টারজান সখেদে বলল, তাহলে তো দেশে ফিরে আমার শত্রুদের কাছে আমি খুবই অসহায় হয়ে পড়ব।
যুবরাজ ধীর গলায় বলল, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না বন্ধু।
কেন?
কারণ তোমার নিজের দেশে ফিরে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। যদি বাবা কখনও ভেল্টোপিসমেকাসের লোকদের যুদ্ধে হারাতে পারে, তবেই আমাদের উদ্ধারের একটা উপায় হতে পারে।
টারজান বলল, তাহলে তুমি কি মনে কর যে বাকি জীবনটা আমাদের এই পাতালের গর্তেই কাটাতে হবে?
দুঃখের হাসি হেসে যুবরাজ বলল, কখনও যদি আমাদের মজুরের কাজ করতে বাইরের জগতে পাঠায়, তাহলে
দুই কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে টারজান বলল, বুঝেছি। দেখাই যাক।
অনেকগুলো ঘর ও বারান্দা পেরিয়ে টারজান ও কোমোডোফ্লোরেন্সলকে প্রাসাদের একই তলায়। একেবারে ভিতরের দিকে একটা ছোট ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিয়ে বাইরে থেকে খিল এঁটে দেয়া হল।
কোমোডোফ্লোরেন্সল ফিস ফিস করে বলল, এবার আমরা একা; সব কথা বলা যেতে পারে।
টারজান শুধাল, আমরা কোথায় আছি?
যুবরাজ বলল, আমরা আছি এলুকোমোয়েলহাগোর গম্বুজের একেবারে সর্বোচ্চ তলায় একটা ভিতরের ঘরে। একেবারে নিচু তলা থেকে ছাদ পর্যন্ত খোলা জায়গাটা সোজা উঠে গেছে এ ঘরটা তার ঠিক পাশে বলেই বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কোন মোমবাতির দরকার হচ্ছে না-খোলা জায়গাটা দিয়ে যথেষ্ট হাওয়া আমরা পাচ্ছি। এবার বল, ঘরের মধ্যে এতক্ষণ কি হল।
টারজান বলল, কি পদ্ধতিতে আমাকে বামন করা হয়েছে সেটা দেখলাম; আরও জানলাম, যে কোন সময়ে আমার আগেকার শরীর আবার ফিরে পেতে পারি-তিন থেকে ঊনচল্লিশ চাঁদের মধ্যে যে কোন দিন সেটা ঘটতে পারে।
যতদিন এই ছোট ঘরে আছ ততদিন সেটা না ঘটলেই ভাল।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে এখান থেকে বের হতেই হবে।
যুবরাজ জানালার কাছে গিয়ে গরাদের মোটা শিকগুলো দেখিয়ে বলল, তুমি কি মনে কর যে এগুলো ভাঙতে পারবে?
টারজান বলল, এখনও তো পরীক্ষা করে দেখিনি, বলেই জানালার কাছে গিয়ে শিকগুলো পরীক্ষা করতে কিছুটা চাপ দিতেই বেঁকে গেল। এবার সবলে চাপ দিতেই দুটো শিক সম্পূর্ণ বেঁকে গিয়ে জানালা থেকে খুলে বেরিয়ে এল।
কোমোডোফ্লোরেন্সল অবাক হয়ে বলল, জোয়ানথ্রোহাগো তোমার আকার ছোট করেছে বটে, কিন্তু তোমার ক্ষমতাকে খাটো করতে পারেনি।
সবগুলো শিক খুলে ফেলে একটা ছোট শিককে সোজা করে নিয়ে যুবরাজের হাতে দিয়ে বলল, বেশ ভাল অস্ত্র হবে। পালাতে গিয়ে যুদ্ধ করতে হলে কাজে লাগবে। নিজের জন্যও একটা শিক সোজা করে নিল।
তারপর টারজান যুবরাজকে বলল, আজ রাতে, কাল, অথবা পরবর্তী চাঁদে-কে জানে? সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে।
টারজান শুধাল, এই তলা থেকে গোলাকার গম্বুজের পথে একেবারে ছাদ পর্যন্ত দূরত্ব কতটা হবে বল তো?
