এস্টেবান মিরান্ডার সুখের বিষয়টি হল রুশ ক্রাস্কির হীরকের থলের চিন্তা। গোরিলা-মানুষটির কাছ থেকে থলেটা চুরি করার পরে স্পেনীয় লোকটি ক্রাস্কিকে খুন করে সেটা হস্তগত করে-আবার বোলগানির নিষ্ঠুর অত্যাচারের হাত থেকে হীরক প্রাসাদ উপত্যকায় গোমাঙ্গানিকে উদ্ধার করার পরে সেই। লোকটিই হীরক গম্বুজের নিচে অবস্থিত সুরক্ষিত কক্ষে থলেটি তুলে দেয় টারজনের হাতে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা নোংরা খোয়াড়ের অস্পষ্ট আলোয় বসে এস্টেবান মিরান্ডা সেই উজ্জ্বল পাথরগুলো গোণে, আদর করে তাতে হাত বুলোয়। কারও পায়ের শব্দ শুনলেই রুপকথার ঐশ্বর্যকে লুকিয়ে ফেলে তার একমাত্র পরিধেয় শতচ্ছিন্ন কটি-বস্ত্রের মধ্যে।
একটি বছরের নির্জন বন্দী-জীবনের পরে এখন আবার তার সামনে দেখা দিয়েছে আনন্দের খোরাকঃ ওঝা খামিসের মেয়ে উহ্হা। একটি বছর ধরে এই রহস্যময় বন্দীটিকে সে দূর থেকে দেখেছে; ক্রমে তার ভয় ভেঙ্গেছে; একদিন বন্দী যখন কুঁড়ের বাইরে রোদে শুয়েছিল তখন মেয়েটি তার কাছে এগিয়ে এল।
তাকে দেখে এস্টেবান থেমে থেমে বলল, এক বছর হল আমি সর্দার ওবেবের গাঁয়ে এসেছিন, কিন্তু আগে কখনও ভাবতেও পারিনি যে তোমার মত একটি সুন্দরী এখানে থাকে। তোমার নাম কি?
উহহা খুশি হল। বলল, আমি উহ্হা। ওঝা খামিস আমার বাবা।
এস্টেবান শুধাল, তুমি এতদিন আসনি কেন?
ভয়ে!
কিসের ভয়?
মেয়েটি ইতস্তত করতে লাগল। এস্টেবান হেসে বলল, আমি জল-পিশাচ, তোমার ক্ষতি করব- এই ভয় তো?
হ্যাঁ।
শোন! এস্টেবান ফিসফিস্ করে বলল, কাউকে বলো না কিন্তু। জল-পিশাচ হলেও আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না।
তবু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে উহ্হা ছুটে বাড়ি ফিরে গেল।
দিনের শেষে খামিস বাড়ি ফিরলে এক সময় উহহা তাকে শুধাল, আচ্ছা বাবা, জল-পিশাচের ক্ষতি যারা করে সে তাদের কেমন করে শাস্তি দেয়?
খামিস বলল, নদীতে যত মাছ আছে, তারও তেমিন অসংখ্য উপায় আছে। নদী থেকে মাছ তাড়িয়ে দিতে পারে, জঙ্গল থেকে শিকার তাড়িয়ে দিতে পারে, ফসল নষ্ট করে দিতে পারে। তাহলেই তো আমরা না খেয়ে মরে যাব। রাতের বেলা আকাশ থেকে আগুন এনে ওবেবের সব মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে পারে।
একটু চুপ করে থেকে উহহা আবার বলল, তার গলায় কন্ঠি বাঁধা থাকলে সে পালাবে কেমন করে? কে ওটা খুলে দেবে?
খামিস বলল, ওবেবে ছাড়া আর কেউ ওটা খুলতে পারবে না। তার থলির মধ্যে একটা পিতলের টুকরো থাকে; সেটা দিয়েই কণ্ঠিটা খোলা যায়। কিন্তু জল-পিশাচের কোন কিছুই দরকার হয় না। ইচ্ছা করলেই সে সাপ হয়ে কণ্ঠির ভিতর দিয়ে গলে যেতে পারে। আরে, তুমি চললে কোথায়?
