জেন বলল, আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলে হয় না মিস্টার ক্যানলার। আমার মাথা ঠিক নেই। আজ সারাটা দিন যা বিপদ গেছে।
তার প্রতি উপস্থিত সকলের বিরুদ্ধভাব দেখে রেগে গেল ক্যানলার। বলল, আমি অনেকদিন অপেক্ষা করেছি। তুমি আমাকে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়েছ।
এই বলে জেনের একটা হাত ধরে এগোতেই ক্যানলারের গলাটা একটা হাত দিয়ে ধরে তাকে শূন্যে তুলে ধরল টারজান।
জেন ভয়ে টারজনের দিকে ছুটে গেল। টারজানকে কাতর মিনতি জানিয়ে বলল, দয়া করে আমার খাতিরে ওকে ছেড়ে দাও। তোমার হাতে ওকে মরতে দিতে পারি না। আমি চাই না তুমি খুনের অপরাধে অপরাধী হও।
এবার ক্যানলারের গলাটা ছেড়ে দিয়ে টারজান তাকে বলল, বল, ওকে তুমি তার প্রতিশ্রুতি থেকে মুক্তি দিলে। তা না হলে তোমাকে তোমার জীবন দিতে হবে।
ক্যানলার হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, হ্যাঁ।
টারজান আবার বলল, বল, তুমি চলে যাবে এবং আর কখনো ওকে বিরক্ত করবে না?
এবারও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল ক্যানলার।
টারজান তাকে ছেড়ে দিল। ক্যানলার টলতে টলতে একমুহূর্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
টারজান ক্লেটনকে বলল, কিছুক্ষণের জন্য নির্জনে তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?
টারজান জেনকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অধ্যাপক পোর্টার এই ঘটনায় বিশেষ বিব্রত হয়ে বললেন, কোন অধিকারে তুমি আমার মেয়ে আর ক্যানলারের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করলে? আমি তাকে। কথা দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব।
টারজান বলল, আমি হস্তক্ষেপ করেছিলাম এই জন্য যে আপনার মেয়ে তাকে ভালবাসে না।
অধ্যাপক পোর্টার বললেন, তুমি জান না তুমি কি করেছ। আর ও বিয়ে করতে চাইবে না এরপর।
টারজান জোর দিয়ে বলল, না করবে না। তাছাড়া আপনার সম্মানে আঘাত লাগবে বলে আর ভয় করার কিছু নেই। আপনি এবার ওকে ঋণের টাকা শোধ করে দিতে পারবেন।
অধ্যাপক পোর্টার বললেন, থাম থাম স্যার। একথার মানে কি জান?
টারজান বলল, আপনার হারানো ধন সব পাওয়া গেছে।
অধ্যাপক পোর্টার বললেন, থাম থাম স্যার। তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?
টারজান বলল, আমি লুকিয়ে দেখছিলাম নাবিকরা সিন্দুকটা কোথায় পুঁতে রাখে। তারপর সেটা কার এবং তাতে কি আছে তা না জেনেই সেটা সরিয়ে নিয়ে গিয়ে অন্য এক জায়গায় সেটা পুঁতে রাখি। তারপর দার্ণতের সঙ্গে সেটা ফ্রান্সে নিয়ে আসি। সিন্দুকটা এখানে বয়ে আনা কষ্টকর হবে ভেবে তার মধ্যে যেসব ধনরত্ন ছিল তা দার্ণৎ কিনে নিয়ে একটা চেক দিয়েছে। তার মোট দাম হয়েছে দু’লক্ষ একচল্লিশ হাজার ডলার।
পকেট থেকে চেকটা বার করে বিস্মিত অধ্যাপক পোর্টারের হাতে দিল টারজান।
অধ্যাপক পোর্টার আবেগকম্পিত কণ্ঠে বললেন, আজ আমার মান-সম্মান সব রক্ষা করলে তুমি।
ক্লেটন এমন সময় ঘরে ঢুকে বলল, শুনছি আগুনটা এই দিকে এগিয়ে আসছে। এখানে থাকা আর নিরাপদ নয় আমাদের পক্ষে। এখনি আমাদের শহরে চলে যেতে হবে।
ফিলান্ডার আর টারজান একটা গাড়িতে চাপল। ক্লেটনের গাড়িটাতে বাকি সবাই চাপল।
গাড়িতে যেতে যেতে ক্লেটন জেনকে বলল, এখন তুমি স্বাধীন। এবার কি তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজী হতে পার না?
