল, এই কথা রইল। সব বুঝেছ তো?
স্তাবুচ বলল, সব বুঝেছি। পিটার জাভেরির হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে, আর যে কারণে আফ্রিকায় আমাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে তা দূর করতে হবে।
স্তালিন বলল, শেষেরটাই বেশি দরকারী। একটা গোরিলা-মানব হলেও একটি সুসংগঠিত লাল অভিযানকে সে সম্পূর্ণ পরাভূত করেছে। সে না এসে পড়লে আবিসিনিয়া ও মিশরে অনেক কিছুই ঘটতে পারত। তোমাকে আরও জানিয়ে রাখছি কমরেড, আরও একটা অভিযান আমরা চালাব। তবে তোমার রিপোর্ট হাতে আসার এবং সেই বাধা দূর হবার আগে নয়।
স্তাবুচ বুক ফুলিয়ে বলল, আমি কি কখনও ব্যর্থ হয়েছি।
স্তালিন উঠে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বলল, লাল রাশিয়া OGPU- র কাছে পরাজয় আশা করে না। কথা বলার সময় শুধু তার ঠোঁট দুটি হাসল।
সেই রাতেই লিওন স্তাবুচ মস্কো ত্যাগ করল। ভেবেছিল, সে যাচ্ছে একা গোপনে, কিন্তু রেলের কামরায় তার পাশেই বসেছিল ভাগ্যদেবী।
পায়ের কাছে নতজানু নিগ্রো সর্দারের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে টারজান বলল, উঠে দাঁড়াও! তুমি কে? কেনই বা টারজনের কাছে এসেছ?
