টারজান ঈষৎ হেসে জানালা বেয়ে নিচে নেমে গেল; এক হাতে ছুঁচলো শিকের অন্ত্র, অন্য হাতে ঝুলছে গোবরাট থেকে।
একটার পর একটা শিক ধরে ঝুলতে ঝুলতে টারজান অন্ধকার সুড়ঙ্গ-পথে নামতে লাগল। এক সময় ঠিক নিচু তলায় জানালার গোবরাটটা পেয়েও গেল পায়ের নিচে। সেখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বারকয়েক নিঃশ্বাস টেনে খুব নিচু করে একটা শিস দিল। সঙ্গে সঙ্গে লোহার সিঁড়িটা নড়ে উঠল। কিছুক্ষণ পরে সেও টারজনের পাশে এসে দাঁড়াল। ফিফিস্ করে বলল, আরে! আমরা যে অসাধ্য সাধন করেছি! এবার মনে হচ্ছে, আমাদের পলায়নটা একেবারে অসম্ভব নাও হতে পারে।
টারজান বলল, ধীরে, বন্ধু, ধীরে; এখনও অনেক পথ বাকি। টালাস্কারের দেখা এখনও পাইনি। চলে এস।
হাতের শিক বাগিয়ে ধরে তারা পাশের ঘরটাতে ঢুকল। কোমোডোফ্লোরেন্সল চারদিকে তাকিয়ে বলল, আমদের ভাগ্য ভাল বন্ধু যে কোন রক্ষী নেই।
তার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই বিপরীত দিকের দরজাটা সপাটে খুলে দুটি সৈনিক ঘরে ঢুকল। চারদিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা এখানে কি করছ ক্রীতদাসরা?
শ-শ-শ! ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে টারজান বলল, দরজাটা বন্ধ করে দাও। কেউ শুনতে পাবে।
একটি সৈনিক বলল, কি শুনতে পাবে?
এক লাফে তাদের পেরিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল টারজান; লোহার শিকটা উদ্যত করে বলল, শুনতে পাবে যে তোমরা আমাদের বন্দী।
সঙ্গে সঙ্গে দুই বন্ধু একযোগে আক্রমণ করল দুই সৈনিককে। দু’জনের হাতের লোহার শিকের আঘাতে দুই সৈনিকেরই মৃত্যু হল।
টারজান বলল, প্রথম কর্তব্য এই দুই সৈনিকের সঙ্গে পোশাক বিনিময় করা। বলতে বলতেই গায়ের সবুজ জামাটা খুলে ফেলল।
তারপর একটা মৃতদেহকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে টারজান পাশের ঘরে গেল এবং জানাল দিয়ে। সেটাকে সুড়ঙ্গ-পথে নিচে ফেলে দিল। তার নির্দেশমত কোমোডোফ্লোরেন্সল অপর মৃতদেহটি নিয়ে অনুরূপভাবে নিচে ফেলে দিল।
টারজান বলল, মৃতদেহ দুটোকে ভাল করে পরীক্ষা না করলে সকলেই মনে করবে পালাবার চেষ্টা করে আমরা দুজনই মারা গেছি। বলতে বলতে যে হুক-করা শিকের মই বেয়ে তারা নেমেছে তারই দুটো খুলে নিয়ে টারজান সে দুটোকেও মৃতদেহের কাছে ছুঁড়ে ফেলে দিল। মুখে বলল, এর ফলে কথাটা আরও সহজেই সকলের মাথায় আসবে।
নতুন সাজে সেজে দু’জন বারান্দায় বেরিয়ে এল। একটার পর একটা তলা পার হয়ে নিচে নামতে লাগল। বারান্দায় বা সিঁড়িতে খুব অল্প লোকই চলাচল করছে। সৈনিকের পোশাক পরা লোক দুটির দিকে তারা কেউই বিশেষ মনোযোগ দিল না। যে যার কাজে চলে গেল।
নামতে নামতে একটা ফাঁকা জনহীন ঘর পেয়ে সেখানেই তারা রাতটা কাটিয়ে দিল। ঘুম ভেঙে উঠে আবার যখন হাঁটতে শুরু করল তখন সবগুলো বারান্দাতেই লোকের ভিড় বেড়ে গেছে।
