ওবেবে আবার বলল, ডান চোখটা আগে।
সহসা বন্দীর পিঠ ও কাঁধের মাংসপেশীগুলো ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। মুহূর্তের জন্য এত প্রচণ্ড শক্তিতে সে শরীরটা ঝাঁকি দিল যে তার হাতের বাঁধন পট পট করে ছিঁড়ে গেল; মুহূর্ত পরেই তার ইস্পাত-কঠিন আঙ্গুলগুলো ওঝার ডান কব্জির উপর চেপে বসল। জ্বলন্ত দৃষ্টি পড়ল তার চোখের উপর। ওঝার আঙ্গুলগুলো অসাড় হেয় এল; জ্বলন্ত শিকটা হাত থেকে পড়ে গেল।
ওবেবে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সকলেই যার যার বাড়ির দিকে ছুট দিল। তা। দেখে ওবেবেও পালিয়ে গেল।
তখন জল-পিশাচ দুই হাতে খামিসকে ধরে মাথার উপর তুলে সর্দার ওবেবের পিছনে ধাওয়া করল। ওবেবে তার আগেই নিজের ঘরে ঢুকে গেল। আর তাকে শেষ করে দিতে জল-পিশাচও এক লাফে ঘরের চালে উঠে চাল ভেঙ্গে নিচে নেমে গেল।
একটা দেহ তার উপর নেমে আসায় সর্দার ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু সেই মুহূর্তে আতংকের চাইতেও আত্মরক্ষার তাগিদটা ওবেবের কাছে বড় হয়ে উঠল। কোমর থেকে ছুরিটা টেনে নিয়ে বার বার। বসিয়ে দিল জল-পিশাচের দেহে। যখন বুঝতে পারল যে তার ইহলীলা সাঙ্গ হয়েছে তখন তাকে টানতে টানতে বাইরের চাঁদ ও আগুনের আলোয় নিয়ে এসে ওবেবে চীৎকার করে বলতে লাগল, ফিরে এস ভাই সব ফিরে এস; ভয়ের কিছুই নেই, কারণ আমি তোমাদের সর্দার ওবেবে নিজের হাতে জল-পিশাচটাকে। হত্যা করেছি।
বলতে বলতে পিছনের মৃতদেহটাকে ভাল করে দেখেই ওবেবে আঁতকে উঠে পথের ধূলোর উপরেই বসে পড়ল। যাকে সে টেনে এনেছে সেটা ওঝা খামিসের দেহ।
লোকজনরা এগিয়ে এসে সবই দেখল; কোন কথা বলল না; সকলেই ভয় পেয়েছে। কয়েকটি সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে ওবেবে ঘরের ভিতরে ও বাইরে অনেক খুঁজল। লোকটি চলে গেছে। ফটক পর্যন্ত গেল। ফটক বন্ধ। কিন্তু ফটকের সামনের ধূলোয় খালি পায়ের ছাপ রয়েছে একটি সাদা মানুষের খালি পায়ের ছাপ।
ওবেবে ঘরে ফিরে এল। ভয়ার্ত লোকগুলো তার জন্যই অপেক্ষা করে আছে।
সে বলল, ওবেবের কথাই ঠিক। লোকটা জল-পিশাচ নয়- অরণ্যরাজ টারজান, কারণ একমাত্র সেই পারে খামিসকে অতটা উঁচুতে তুলে ধরে ঘরের চালের উপর ছুঁড়ে দিতে, আর একমাত্র সেই পারে। কোনরকম সাহায্য ছাড়া আমাদের ফটক ডিঙিয়ে যেতে।
এল সেই দশম দিনটি। অস্ত্রোপচারের ফলাফল জানতে বড় সার্জনটি এখনও গ্রেস্টোকের বাংলোতেই অপেক্ষা করছে।
সার্জন বলল, লর্ড গ্রেস্টোক এবার তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে উঠবেন। অনেক কথাই তাকে বলে দিতে হবে। জ্ঞান হবার পরেও তিনি নিজেকেই চিনতে পারেননি; কিন্তু এ রকম পরিস্থিতিতে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আশ্চর্য চোখে চারদিকে তাকিয়ে রোগী ঘরের মধ্যে কয়েক পা হাঁটল।
