সৈন্য পরিচালনার গুরু দায়িত্ব নিয়ে গম্বুজ-প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসেছে যুবরাজ কোমোডোফ্লোরেন্সল। শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সে শহর থেকে দু’মাইল দূরে প্রথম ঘাঁটি বানিয়েছে সাত হাজার পাঁচ শ’ সৈন্যের। তার পিছনে আধ মাইল দূরে রেখেছে দু’হাজার সৈন্য; তাছাড়া অগ্রবর্তী সৈন্যদলে আছে দশ হাজার সৈনিক; গোটা শহরটাকে তারা ঘিরে রেখেছে।
টারজান রাজা অ্যাডেড্রোহাখিসের দিকে এগিয়ে গেল। রাজার গায়ের সোনালী পোশাক ঝলমল করছে।
তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে রাজা বলল, রক্ষী-দলপতি আমাকে বলেছে, ভেল্টোপিসমেকাস বাহিনীর আগমন বার্তা তুমিই সকলের আগে জানিয়েছ। তাই আর একবার ট্রোহামাডামেকাসের মানুষদের তুমি কৃতজ্ঞতাপাশে বেঁধেছ। কি করলে সে ঋণ শোধ হবে বল?
টারজান সবিনয়ে জানাল, আমার কাছে তোমাদের কোন ঋণ নেই। তোমাদের বন্ধুত্ব লাভ করলেই আমি খুশি হব। তুমি শুধু এই অনুমতি দাও, আমি যেন তোমার ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে পারি।
রাজা বলল, মৃত্যু-কীট যতদিন আমাকে গিলে না খাবে ততদিনই আমি তোমার বন্ধু থাকব। তোমার যেখানে খুশি যেতে পার। তুমি যে যুদ্ধের জায়গাটাই বেছে নিয়েছ তাতে আমি মোটেই বিস্মিত হয়নি।
যুবরাজ কোমোডোফ্লোরেন্সল তাকে সাদরে গ্রহণ করল। তার কাঁধে একটা পাতা ভরা ডাল দেখে যুবরাজ অবাক হয়ে তাকাল।
টারজান বলর, খবর কি?
যুবরাজ বলল, খবর পেয়েছি, ওদের দলে আছে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার সৈন্য।
ঠিক তখনই পশ্চিম দিক থেকে একটা শব্দের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল।
যুবরাজ হাঁক দিল ওরা এসে পড়েছে।
উঁচু নিচু প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে টারজান দেখল, ভেল্টোপিসমেকাস বাসীরা দলে দলে এগিয়ে আসছে।
কোমোডোফ্লোরেন্সলের হুকুমে শুরু হল প্রচণ্ড লড়াই। সেদিকে তাকিয়ে যুবরাজ বলল, সংখ্যায় ওরা অনেক বেশি। সেই সংখ্যার জোরেই ওরা আমাদের কিছু লোককে বন্দী করবে, আমরাও কিছু লোককে বন্দী করব।
বলতে বলতেই যুবরাজ সেখান থেকে সরে গেল। সে ছুটে গেল নিজের সৈন্যদের পাশে। সেখানে চলেছে দুই পক্ষের হাজার হাজার সৈন্যের মরণপণ সংগ্রাম।
এতক্ষণে ভেল্টোপিসমেকাসবাসীদের দৃষ্টি পড়ল টারজনের উপর। তারা দলে দলে ধেয়ে এল তাকে লক্ষ্য করে। টারজানও প্রথমে হাতের ডালটা দিয়ে তাদের ঝাটা-পেটা করতে লাগল। কিন্তু শত্রুপক্ষ যে সংখ্যাহীন। টারজনের আঁটার আঘাতে যতজন মারা যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে তারা দশগুণ এসে তার উপর। ঝাঁপিয়ে পড়ল।
হঠাৎ একটি বেঁটে সৈনিক এসে ছুঁ মারল টারজনের পেটে; সে আঘাতে তার মাথাটা ঘুরে গেল। মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেল সে।
