যুবকটি বলল, মা এখান থাকলে তুমি এ কাজ করতে পারতে না; মা তোমাকে করতে দিত না।
টারজান বলল, তুমি ঠিক কথাই বলেছ। কিন্তু এবারটা তুমি আমাকে উড়তে দাও; আমি কথা দিচ্ছি, তোমার মা ফিরে না আসা পর্যন্ত আর আকাশে পাড়ি দেব না।
তরুণীটি বলল, ওর মতই আমারও তোমার জন্য ভয়ের অন্ত নেই বাবা। তুমি এত বেশি ঝুঁকি নাও যে মনে হয় তুমি বুঝি বা নিজেকে অমর বলে মনে কর। তোমার আরও সাবধান হওয়া উচিত।
যুবকটি স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে বলল, মিরিয়েম ঠিকই বলেছে; তোমার আরও সাবধান হওয়া উচিত বাবা।
দূরের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাইপ্লেন। আর ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে দুটি ওয়াজিরি সৈনিক। শিরস্ত্রাণ ও গগলস পরে টারজান ককপিটে চড়ে বসল।
এক মুহূর্ত পরেই বাইপ্লেনটা আকাশে উড়ল।
ঘণ্টা দেড়েক ধরে টারজান সোজা উড়ে চলল। যে রকম সহজ নৈপুণ্যের সঙ্গে সে জাহাজটাকে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে তারই অনাস্বাদিতপূর্ব আনন্দে সে ভুলেই গেল কতক্ষণ ধরে উড়ছে, বা কতদূর পথ পার হয়েছে।
টারজান স্থির করল, জাহাজটাকে বাড়িমুখো ফেরাবার আগে এই রহস্যটকা দেশটাকে আরাও ভাল করে দেখতে মাটির আরও কাছাকাছি নামবে। করলও তাই। হঠাৎ তার খেয়াল হল, বিচিত্র এই নতুন দেশটাকে দেখতে সে এতই মশগুল হয়ে পড়েছিল যে কখন অজান্তে জাহাজটা বেশি নিচে নেমে গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই জাহাজটা অনেক উঁচু একটা বড় গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পাক খেয়ে সশব্দে ভেঙ্গে পড়ল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই সব নিশ্চুপ।
বনপথ ধরে এগিয়ে এল একটি অতিকায় প্রাণী; দেহ গঠন মানুষের মত, অথচ ঠিক মানুষ নয়। কড়াপড়া শক্ত হাতে একটা মুগুর নিয়ে একটা অতিকায় পশু বুঝি দুই পায়ে খাড়া হয়ে এগিয়ে এল। প্রাণীটির উচ্চতা ছ’ ফুটের মত।
আরও খানিকটা এগিয়ে এসে দেখতে পেল একটা লোক পথের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সে গোরিলা-মানুষ টারজান। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মাথার উপরে তার বিধ্বস্ত বাইপ্লেনটা গাছের ডালে আটকে রয়েছে।
এই বিচিত্র লোকটিকে দেখে অবাক হল, কিন্তু ভয় পেল না। আঘাত করতে হাতের মুগুরটা তুলেও কেন কে জানে আঘাত করল না। তারপর গোরিলা-মানুষের দেহটাকে একঝটকায় কাঁধে তুলে নিয়ে যেদিকে যাচ্ছিল সেই দিকেই হাঁটতে লাগল।
টারজানকে কাঁধে নিয়ে একটা বিচিত্র পাথরের গুহায় সে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে তার ছেলেমেয়েরা টারজানকে ঘিরে দাঁড়াল। তাকে ভাল করে দেখল, উল্টে দিল, খোঁচা দিল চিমটি কাটল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না, টারজান যেমন ছিল তেমনি পড়ে রইল।
টারজনের ভাগ্য ভাল, উড়োজাহাজ থেকে পড়ার সময় নরম ডালপালার ভিতর দিয়ে পড়ায় মাথায় সামান্য আঘাত ছাড়া বড় রকমের কোন আঘাত পায়নি। ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরে এল। ক্রমে শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল।
উঠে বসল। ধীরে ধীরে গুহার বাইরে বেরিয়ে এল। সেখানে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে কেউ রোদে, কেউ বা ছায়ায় বসে আছে। টারজান ভাবল, এরা কারা? এরা কি তার রক্ষী, না নিজেরাই বন্দী?