জেন চুপি চুপি বলল, হ্যাঁ।
সেদিন স্টেশনের বিশ্রামাগারের একটি ঘরে টারজান জেনকে ডেকে বলল, এখন তুমি স্বাধীন। আমি তোমাকে পাবার জন্য সুদূর আফ্রিকা হতে কত সমুদ্র পার হয়ে এখানে এসেছি। বল, তুমি আমাকে বিয়ে করবে কি না।
জেন বলল, ক্লেটনকে জবাব দিতে পারছি না টারজান। ক্লেটনও আমায় ভালবাসে। লোক হিসেবেও সে ভাল। তার দেয়া আমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা উচিত হবে না। তুমি আমাকে এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
সহসা স্টেশনের একজন কর্মচারী ঘরে ঢুকে টারজানকে খোঁজ করতেই তার চিন্তায় বাধা পড়ল। লোকটি বলল, আঁসিয়ে টারজনের নামে প্যারিস থেকে একটা টেলিগ্রাম এসেছে।
টারজান বলল, আমিই মসিয়ে টারজান।
টারজান টেলিগ্রামটা খুলে দেখল দার্ণ সেটা পাঠিয়েছে। তাতে লেখা আছে, আঙ্গুলের ছাপ এই কথাই প্রমাণ করে যে তুমিই লর্ড গ্রেস্টোক। তোমাকে অভিনন্দন জানাই। ইতি দার্ণ।
টারজনের পড়া শেষ হতেই ক্লেটন ঘরে ঢুকল। টারজানকে বলল, তুমি আমাদের জন্য যা করেছ তার জন্য ঠিকমত ধন্যবাদ জানাতে পারিনি। তুমি আমাদের সকলকে উদ্ধার করেছ। আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম। তুমি এখানে আসায় আমি দারুণ খুশি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না তোমার মত লোক কি করে আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়ে পড়লে?
টারজান শান্তভাবে বলল, আমি সেখানেই জন্মেছিলাম, আমার মা ছিল এক বাঁদর-গোরিলা। আমার জন্ম সম্বন্ধে কোন কথা সে বলে যেতে পারেনি। আমার বাবা কে আমি জানি না।
বামনের দেশে টারজান (টারজন এ্যান্ড দি অ্যাণ্ট মেন)
উগোগো নদীর তীরে নর-খাদক ওবেবের গ্রামের একটা অন্ধকার নোংরা ঘরে পাছার উপর ভর দিয়ে বসে এস্টেবান মিরান্ডা একটা আধসিদ্ধ মাছের বাকি অংশটা খুবলে খুবলে খাচ্ছিল। তার গলায় ঝুলছে কয়েক ফুট লম্বা মরচে-ধরা শিকলে আটকানো একটা ক্রীতদাস-কণ্ঠি।
গত এক বছর ধরে এস্টেবান মিরান্ডা এইভাবে কুকুরের মত শিকলে বাঁধা আছে। তার নিশ্চিত ধারণা যে সেই গোরিলাদের টারজান; দীর্ঘকাল যাবৎ সে নিজেকে টারজনের সঙ্গে একাত্ম করে ভেবেছে এবং একজন ভাল অভিনেতার মত অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সেই ভূমিকায় অভিনয় তো করেছেই, উপরন্তু তার মতই জীবন যাপন করেছে-টারজানই হয়ে উঠেছে। ওবেবের কাছেও সে গোরিলাদের টারজান; কিন্তু গ্রামের ওঝা এখনও বলে যে আসলে সে হচ্ছে জল-পিশাচ, আর তাকে না রাগিয়ে বরং তার পূজা করাই উচিৎ। ওঝা গ্রামের মানুষদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে সে তাদের এই বন্দীটি টারজনের ছদ্মবেশে আসলে জল-পিশাচ; সুতরাং তার কোন ক্ষতি হলে গ্রামের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
