লোকটি মাথাটা একটু তুলতেই তার মুখটা ভাল করে দেখতে পেয়ে উসুলা আতংকে চীৎকার করে উঠল। এ যে বড় বাওয়ানা।
ছুটে গিয়ে উসুলা তাকে হাঁটুর উপর তুলে নিল। কিন্তু লোকটি সমানে হাসতে লাগল, আর শিশুর মত বক্ বক্ করে চলল। পাশেই মোষটার শিং-এর সঙ্গে ঝুলছে বড় বাওয়ানার হীরে বসানো সোনার লকেটটা। উসুলা আবার সেটাকে বড় বাওয়ানার গলায় পড়িয়ে দিল। কাছাকাছি তার জন্য একটা ভাল কুটির বানিয়ে দিল; শিকার করে তার খাবার এনে দিল; গায়ের জোর ফিরে না আসা পর্যন্ত তার কাছেই। রয়ে গেল। গায়ের জোর ফিরে এলেও তার মনের জোর কিন্তু ফিরল না। সেই অবস্থাতেই উসুলা মনিবকে বাড়ি নিয়ে গেল।
তার সারা দেহে ও মাথায় অনেক আঘাত ও ক্ষত। যে মানুষটি একদিন ছিল অরণ্যরাজ টারজান আজ সেই ছোট্ট মানুষটিকে সারিয়ে তুলবার জন্য ইংল্যান্ড থেকে একজন বড় সার্জনকে আফ্রিকায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হল।
যে কুকুরের দল একদিন লর্ড গ্রেস্টোককে ভালবাসত আজ তারা এই জড়বুদ্ধি লোকটিকে দেখে দূরে সরে যায়। তাকে যখন হুইলচেয়ারে বসিয়ে সোনালী সিংহ জাদ্-বাল-জার খাঁচার কাছে নিয়ে যাওয়া হয় তখন সেটাও তাকে দেখে গর্জন করতে থাকে।
ছেলে কোরাক অসহায়ভাবে মেঝেতে পায়চারি করে। মা ইংল্যান্ড থেকে রওনা হয়েছে। এখানে পৌঁছে বাবার এই অবস্থা দেখে তার যে কি প্রতিক্রিয়া হবে সে কথা ভাবতেও সে ভয়ে শিউরে ওঠে।
জল-পিশাচটা যেদিন নর-খাদক ওবেবের গ্রাম থেকে তার মেয়ে উহ্হাকে চুরি করে পালিয়েছে সেই দিন থেকেই ওঝা খামিস তাকে নিরন্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে। অনেক দূর-দূর গ্রামেও গেছে; কিন্তু মেয়েকে বা তার অপহরকারীকে খুঁজে পায়নি।
তেমনি একটা ব্যর্থ অনুসন্ধানের পরে খামিস দেশে ফিরে চলেছে। সবে সকাল হয়েছে। শিবির তুলে নতুন করে যাত্রা শুরু করতেই ডান দিকে শ’খানের গজ দূরে একটা খোলা জায়গায় কিছু একটাকে পড়ে থাকতে দেখল। নিচু ঘাসের উপরে বেরিয়ে আছে মানুষের একটা হাঁটু। আরও কাছে এগিয়ে যেতেই বিস্ময়ের একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল তার ঠোঁট থেকে জল-পিশাচের দেহটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে; একটা হাঁটু ভেঙে রয়েছে- সেটাই সে দেখতে পেয়েছে ঘাসের উপরে।
জল-পিশাচ কি মৃত, না ঘুমিয়ে আছে? হাতের বর্শাটাকে খামিস তার বুকে ছোঁয়াল। জল-পিশাচ জাগল না। ও তাহলে ঘুমিয়ে নেই! আবার মৃত বলেও মনে হচ্ছে না। খামিস হাঁটু ভেঙ্গে বসে তার বুকে কান রাখল। সে মরে নি!
এই পিশাচ তার মেয়েকে চুরি করেছে। খামিস ক্রোধে জ্বলে উঠল।
কোমরে জড়ানো শক্ত দড়িটা খুলে নিয়ে পিশাচের হাতে দুটোকে পিঠ-মোড়া করে বেঁধে অপেক্ষা করতে লাগল। ঘণ্টাখানেক পরে জ্ঞান ফিরে এলে জল-পিশাচ চোখ মেলে তাকাল।
ওঝা বলল, আমার মেয়ে উহ্হা কোথায়?
