রক্ষী-সর্দার তার সম্মুখে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললঃ হে একোমোয়েলহাগো, ভেল্টোপিসমেকাসের রাজা, সর্ব-মানবের শাসনকর্তা, তোমার হুকুম মতই জোয়ান্থ্রোহাগোর এই ক্রীতদাসকে এনেছি।
কয়েক মিনিট নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে থেকে রাজা বলল, তুমি কোন্ শহর থেকে এসেছ?
জবাব দিল রক্ষী-সর্দার, এ বেচারি কথা বলতে পারে না।
কোন শব্দ করতে পারে? রাজা শুধাল।
বন্দী হবার পর থেকে কোন শব্দই উচ্চারণ করেনি।
এই সময় ঘরের অন্য দিকের দরজাটা খুলে গেল। রাজকুমারী ঘরে ঢুকলে রাজা বলল, এস জানূজারা। দেখ কী বিচিত্র এক দৈত্যকে এখানে আনা হয়েছে।
রাজকুমারী মেঝে পেরিয়ে টারজনের সামনে এসে দাঁড়াল। টারজান বুঝল, এই মেয়েটির সঙ্গেই একদিন তার বন্ধু কোমোডোফ্লোরেন্সলের বিয়ে হবে। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল, রাজকুমারীর সুন্দর ভুরু দুটি যেন বাঁকা হয়ে উঠল।
রাজকীয় গম্বুজ থেকে টারজানকে সোজা নিয়ে যাওয়া হল শহর থেকে সিকি মাইল দূরে অবস্থিত খনি অঞ্চলে। মাটির নিচে একটা আলোকিত ঘরে ঢুকে তাকে খনির ভারপ্রাপ্ত অফিসারের হাতে তুলে দিয়ে রাজার হুকুম জানিয়ে দেয়া হল।
টেবিলে রাখা একটা মস্ত বড় খাতা খুলে অফিসার বলল, তোমার নাম?
রক্ষী-সর্দার বলল, ও তো জাটাকোলোলদের মতই বোবা; সুতরাং ওর কোন নাম নেই।
অফিসার বলল, ঠিক আছে, ওকে আমরা দৈত্য বলে ডাকব। খাতায় লিখল-জুয়াল, মালিক জোয়ান্থ্রোহাগো, নিবাস ট্রোহানাডালমেকাস; তারপর একজন সৈনিককে ডেকে বলল, ওকে ছত্রিশ তলায় নিয়ে যাও; সেখানকার সর্দারকে বলে দিও ওকে যেন হাল্কা কাজ দেয়া হয়, আর ওর যেন কোনরকম ক্ষতি না হয়, কারণ সেটাই রাজার হুকুম-যাও! না, দাঁড়াও; এই নাও ওর সংখ্যা; এটা ওর কাঁধে সেটে দাও।
কালো অক্ষরে সংখ্যার ছাপ মারা একটা গোল কাপড়ের টুকরো নিয়ে সৈনিক সেটাকে পিতলের আংটা দিয়ে টারজনের সবুজ জামার কাঁধের সঙ্গে আটকে দিল।
টারজানকে হাল্কা কাজই দেয়া হল। সেই সুযোগে অবসর সময়ে সে চারদিকের সব কিছু দেখে বেড়াতে লাগল।
তাকে সবচাইতে বিস্মিত করেছে এই লোকগুলোর দেহের আকার। তারা কেউ বামন নয়, যে কোন ইউরোপীয় মানুষের মতই দেখতে।
একদিন ঘুরতে ঘুরতে একটি তরুণীর সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। উনুনের আগুনে সে এক টুকরো মাংস ঝলসাচ্ছিল। চোখে চোখ পড়তেই সে ইশারায় টারজানকে কাছে ডাকল। কাছে গিয়ে দেখল মেয়েটি খুবই সুন্দরী।
তুমি দৈত্য? মেয়েটি শুধাল।
আমি জুয়াল, টারজান জবাব দিল।
ওর কাছে তোমার কথা শুনেছি। আমি তোমার জন্যও খানা পাকাব, অবশ্য অন্য কারও সঙ্গে যদি সে ব্যবস্থা না করে থাক।
কারও সঙ্গে কোন ব্যবস্থাই আমি করিনি; কিন্তু তুমি কে, আর ওটাই বা কে?