সার্জন বলল, ইনি আপনার স্ত্রী গ্রেস্টোক।
লেডি গ্রেস্টোক দুই হাত বাড়িয়ে স্বামীর দিকে এগিয়ে গেল। অশক্ত রোগীর মুখে ঈষৎ হাসি খেলে গেল; সেও দুই পা বাড়িয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরল। সহসা কে যেন তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। ফ্লোরা হকেস।
সে বলে উঠল, হা ঈশ্বর, লেডি গ্রেস্টোক! এ আপনার স্বামী নয়। এতো মিরান্ডা, এস্টেবান মিরান্ডা! আপনি কি মনে করেন, লক্ষ লোকের মধ্যেও আমি ওকে চিনতে পারব না? এখানে আসার পর থেকে আমি তাকে একবারও দেখিনি। রোগীর ঘরেই তো যাইনি, কিন্তু সে এ ঘরে ঢোকামাত্রই আমার মনে। সন্দেহ জেগেছে। মুখের হাসি দেখেই আমি তাকে চিনতে পেরেছি।
বিহ্বল স্ত্রী চীৎকার করে বলল, ফ্লোরা! তুমি ঠিক চিনেছ? না! না! নিশ্চয় তোমার ভুল হয়েছে! স্বামীকে ফিরিয়ে দিয়ে আবার নিয়ে যাবার জন্য ঈশ্বর নিশ্চয় তাকে আমার কাছে এনে দেয়নি। জন! বল, সত্যি কে তুমি? তুমি নিশ্চয় আমাকে মিথ্যা বলবে না।
মুহূর্তের জন্য লোকটি চুপ করে রইল। যেন দুর্বলতাবশতই এদিক-ওদিক দুলতে লাগল। সার্জন এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।
লোকটি বলল, আমি খুবই অসুস্থ। হয়তো আমি বদলে গেছি, কিন্তু আমিই লর্ড গ্রেস্টোক। কিন্তু এই নারীকে তো আমি স্মরণ করতে পারছি না। সে ফ্লোরা হকেসকে আঙুল দিয়ে দেখাল।
মিথ্যা কথা! মেয়েটি কেঁদে ফেলল।
হ্যাঁ, কথাটা মিথ্যা, একটি শান্ত কণ্ঠস্বর পিছন থেকে বলে উঠল। সকলে ঘুরে দাঁড়াল। বারান্দায় যাবার ফরাসী দরজায় দাঁড়িয়ে আছে একটি দৈত্যাকার শ্বেতকায় মূর্তি।
তার দিকে ছুটতে ছুটতে লেডি গ্রেস্টোক চীৎকার করে বলে উঠল, জন! কী করে এত বড় ভুল আমি করলাম? আমি
বাকি কথা আর বলা হল না; অরণ্যরাজ টারজান এক লাফে ঘরের ভিতরে ঢুকে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরল।
বিজয়ী টারজান (টারজান ট্রায়াম্ফ্যান্ট)
জীবন যদি হয় বুটিদার বস্ত্র তাহলে সময় তার টানা। সময় চিরন্তন, স্থির, অপরিবর্তনীয়। সুদক্ষ শিল্পী ভাগ্যদেবী তার পোড়েন সংগ্রহ করে পৃথিবীর চার কোণ ও অষ্টবিংশতি সমুদ্র থেকে, আকাশ থেকে আর মানুষের মন থেকে। তারপর যে নক্সা সে ফুটিয়ে তুলতে থাকে তা কোন দিন শেষ হয় না।
একটা সুতো এখান থেকে, একটা ওখান থেকে আর একটা সুতো আসে সুদূর অতীত থেকে যে অতীত দীর্ঘকাল অপেক্ষা করে আছে সঙ্গী সুতোটির জন্য যাকে না পেলে ছবিটি সম্পূর্ণ হবে না।
কিন্তু ভাগ্যদেবী বড়ই ধৈর্যশীলা। যে বুটিদার বস্ত্রটি সে তৈরি করতে চায়, যে অনাদি ও অনন্ত নক্সাটি সে ফুটিয়ে তুলতে চায়, তার জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় দুটি সুতোর মিলন ঘটানোর জন্য সে একশ’ বছর, হাজার বছর অপেক্ষা করে থাকে।
