যাই হোক, রাজা তাকেও সিংহাসনের কাছে ডেকে নিয়ে জারটল বা যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করল, উপযুক্ত যান-বাহন ও অর্থ দিল, বাসস্থানের ব্যবস্থা করল, আর অনুরোধ জানাল, সে যেন তাদের মধ্যেই। স্থায়ীভাবে বসবাস করে।
তখন কোমোডোফ্লোরেন্সল টালাস্কারকে সিংহাসনের নিচে নিয়ে বলল, মহান এডেস্রোহাখিস, এবার আমার নিজের জন্য একটি বর চাইছি। জার্টালোস্টো হিসেবে অন্য শহর থেকে লুট করে আনা কোন রাজকন্যাকে বিয়ে করতে আমি প্রথাবদ্ধ; কিন্তু ক্রীতদাসী মেয়েটির মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছি আমার প্রেয়সীকে। তাই সিংহাসনের দাবী ছেড়ে দিয়ে তার বিনিময়ে এই মেয়েটিকে গ্রহণ করার অনুমতি আমাকে দেয়া হোক।
রাজা তখন সিংহাসনের সোপান বেয়ে নিচে নেমে এসে জাজারার হাত ধরে তাকে নিয়ে সিংহাসনের পাশে বসিয়ে দিল।
বলল, কেবলমাত্র প্রথামতেই তুমি কোন রাজকন্যাকে বিয়ে করতে বাধ্য; কিন্তু প্রথা তো বিধান নয়। ট্রোহানাডালমেকাসের একজন অধিবাসী যাকে ইচ্ছা তাকেই বিয়ে করতে পারে।
টালাস্কার বলল, সে যদি বিধান অনুসারে কোন রাজকন্যাকেই বিয়ে করতে বাধ্য হত তাহলেও সে আমাকে বিয়ে করতে পারত, কারণ আমি মান্ডালামেকাসের রাজা টালাখাগোর মেয়ে। ভেল্টোপিসমেকাসের লোকেরা আমার মাকে বন্দিনী করে নিয়ে এসেছিল আমার জন্মের মাত্র কয়েক চাঁদ–আগে। মা আমাকে বলে গিয়েছিল, কোন রাজপুত্র ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করার আগে আমি যেন আত্মহত্যা করি; কিন্তু কোমোডোফ্লোরেন্সল যদি কোন ক্রীদতাসের পুত্র হত তাহলে মায়ের সে নির্দেশ আমি লঙ্ঘন করতাম। ভেল্টোপিস্মেকাস ছেড়ে আসার রাত পর্যন্ত আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে সে রাজপুত্র; কিন্তু তখন তো আমার মন-প্রাণ সবই তাকে সঁপে দিয়েছি, যদিও সে কথা সে মোটেই জানত না।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল, কিন্তু টারজনের দেহের কোন পরিবর্তন হল না। মিনুদিনদের মধ্যে বেশ সুখেই তার দিন কাটছিল; তবু দেশের জন্য তার মন কেঁদে উঠল; সে স্থির করল, এই চেহারা নিয়েই নিম্নসংকুল স্বদেশের পথে যাত্রা করবে।
বন্ধুরা তাকে বাধা দিল, কিন্তু টারজান কৃত-সংকল্প অকারণে আর বিলম্ব না করে সে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে যাত্রা করল। এক হাজার হরিণ-আরোহী সৈন্যের এক কামাক সেনাদল মহা অরণ্য পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিল।
ছোট ছোট পশু, পাখি ও ডিম খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করে গাছের ডালে শুয়ে সে রাত কাটাল। দ্বিতীয় রাতেই একটা বমির ভাব হওয়াতে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। একটা আসন্ন বিপদের আশংকা তাকে পেয়ে বসল। হঠাৎ তার মনে হল, হয়তো স্বাভাবিক দেহ ফিরে পাবার এটা পূর্ব লক্ষণ। অজ্ঞান হয়ে যাবার আগে যে রকম হয়ে থাকে সেই রকম তারও মাথার ভিতরটা ঝিমঝিম করতে লাগল। গাছের উপর থেকে নিচে নামবার মত জোরও যেন পাচ্ছে না। হাঁটু কাঁপছে। কোন রকমে নিচে নেমে একটা চড়াই বেয়ে উঠতে লাগল। হঠাৎ একটা তাজা বাতাসের ঝাঁপটা এসে নাকে লাগল। সে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। সে বন পার হয়েছে। এবার সে মুক্ত!