নরখাদক ওবেবেদের ওঝা খামিসের মেয়ে উহহা জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙা ঘরে ঘাসের উপর গুঁড়ি-সুড়ি মেরে শুয়ে আছে।
স্পেনীয় লোকটির দিকে তাকিয়ে ছোট্ট নিগ্রো মেয়েটির চোখ দুটি ঝিকমিকিয়ে উঠল, কারণ তার প্রতিহিংসা সাধনের উপায় রয়েছে ঐ লোকটিরই দখলে। আগুনের দিকে ঝুঁকে শুয়ে পড়ে লোকটি খুশি মনে তাকিয়ে আছে তার ছোট হরিণ চামড়ার থলেটার দিকে। ছোট্ট উহহা জানে, থলের ভিতরকার এই ঝকমকে ছোট্ট পাথরগুলোকে এস্টেবান মিরান্ডা কত ভালবাসে। সেগুলো যে হীরে তা সে জানে না, সেগুলোর মূল্যও বোঝে না। শুধু জানে যে এই পাথরগুলোকে লোকটা এত ভালবাসে যে সে মরবে তবু ওগুলো হাতছাড়া করবে না।
এক সময় স্পেনীয় লোকটির শ্বাস-প্রশ্বাস থেকেই বোঝা গেল সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে উহহা ঘাসের নিচে হাত ঢুকিয়ে একটা বড় মুগুর টেনে বের করল। খুব সাবধানে ধীরে ধীরে উঠে ঘুমন্ত মিরান্ডার পাশে হাঁটু ভেঙ্গে বসল। মুগুরটাকে মাথার উপর তুলে সবেগে মাত্র একবার এস্টেবানের খুলিতে আঘাত হানল- একটি আঘাতই যথেষ্ট। কিন্তু উহহা চায় না যে সে মারা যাক; সে বেঁচে থেকে জানুক যে উহহা তার বড় আদরের থলেটা চুরি করেছে। মিরান্ডার কোমরে ঝোলানো ছুরিটা দিয়েই কটিবস্ত্রটা কেটে উহহা তার চামড়ার থলে ও হীরেগুলো হাতিয়ে নিল। তারপর দরজার কাটা গাছগুলো সরিয়ে রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
জ্ঞান ফিরে এলে টারজান দেখল, একটা বড় ঘরের মাটির মেঝেতে সে শুয়ে আছে। দুটো বড় আকারের মোমবাতি জ্বলছে ঘরে।
ঘরে পঞ্চাশ থেকে একশ’ জন অন্য লোক রয়েছে। সকলেরই উচ্চতা প্রায় তারই মত, কিন্তু তারা সকলেই সশস্ত্র ও সুসজ্জিত। টারজান ভুরু কুঁচকে অনেকক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
ভাল করে জ্ঞান হতে আরও বুঝতে পারল যে তার সারা শরীরে ব্যথা, হাত দুটো ভারী ও অবশ। হাত নাড়তে চেষ্টা করল-পারল না, দুটো হাতই পিছমোড়া করে বাঁধা। তবে পায়ে কোন বাঁধন নেই। অনেক কষ্টে উঠে বসে চারদিকে তাকাল। ঘরভর্তি সৈনিক; দেখতে হুবহু ভেল্টোপিস্মেকাসবাসীদের মত। কিন্তু তাদের উচ্চতা স্বাভাবিক মানুষেরই মত। ঘরে অনেকগুলো টেবিল ও বেঞ্চি পাতা; লোকগুলো হয় তাতে বসে আছে, নয়তো মেঝেতে শুয়ে আছে। তাদের প্রায় সকলেই আহত, অনেকে গুরুতর আহত। কিছু লোক তাদের সেবা-শুশ্রূষা করছে।
টারজনের ক্ষতস্থানগুলো খুব তাড়াতাড়ি শুকিয়ে গেল। সাত দিনের দিন তাকে হাজির করা হল রাজা একোমোয়েলগোর প্রাসাদে।
ফটকের দরজা খুলে গেল। প্রকাণ্ড ঘর। উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত, নানা কারুকর্মে ঝলমল। উঁচু বেদীর উপর আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে বসে আছে রাজা।