ঘাড় ফিরিয়ে মেয়ে বলল, ওবেবের মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে।
ওবেবের মেয়ে তখন ভুট্টা পেষাই করছিল। ওঝার মেয়েকে দেখে মুখ তুলে হাসল। সতর্ক করে দিয়ে বলল, গোলমাল করো না উহ্হা, ভিতরে বাবা ঘুমচ্ছে।
নানান কথা বলতে বলতে এক সময় উহ্হা ছুটে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়াল। ওপাশের দেয়ালের গায়ে ওবেবে মাদুরে শুয়ে ঘুমচ্ছে। তার নাক ডাকছে। উহহা চুপিসারে এগিয়ে গেল। সর্দারের শরীরের নিচ থেকে তার থলির অর্ধেকটা বেরিয়ে আছে। কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে সে থলিটা তুলে নিল। মুখটা খুলে ভিতরে কি আছে দেখল। পিতলের চাবিটা চিনতে তার অসুবিধা হল না। চাবিটা বের করে নিয়ে থলিটা বন্ধ করে আবার বিছানায় রেখে দিল। তারপর সতর্ক দ্রুত পদক্ষেপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সে রাতে ওবেবের ঘরে উনুনের আগুন ক্রমে ছাই হয়ে গেল; একে একে সকলেই ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল। এস্টেবান মিরান্ডা তার খোয়াড়ের দরজায় এস্ত পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে কান পাতল।
সে হাঁক দিল, কে?
চুপ! আমি ওঝা খামিসের মেয়ে উহহা। তোমাকে মুক্তি দিতে এসেছি। এই দেখ! তোমার গলার কণ্ঠির চাবি আমার হাতে।
খুব ভাল করেছ। ওটা দাও।
আর একটু এগিয়ে চাবিটা তার হাতে দিয়েই উহহা পালিয়ে যাচ্ছিল; বন্দী তাকে বাধা দিয়ে বলল, দাঁড়াও! যখন মুক্তি দিয়েছ তখন আমাকে জঙ্গল পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে চল, আর কিছু অস্ত্রশস্ত্র এনে দাও। যে আমাকে মুক্তি দেবে, জল-দেবতার কৃপা লাভ করতে হলে এ কাজ তাকে করতেই হবে।
উহহা তীরবেগে অন্ধকার গ্রামের পথে অদৃশ্য হয়ে গেল। বার কয়েক ব্যর্থ চেষ্টার পরে মিরান্ডার গলায় মরচে-ধরা তালাটা খুলে গেল। এবার সে মুক্ত, স্বাধীন। পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই উহ্হা তীর ভর্তি এটা তূণীর, একটা ধনুক ও একটা ছুরি নিয়ে হাজির হল।
এস্টেবান বলল, এবার আমাকে ফটক পর্যন্ত নিয়ে চল।
জল-পিশাচের ভয়ে এবং জল-দেবতার কৃপা লাভের আশায় উহহা এ প্রস্তাবেও রাজী হল। বড় রাস্তাটা এড়িয়ে যতটা সম্ভব কুঁড়ে ঘরগুলোর ছায়ায় ছায়ায় সে এস্টেবানকে নিয়ে গ্রামের ফটকে পৌঁছে গেল।
উহহা ফটক বন্ধ করে গ্রামে ফিরে যাবার জন্য পা বাড়াতেই এস্টেবান তার হাতটা ধরে বলল, এস, তোমার পুরস্কার নাও।
উহ্হা নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করল। কিন্তু মিরান্ডা হাত দিয়ে তার মুখটা চেপে ধরে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
লর্ড গ্রেস্টোকের আফ্রিকাস্থ বাংলোর বারান্দা থেকে নেমে তিনটি প্রাণী গোলাপ-বীথির ভিতর দিয়ে ফটকের দিকে হাঁটতে লাগল। দু’জন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক; বয়স্ক লোকটির হাতে বৈমানিকের শিরস্ত্রাণ ও একজোড়া গগলস্। যুবকটির কথা মন দিয়ে শুনতে শুনতে সে নিঃশব্দে হাসছে।
