মুহূর্তের জন্য থেমে বলল, সাদা মেয়েটি কোথায়? তাকেও সঙ্গে নিতে হবে।
বুড়ো টাইমার জবাব দিল, সে এখানে নেই; একজন সর্দার তাকে চুরি করেছে; মনে হয়, ভাটির দিকে তাকে গ্রামে নিয়ে গেছে।
তাহলে এই দিকে এস। টারজান তীরের মত বাঁ দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
দু’জন ছুটে চলল নদীর দিকে। সেখানে পৌঁছে ডোঙ্গাটা দেখিয়ে বলল, চড়ে বস। এখানে একটা ডোঙ্গাই আছে। কেউ তোমার পিছু নিতে পারবে না।
তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে না?
না। ডোঙ্গাটাকে ঠেলে দিয়ে প্রশ্ন করল, যে সর্দার মেয়েটিকে চুরি করেছে তার নাম জান?
তার নাম বোবোলো। ডোঙ্গা জলে ভাসিয়ে বুড়ো টাইমার আরও বলল, তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে পারলাম না; ইংরেজি ভাষায় সে রকম কোন শব্দ নেই।
নীরব মূর্তিটি কোন কথা বলল না। স্রোতের টানে ডোঙ্গা ভেসে চলল। বুড়ো টাইমার বৈঠা তুলে নিল হাতে। সাধ্যমত গতি বাড়াতে হবে।
ওরান্ডোর সৈনিকরা তাঁবুতে বসে আগুন পোয়াচ্ছে। তাদের পেট ভরা, তাই তারা খুশি। কাল দেশে ফিরে যাবে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে বিজয়ীর সম্বর্ধনা।
এমন সময় একটি দৈত্যাকার মূর্তি যেন বাতাস থেকে নেম এল তাদের সামনে। সকলেই তাকে চিনল। অরণ্যরাজ টারজান। কাঁধে হাত-পা বাঁধা একটা লোক।
কয়েকজন বলে উঠল, অরণ্যরাজ টারজান!
কেউ বলল, মুজিমো!
ওরান্ডো বলল, কাকে নিয়ে এসেছ?
লোকটাকে মাটিতে ফেলে টারজান বলল, তোমাদের ওঝাকে ফিরিয়ে এনেছি। ফিরিয়ে এনেছি সোবিটোকেসে যে চিতা-দেবতার একজন সন্ন্যাসী।
মিথ্যা কথা! সোবিটো আর্তনাদ করে উঠল।
টারজান বলল, চিতা-মানুষদের মন্দিরে আমি ওকে পেয়েছি। ভাবলাম, তোমরা হয়তো তোমাদের ওঝাকে ফিরে পেতেই চাও যাতে খুব কড়া ওষুধ বানিয়ে চিতা-মানুষদের হাত থেকে সে তোমাদের রক্ষা করতে পারে।
একজন সৈনিক গর্জে উঠল, ওকে খুন কর!
