আলালুস যুবকটিকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হল টারজনের দীর্ঘ পথযাত্রা।
এইভাবে টারজান ও আলালুস যখন দীর্ঘ অরণ্যপথ পার হয়ে চলল আর টারজান খুঁজতে লাগল একটা। পালাবার পথ, ঠিক তখনই ওঝা খামিসের মেয়ে ছোট্ট উহহাকে সঙ্গে নিয়ে সেই একই অরণ্যের অন্য। প্রান্তের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে এস্টেবান, পশ্চিম উপকূলে যাবার একটা পথের সন্ধানে।
আলালুস যুবকটি টারজনের পিছনেই লেগে রইল। এতদিনে টারজানও যুবকটির ইঙ্গিত ভাষা কিছুটা শিখে নিয়েছে।
একদিন তেমনিভাবে একা শিকারে বেরিয়ে টারজান একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। দেখতে পেল একটি বিরাটকায়া আলালুস নারীকে; তাকে ঘিরে ধরেছে একদল বেঁটে বামন- পশ্চিম উপকূলের বিশেষ ধরনের হরিণের পিঠে সওয়ার হয়ে তারা হাতের বর্শা ও তরবারি দিয়ে বার বার আঘাত করছে আলালুস নারীর বিরাট দুটি পায়ে; নারীটিও আক্রমণকারীদের লাথি মেরে ও হাতের মুগুর চালিয়ে ধীরে ধীরে জঙ্গলের দিকে পিছু হটে যাচ্ছে। নারীটির এক এক লাথিতে আক্রমণকারীদের ডজনখানেক সৈনিক। ধরাশায়ী হচ্ছে; ইতোমধ্যেই শ’খানেক যোদ্ধার প্রায় অর্ধেকই মারা পড়েছে।
টারজান জঙ্গলের আড়াল থেকে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এল। তাকে দেখা মাত্রই দ্বিতীয় শত্রু মনে করে বামন সৈন্যরা হতাশায় চীৎকার করে রণে ভঙ্গ দিল। কিন্তু নারীটি মুখ ভেংচে মুগুর উঁচিয়ে তাকেই তেড়ে এল। তার বাঁ হাতের মুঠিতে ঝুলছে একটি বেঁটে মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে টারজানও ধনুকে তীর জুড়ে হুংকার দিয়ে উঠল, চলে যাও, নাইলে তোমাকে খুন করে ফেলব। আর যাবার আগে হাতের ছোট মানুষটিকে ছেড়ে দিয়ে যাও।
নারীটি কিন্তু হিংস্র ভঙ্গীতে দাঁত বের করে আরও জোরে ছুটে এল। আর দেরী করা বিপজ্জনক। টারজান হাতের তীর ছুঁড়ে দিল। সে তীর আমূল বিদ্ধ হল নারীটির বুকে। সে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। কিন্তু তার আগেই টারজান এক লাফে এগিয়ে গিয়ে তার মুঠোর ভিতর থেকে বামন সৈন্যটিকে উদ্ধার করে আনল।
সমবেত বামনরা আনন্দে হৈ-হৈ করে এগিয়ে এল। নতজানু হয়ে সকলে টারজনের হাতে চুমো খেতে লাগল। টারজান বুঝতে পারল, এই লোকটি তাদের সকলের শ্রদ্ধার পাত্র; হয়তো তাদের সর্দার।
সকলের দিকে ভাল করে তাকিয়ে টারজান বুঝল, এদের মধ্যে যে সবচাইতে লম্বা তার উচ্চতা মাত্র আঠারো ইঞ্চি; রোদে পুড়ে তাদের সাদা চামড়া অনেকটা তামাটে রং ধরেছে।
মুক্তিপ্রাপ্ত যুবকটি এগিয়ে এসে টারজনের সামনে নতজানু হয়ে হাত বাড়াল; টারজানও মাথাটাকে ঈষৎ নামিয়ে হাত বাড়িয়ে অভিবাদন জানাল। সর্দার জানাল, তারা এবার ফিরে যাবে; অতএব টারজানও তাদের সঙ্গেই চলুক।
কৌতূহল বশতই টারজান তারেদ সঙ্গে যেতে সম্মত হল।