মেয়েটি বলল, আমি টালাস্কার, কিন্তু আমি তো ওর শুধু সংখ্যাটাই জানি। তার সংখ্যা আট শ’র তিনগুণ যোগ উনিশ। তোমার সংখ্যা দেখছি আট শ’র তিনগুণ যোগ একুশ। তোমার কি কোন নাম আছে?
সবাই আমাকে জুয়ানথ্রল বলে ডাকে।
পিছন থেকে একটা হাত তার কাঁধ স্পর্শ করল; একটি পুরুষ-কণ্ঠ ডাকল তার নাম ধরে : টারজান!
মুখ ফেরাতেই পূর্ব-পরিচয়ের একটা খুশির ঝলকে টারজনের মুখ ঝম করে উঠল।
কোম-! সহর্ষে সে ডাকতেই যাচ্ছিল, কিন্তু লোকটির তর্জনী ততক্ষণে তার ঠোঁটের উপর উঠে এসেছে। লোকটি বলল, এখানে ও নাম নয়। এখানে আমি আওপোলটো।
কিন্তু তোমার এত বড় শরীর! তুমি তো এখন আমার মতই বড়। বামনরা সব হঠাৎ এত বড় হয়ে উঠল কেমন করে?
কোমোডোফ্লোরেন্সল হাসল। বলল, মানুষের অহংকারই তাকে বুঝতে দেয় না যে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো দিক থেকেও তো ঘটে থাকতে পারে।
টারজান বলল, কী বলতে চাও তুমি? তাহলে কি আমিই বেঁটে হয়ে গেছি?
কোমোডোফ্লোরেন্সল মাথা নাড়ল। একটা গোটা জাতির মানুষজন, তাদের জিনিসপত্র, অস্ত্রশস্ত্র, বাড়িঘর সব কিছু হঠাৎ আকারে বড় হয়ে গেছে- এটা ভাবার চাইতে তুমি নিজেই ছোট হয়ে গেছ সেটা ভাবাই সহজতর নয়?
কিন্তু সে তো অসম্ভব! টারজান চীৎকার করে বলল।
যুবরাজ বলল, কয়েক চাঁদ আগে পর্যন্ত আমিও তাই বলতাম। এমন কি যখন গুজব রটে গেল যে ওরা তোমাকে বেঁটে করে দিয়েছে তখনও আমি তা বিশ্বাস করি নি। কিন্তু এখন তো নিজের চোখেই সব দেখতে পাচ্ছি।
কি করে এটা করল? টারজান জানতে চাইল।
কোমোডোফ্লোরেন্সাল বলতে লাগল, ভেল্টোপিসমেকাসে, হয়তো গোটা বামনদের দেশেই, জোয়ান্থ্রোহাগো হচ্ছে সবচাইতে পণ্ডিত লোক। তার অনেক অলৌকিক কীর্তির কথা আমরা শুনেছি। সে একজন শ্রেষ্ঠ ওয়ালমাক।
টারজান বলল, বামনদের দেশে এরকম কোন যাদুকরের কথা তো আগে কখনও শুনি নি। টারজনের ধারণা ‘ওয়ালমাক’ কথাটার অর্থ যাদুকর। অবশ্য অনেকটা তাই বটে। যে বিজ্ঞানী অলৌকিক কাণ্ড ঘটাতে পারে তাকেই বলা হয় ওয়ালমাক।
আওলোলটো বলতে লাগল, জোয়ানথ্রোহাগোই তোমাকে বন্দী করেছিল। তোমাকে ভেল্টোপিসমেকাসে নিয়ে আসার পরে নিজের যন্ত্রপাতির সাহায্যে সেই তোমাকে বেঁটে বানিয়ে দিয়েছে। ওদের আলোচনা থেকেই আমি এ সব জেনেছি; ওরা বলছে, এ কাজ করতে তার নাকি বেশি সময়ও লাগেনি।
কি ভেবে টারজান বলল, যে কাজ জোয়ানথ্রোহাগো করেছে সেটাকে পাল্টে দেবার ক্ষমতাও নিশ্চয় তার আছে।
সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। কোন জীবকে মূল আকারের চাইতে বড় করতে সে পারে না, যদিও অনেক জীবজন্তুকে সেই আজ পর্যন্ত ছোট করেছে।