সোবিটোকে খুন কর! খুন কর! চার-কুড়ি কণ্ঠ একসঙ্গে গর্জে উঠল।
টারজান বলল, তোমাদের যা ইচ্ছা হয় তাই কর। সে তো আমার ওঝা নয়। আমার অন্য কাজ আছে। আমি চলি। যদি আর দেখা না পাও তবু টারজানকে মনে রেখো; তার জন্যই সাদা মানুষদের প্রতি সদয় ব্যবহার করো, কারণ টারজান তোমাদের বন্ধু, আর তোমরা তার বন্ধু।
যেমন নিঃশব্দে সে এসেছিল তেমনি নিঃশব্দেই অদৃশ্য হয়ে গেল। তার সঙ্গে নকিমাও চলে গেল-চলে গেল নিয়ামওয়েগির আত্মা।
রাতের অন্ধকারে পথ চলতে চলতে এক সময় বুড়ো টাইমার একটা বড় গাছে চড়ে বসল। সেখান থেকেই পাতার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল- গ্রামের মাঝখানে অনেকগুলো লোক গোল হয়ে নাচছে। তারই একটু ফাঁক দিয়ে চোখ ফেলতেই যে দৃশ্য তার চোখে পড়ল তাতে ভয়ে তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
হাত-পা বাঁধা একটি মেয়ে মাটিতে পড়ে আছে, আর একটি কুৎসিত মেয়েমানুষ ওয়ালালা তার উপর ঝুঁকে হাতের বড় ছুরিটা ঘোরাচ্ছে। বুড়ো টাইমারের আতংকিত দৃষ্টির সামনে মুহূর্তের মধ্যে অভিনীত হল একটা বীভৎস নির্বাক দৃশ্যঃ সেই কুৎসিত মেয়েমানুষটা সাদা মেয়েটির চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলল, আর তার হাতে উদ্যত ছুরিটা আগুনের আলোয় ঝলসে উঠল। একটি মাত্র ছুরি ছাড়া সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও বুড়ো টাইমার ছুটে গিয়ে আসন্ন নারী হত্যার সেই দৃশ্যের সামীল হয়ে পড়ল।
তার কণ্ঠে ধ্বনিত হল রণ-হুংকার; আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা তীর এসে বিঁধল ওয়ালালার বুকে। বুড়ো টাইমারের দৃষ্টি তখন হত্যাকারীর উপরেই নিবদ্ধ; তীরটা সে দেখতে পেল; কিন্তু সে তীর কে ছুঁড়েছে কোন বন্ধু না শত্রু, সেটা সেও যেমন বুঝতে পারল না তেমিন বামনরাও বুঝতে পারল না।
মুহূর্তের জন্য বামনরা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বুড়ো টাইমার বুঝতে পারল যে তাদের এই নিষ্ক্রিয় অবস্থা বেশিক্ষণ থাকবে না। সঙ্গে সঙ্গে একটা চালাকি খেলে গেল তার মনে। ভোলা ফটকের দিকে মুখ ফিরিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল, গ্রাম ঘিরে ফেল! কাউকে পালাতে দিও না! তবে আমাকে না। মারলে কাউকে মেরো না! সে কথাগুলো বলল বোবোলোদের ভাষায়। কাজেই সকলেই তার কথা বুঝতে পারল। এবার তার দিকে ফিরে বলল, একপাশে সরে দাঁড়াও। সাদা মেয়েটিকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। কেউ তোমাদের কোন ক্ষতি করবে না।
কেউ কিছু বলার আগেই এক লাফে এগিয়ে গিয়ে সে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিল। ততক্ষণে দলের সর্দারের আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেছে। তার সামনে মাত্র একটি লোক। গ্রামের বাইরে আরও লোক থাকতে পারে। কিন্তু তার সৈনিকরাও কি যুদ্ধ জানে না? লাফ দিয়ে সামনে এগিয়ে সে চীৎকার করে বলল, সাদা লোকটাকে মেরে ফেল!
আর একটা তীর এসে বিধল তার বুকে; সে মাটিতে পড়ে গেল। আর তিনটে তীর এসে পর পর তিনটে বামনকে খতম করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে বাকি লোকগুলো সভয়ে চীৎকার করতে করতে নিজেদের ঘরে ঢুকে গেল।
মেয়েটিকে কাঁধে ফেলে বুড়ো টাইমার বিদ্যুঙ্গতিতে ফটক পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিসের যেন একটা মড় মড় শব্দ তার কানে এল, কিন্তু সেটা কিসের শব্দ তা বুঝতে পারল না, বুঝবার চেষ্টাও করল না।
বন্দিনী সাদা মেয়েটির খোঁজে বোবোলেদের গ্রামে পৌঁছে একটা দৃশ্য দেখে টারজান অবাক হয়ে গেল। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় একটি সাদা মেয়ে মাটিতে পড়ে আছে। আর তাকে ঘিরে রান্না-বান্না ও নাচ গানের মৌজ চলেছে।