তা বারো হুয়াল হবে।
মিনুনিদের মাপকাঠি অনুসারে এক হুয়াল মোটামুটি তিন ইঞ্চির মত।
সবচাইতে লম্বা শিকটা নিয়ে যতদূর সম্ভব মেপে টারজান বলল, দূরত্বটা বড়ই বেশি।
কিসের?
ছাদের।
তাতে তোমার কি? তুমি কি ভাবছ যে গম্বুজের ছাদে উঠে সেখান থেকে পালাবে?
টারজান দৃঢ়স্বরে বলল, নিশ্চয় অবশ্য যদি ছাদে উঠতে পারি।
কোমোডোফ্লোরেন্সল আরও জোরে হেসে উঠল। তুমি কি ভাবছ নিচে নামলেই পালাতে পারবে? শাস্ত্রীরা নেই? অন্য পাহারাদার নেই?
টারজান বলল, তাহলে তো দেখছি সুড়ঙ্গের ভিতর দিক দিয়ে নামাই নিরাপদ।
কোমোডোফ্লোরেন্সল চেঁচিয়ে বলল, এই সুড়ঙ্গ বেয়ে নামবে? তুমি কি পাগল! নামতে গেলেই তো একেবারে চারশ’ হুয়ান নিচে পড়ে যাবে।
থাম! টারজান থমকে উঠল।
অন্ধকার ঘরে কোমোডোফ্লোরেন্সল সঙ্গীর নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পেল; শুনতে পেল পাথরের গায়ে লোহার শিক ঘষার ও ঠোকার শব্দ।
কি করছ তুমি?
থাম! টারজান বলল।
কোমোডোফ্লোরেন্সল অবাক বিস্ময়ে অপেক্ষা করে রইল। আবার কথা বলল টারজান, খনির যে ঘরে টালাস্কারকে আটকে রেখেছে সেটা খুঁজে বরে করতে পারবে?
কেন?
তার কাছে যেতে হবে। তাকে কথা দিয়েছি, সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।
তা বের করতে পারব।
আর কিছু সময় পরে টারজান বলল, এস। আমরা যাত্রার জন্য প্রস্তুত।
কোন পথে পালাবে?
মাঝখানের সুড়ঙ্গ-পথে। যে উঁচলো শিকটা তোমাকে দিয়েছিলাম সেটা সঙ্গে আছে?
হ্যাঁ।
তাহলে জানালার ভিতর দিয়ে বেরিয়ে এস। মুখের কাছে যে শিকগুলো রেখেছি সেগুলো নিয়ে এস। বেশির ভাগটা আমিই বইব। চলে এস।
জানালার মুখে চারটে শিক পড়ে ছিল। প্রত্যেকটার মুখ বঁড়শির মত বাঁকানো। টারজান তাহলে অন্ধকারে এতক্ষণ এই কাজ করছিল। একটু এগোতেই সে টারজনের গায়ে ধাক্কা খেল।
টারজান বলল, এক মিনিট দাঁড়াও। জানালার গোবরাটে একটা গর্ত করছি। সেটা হয়ে গেলেই যাত্রা শুরু। একটু পরে আবার বলল, এবার শিকগুলো দাও।
আরও কয়েক মিনিট নিঃশব্দে কাজ করে টারজান মাথা তুলে বলল, আমি আগে নামছি। আমার শিস শুনলেই তুমি আমাকে অনুসরণ করবে।
কোথায়? যুবরাজ প্রশ্ন করল।
সুড়ঙ্গ-পথে সর্বপ্রথম যেখানে পা রাখার জায়গা পাব সেখানে। আশা করছি, আঠারো হুয়ালের মধ্যেই আর একটা তলা পেয়ে যাব। চারটে শিককে হুকে আটকে উপরের প্রান্তটাকে আটকে দিয়েছি গোবরাটের গর্তের সঙ্গে, আর একেবারে নিচের দিকটা ঝুলিয়ে দিয়েছি আঠারো হুয়াল নিচে।