যাই হোক, দিনের আলো থাকতে থাকতেই এক সময় টারজান দেখতে পেল, অনেক দূরে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে গুম্বুজ আকারের অনেকগুলো পাহাড়ের চূড়া আর একদল সৈনিক হরিণের পিঠে সওয়ার হয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে দ্রুত গতিতে।
আরও কাছে পৌঁছে টারজান দেখল, অসংখ্য বামন সেই পাহাড়-চূড়াগুলোতে চলাফেরা করছে; আর যেগুলোকে দূর থেকে পাহাড়ের চূড়া বলে মনে হয়েছিল আসলে সেগুলো ছোট ছোট পাথরের তৈরি। গম্বুজ- ওয়ালা বাড়ি; নিজেরাই সেগুলো তৈরি করেছে।
সকলের সঙ্গেই টারজনের একটা হৃদ্যতা গড়ে উঠল। বিশেষ করে তাদের রাজা অ্যাডনড্রোহাখিস তো তার উপর খুব খুশি, কারণ রাজার ছেলে কোমোডোফ্লোরেন্সলকে সেই বাঁচিয়েছে আলালুস নারীর কবল থেকে। অতএব পরম সুখেই তার দিন কাটতে লাগল।
কথা প্রসঙ্গে একদিন টারজান রাজকুমার কোমোডোফ্লোরেন্সলকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার স্ত্রী কোথায়?
সে জবাব দিল, আমার স্ত্রী নেই। পার্শ্ববর্তী শহর ভেল্টোপিসমেকাসের বিরুদ্ধে আমাদের একটা যুদ্ধের আয়োজন চলছে। সেখানকার রাজার একটি পরমা সুন্দরী কন্যা আছে; নাম জাজারা। রাজা অ্যাডেনড্রোহাখিসের ছেলের সেই হবে উপযুক্ত পাত্রী।
একদিন রাজা অ্যাডেনড্রোহাখিসের শহরের এক প্রান্তে একটা বড় গাছের নিচে ঘাসের বিছানায় শুয়ে। ছিল টারজান। হঠাৎ মাটির নিচ থেকে একটা অস্পষ্ট কাঁপন কানে আসায় তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
জেগে উঠে ভাল করে কান পাততেই সে বুঝতে পারল, শব্দটা মাটির নিচে থেকে আসছে না, আসছে মাটির উপর থেকেই, আর সেটাও খুব দূর থেকে নয়। শব্দটা অতি দ্রুত এগিয়ে আসছে। মুহূর্তমাত্র হতচকিতভাবে থেকেই হঠাৎ সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। রাজা অ্যাডেনড্রোহাখিসের প্রাসাদ গম্বুজ মাত্র শ’খানেক গজ দূরে; টারজান সেই দিকে পা চালিয়ে দিল। দক্ষিণ ফটকের মুখে জনাকয়েক সৈনিকসহ একজন অফিসার এসে প্রশ্ন করল, ব্যাপার কি?
টারজান জবাব দিল, অনেক হরিণের আসার শব্দ সে শুনতে পেয়েছে।
অফিসার বলল, কোন্ দিক থেকে আসছে?
পশ্চিম দিকে আঙ্গুল বাড়িয়ে টারজান বলল, শব্দটা ঐদিক থেকেই আসছে বলে মনে হচ্ছে।
ভেল্টোপিসমেকাসের লোকেরা আসছে। চীৎকার করে কথাগুলো বলেই অফিসার সঙ্গীদের দিকে ঘুরে বলল, শীঘ্র যাও। ট্রোহানাডামেকাসের লোকদের জাগাও- আমি যাচ্ছি রাজপ্রাসাদ ও রাজাকে সতর্ক করে দিতে।
সকলেই যার যার পথে চলে গেল।
টারজান দেখতে পেল, অবিশ্বাস্যরকম অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার সৈনিক দশটি গম্বুজের প্রতিটি থেকে জলস্রোতের মত বেরিয়ে আসছে। উত্তর ও দক্ষিণ ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসছে হরিণারোহী সৈনিক আর পূর্ব ও পশ্চিম ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসছে পদাতিক সৈন্যের দল।