একেবারে শেষ তলায় বারান্দায় পৌঁছতেই দেখতে পেল সুড়ঙ্গ-পথের নিচেকার চত্বরে অনেক মানুষের ভিড়। যারা ভিড়ের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে তারা ঘাড় উঁচু করে কি যেন দেখার চেষ্টা করছে। সকলেই নানা রকম প্রশ্ন করছে, কিন্তু কেউই কোন জবাব দিচ্ছে না।
একটু একটু করে টারজান আর কোমোডোফ্লোরেন্সলও ভিড়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। দুই কনুই দিয়ে ভিড় সরিয়ে একটি লোক বেরিয়ে আসতেই সকলে তার কাছে ব্যাপারটা জানতে চাইল। লোকটি তখন জানাল, পালিয়ে যাবার চেষ্টার ফলে দুটি ক্রীতদাস ওখানে মরে পড়ে আছে। বলল, গম্বুজ-প্রাসাদের একেবারে উপরের তলায় জোয়ান্থ্রাহাগোর ক্রীতদাসদের ঘরে তাদের আটক করে রাখা হয়েছিল। কোন। রকম জোড়াতালি দিয়ে একটা মই বানিয়ে সুড়ঙ্গ-পথে নিচে নামতে গিয়ে মইটা ভেঙ্গে নিচে পড়ে গেছে। দু’জনের শরীরই এমন ভাবে দুমড়ে ভেঙ্গে গেছে যে তাদের চেনাই শক্ত। এখন লাশ দুটোকে বাইরে নিয়ে জন্তুদের মুখে ফেলে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আর দেরী না করে টারজান ও তার সঙ্গী ভিড়ের সঙ্গে মিশে ফটকের দিকে এগিয়ে গেল।
বাইরের খোলা রোদে দাঁড়িয়ে কোমোডোফ্লোরেন্সল জানতে চাইল এবার কোন্ দিকে যাওয়া হবে?
টারজান তাকে স্মরণ করিয়ে দিল, টালাস্কারের খোঁজে যেতে হবে; তাকে আমি কথা দিয়েছি।
দিনের পর দিন যায়। টারজান বাড়ি ফেরে না। তার ছেলে ক্রমেই শংকিত হয়ে উঠেছে। আশপাশের গ্রামে লোক পাঠিয়েছে। কোন খবর নেই।
শেষ পর্যন্ত একটা গুতি ও কিছু আদিম অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে বিশেষ দ্রুতগামী সাহসী ওয়াজিরিকে সঙ্গী করে কোরাক নিজেই বেরিয়ে পড়ল বাবার খোঁজে। অনেক দিন ধরে অনেক পরিশ্রম করে প্রতিটি জঙ্গলে ও বনভূমি তারা চষে ফেলল কিন্তু বাবার কোন খোঁজই পেল না।
তিনজন যাত্রী তিনদিন ধরে একটানা পূর্বের দিকে হাঁটল, চতুর্থ দিনে মোড় নিল দক্ষিণ দিকে। দূর দক্ষিণ দিগন্তে দেখা দিল একটা মহা অরণ্য। দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে ট্রোহানাডামেকাস; এখনও দু’দিনের পথ।
দু’দিন পরে তারা ট্রোহানাডামেকাসের রাজপ্রাসাদের অদূরে পৌঁছ গেল। দূর থেকেই শাস্ত্রীরা তাদের দেখতে পেল; সঙ্গে সঙ্গে একদল সৈন্য ছুটে গেল তাদের খোঁজ-খবর নিতে। যুবরাজ ও টারজানকে দেখেই তারা উল্লাসে ফেটে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে যাওয়া হল এডেম্রোহাখিসের দরবার-কক্ষে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাজা আনন্দে কেঁদেই ফেলল। টারজানকেও সে ভোলে নি; যদিও প্রায় তাদের সমান উঁচু এই মানুষটিই যে সেই দৈত্যাকার টারজান একথা বুঝতে সকলেরই বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল।