জল-পিশাচ হাতের বাঁধন খুলতে চেষ্টা করল, পারল না। খামিসের প্রশ্নের কোন জবাব দিল না। চুপচাপ শুয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে আবার চোখ মেলল।
হাতের বর্শা দিয়ে খোঁচা মেরে ওঝা হুকুম করল, উঠে দাঁড়াও!
জল-পিশাচ পাশ ফিরে হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠ দাঁড়াল। খামিস বর্শা উঁচিয়ে পথ দেখিয়ে দিল। সন্ধ্যা নাগাদ তারা পৌঁছে গেল ওবেবের গ্রামে।
যে কুঁড়ে ঘর থেকে জল-পিশাচ একদিন পালিয়েছিল খামিস তাকে সেই ঘরেই ঠেলে দিল। অনেক বর্শা ও প্রশ্নের খোঁচা খেয়েও জল-পিশাচ একটা কথাও বলল না। তাকে দেখতে এসে ওবেবেও অনেক প্রশ্ন করল; কিন্তু জল-পিশাচ শুধু হা করে তাকিয়ে রইল, কোন কথাই বলল না।
ওঝা উঠে এসে আবার প্রশ্ন করল। জবাব পেল না। প্রচণ্ড রাগে সে জল-পিশাচের মুখে একটা ঘুষি মারল। নিচু হয়ে একটা গরম শিক তুলে নিয়ে বলল, এবার আমার প্রশ্নের জবাব ঠিকই দেবে!
ওবেবে কর্কশ গলায় বলল, আগে ডান চোখটা!
ডাক্তার এল টারজনের বাংলোতে-লেডি গ্রেস্টোকই সঙ্গে করে নিয়ে এল। লন্ডনের খ্যতনামা সার্জন। সার্জন ও লেডি গ্রেস্টোক সঙ্গে সঙ্গে টারজনের ঘরে গেল। জোড়াতালি দিয়ে তৈরি হুইলচেয়ারে টারজান বসেছিল। অর্থহীন দৃষ্টিতে সে তাদের দিকে তাকালাম।
তুমি আমাকে চিনতে পারছ না জন? লেডি বলল।
ছেলে এসে তাকে বাইরে নিয়ে গেল। মা তখন কাঁদছে।
ছেলে বলল, বাবা আমাদের কাউকেই চিনতে পারছে না মা। অস্ত্রোপচারের আগে তুমি আর বাবার সঙ্গে দেখা করো না। এ অবস্থায় ওকে দেখলে তোমার কেবল কষ্টই বাড়বে।
সার্জন তাকে পরীক্ষা করল। মাথার খুলিতে আঘাত লাগায় মস্তিষ্কের উপর একটা চাপ পড়েছে। অস্ত্রোপচারের ফলে সেই চাপটা চলে গেলে রোগীর মানসিক ভারসাম্য ও স্মৃতিশক্তি ফিরে আসতে পারে। কাজেই অস্ত্রোপচার করাই সঙ্গত।
পরের দিনই কয়েকজন নার্স ও দু’জন ডাক্তার এল নাইরোবি থেকে। সকালেই অস্ত্রোপচার করা হল।
ঘণ্টাখানেক পরেই দরজা খুলে সার্জন তাদের ঘরে ঢুকল।
সার্জন বলল, এখনই আপনাদের কিছু বলতে পারছি না। শুধু এইটুকু বলতে পারি যে অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। আমি নির্দেশ দিয়েছি, দশ দিন পর্যন্ত নার্স ছাড়া আর কেউ লর্ডের ঘরে ঢুকতে পারবে না। ওষুধ খাইয়ে তাকে আমি দশ দিনের জন্য আধা-অজ্ঞান অবস্থায় রেখে গেলাম। লেডি গ্রেস্টোক, ততদিন আমরা শুধু আশাই করতে পারি।
ওঝার বাঁ হাত জল-পিশাচের কাঁধে; তার ডান হাতে দগদগে লাল লোহার শিক।