পিছন থেকে একটা গর্জন কানে এল। তলোয়ার হাতে নিয়ে সে কাটা-বনের মধ্যে ঢুকে গেল। কত দূর গেল বা কোন্ দিকে গেল কিছুই বুঝতে পারল না। তখনও ঘন অন্ধকারে চারদিক ঢাকা। হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়েই সে জ্ঞান হারাল।
নর-খাদক ওবেবের গ্রাম থেকে ফিরবার পথে জনৈক ওয়াজিরি পথের পাশে একটা কংকাল দেখতে পেল। সেটা কোন বিশেষ ঘটনা নয়। আফ্রিকার জনপথে এ রকম অনেক কংকাল পড়ে থাকে। কিন্তু এ কংকালটা দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু ওবেবের গ্রামের অনেক অদ্ভুত কাহিনী শুনেই উসুলা তার প্রিয় মনিবের খোঁজে এ দেশে এসেছিল। ওবেবে কখনও টারজানকে দেখেনি বা তার কথাও শোনেনি। এ কথা সে বার বার উসুলাকে বলেছে; কিন্তু ওখানকার অন্য অনেকের মুখ থেকে সে শুনেছে যে এক বছর বা তারও বেশি সময় ওবেবে একটি সাদা মানুষকে বন্দী করে রেখে ছিল, আর কিছু দিন আগে সে পালিয়ে গেছে। প্রথমে উসুলা সেই সাদা লোকটিকেই টারজান বলে ধরে নিয়েছিল, কিন্তু সে লোকটি বন্দী হওয়ার সময়-কালটা বিবেচনা করে সে বুঝতে পেরেছে যে সে লোক টারজান হতে পারে না; তাই সে দেশে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু পথের পাশে একটি শিশুর কংকাল দেখেই তার মনে পড়ে গেল উহহার নিরুদ্দেশ হবার কথা। সে থমকে দাঁড়াল। ভাল করে লক্ষ্য করতে আরও একটা জিনিস সে দেখতে ফেল-পথ থেকে কয়েক ফুট দূরে আরও কয়েকটা কংকালের মধ্যে পড়ে আছে একটা ছোট চামড়ার থলে। উসুলা নিচু হয়ে সেটা তুলে নিয়ে ভিতরকার জিনিসগুলো হাতের উপরেই ঢেলে ফেলল। দেখেই বুঝতে পারল জিনিসগুলো তার মনিবের। অনেক চাঁদ আগে সাদা মানুষরা বড় বাওয়ানার এই সব হিরে চুরি করেছিল। এগুলো সে তার মনিব-পত্নীকে ফিরিয়ে দেবে।
তিনদিন পরে বৃহৎ কণ্টক বনের কাছকাছি পথ ধরে নিঃশব্দে চলতে চলতে হঠাৎ সে থেমে গেল; দৃঢ় মুষ্টিতে চেপে ধরল হাতের বর্শাটা। একটি ছোট খোলা জায়গায় প্রায় উলফঙ্গ একটি লোক মাটিতে পড়ে আছে। লোকটি জীবিত-নাড়াচড়া করছে। কিন্তু সে কি করছে। উসুলা নিঃশব্দে আরও কাছে এগিয়ে গেল। কি বীভৎস দৃশ্য! একটি মোষের পচা-গলা মৃতদেহের পাশে শুয়ে সাদা মানুষটি সাগ্রহে মোষের হাড় থেকে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