কালো চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে টারজান মাথাটা নাড়তে লাগল। তার মনে পড়ল, মাঝপথে হঠাৎ বিমানটা ভেঙ্গে পড়েছিল, একটা বড় গাছের ডালপাতার ভিতর দিয়ে সে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল; কিন্তু তাছাড়া আর কিছুই তার মনে পড়ছে না। আলালি ছেলেমেয়েদের দিকে চোখ রেখে নির্ভীক সিংহের মত সদম্ভে পা ফেলে বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়াল।
সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েগুলো এগিয়ে এসে তাকে ঘিরে ধরল। ছেলেগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মেয়েগুলোই কাছে এগিয়ে এল। টারজান তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল; পর পর নানা উপজাতির ভাষায় কথা বলল, কিন্তু তারা কোনটাই বুঝতে পারল না। সকলেরই ক্রুদ্ধ দৃষ্টি তখন টারজনের উপর। তাকে দিয়ে পেটের ক্ষিধে মেটাতে তারা তখন কৃতসংকল্প।
কিন্তু তাদের বাধা দিল ষোল বছরের একটি ছেলে। নানা রকম অঙ্গভঙ্গী করে ও মাথা নেড়ে সে অন্য সকলকে বিরত করতে চেষ্টা করতে লাগল। ফল কিন্তু হল উল্টো। ক্ষিধের জ্বালায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অন্য ছেলেমেয়েগুলো এই ছেলেটাকেই পাল্টা আক্রমণ করে বসল। দ্রুত সরে গিয়ে ছেলেটা কোমর থেকে কয়েকটা পালক-লাগানো পাথর তুলে নিয়ে তাদের দিকে ছুঁড়ে মারল। দুটি মেয়ে আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তৃতীয় পাথরটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে একটা ছেলের কপালে গিয়ে লাগতে সেও সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। এবার ছেলেমেয়েরা সকলেই মারমার ভঙ্গীতে ছেলেটাকে তাড়া করে এল। একটা পাথর আবার তাদের লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিয়েই ছেলেটা টারজনের দিকে ছুটে গেল।
কিসের টানে কে জানে টারজান ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হাসল। ছেলেটা ভয়ঙ্কর দুই পাটি দাঁত মেলে ধরল; অবশ্য টারজনের বুঝতে অসুবিধা হল না যে ছেলেটা তার হাসিরই প্রতিদান দিল। টারজান। আবার ছেলেটার দিকে তাকাল; সে তখন ভয়ে কাঁপছে। অদূরেই পিছনের একটা প্রাচীর। একটানে আলালুস জাতির ছেলেটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে টারজান সেইদিকে ছুটে গেল। এক লাফে প্রাচীরের উপর চড়ে বসে ছেলেটিকেও ও পাশের মাটিতে নামিয়ে দিয়ে নিজেও সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়ল।
পথ দেখিয়ে ছেলেটা ছুটছে আগে আগে; পিছনে ছুটছে টারজান। কিন্তু অচিরেই সে দ্রুততর গতিতে ছেলেটাকে ছাড়িয়ে আগে চলে গেল। পরমুহূর্তেই অনুসরণকারীদের বোকা বানিয়ে টারজান জঙ্গলে ঢুকেই। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কিন্তু দূর থেকেও তার চোখ রইল আলালুস ছেলেটার দিকে। সে তখন নিচের পথ ধরে প্রাণপণে ছুটছে।
